ভারতের বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যে মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনাকে লক্ষ্য করে একের পর এক উচ্ছেদ কার্যক্রম গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ১ হাজার বছরের পুরোনো মসজিদ থেকে ২০০ বছরের পুরোনো দরগাহ পর্যন্ত, গত মে মাস থেকে অন্তত ২৩টি মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে।
এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে মসজিদ, দরগাহ, ঈদগাহ ও মাদরাসা। বারাণসীর ঐতিহাসিক ১ হাজার বছরের পুরোনো মসজিদ গঞ্জ শহীদাও উচ্ছেদের মুখে পড়েছে।
দিল্লি, মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান ও হরিয়ানাসহ একাধিক বিজেপিশাসিত রাজ্যে এমন পদক্ষেপের খবর পাওয়া গেছে। উচ্ছেদের এই ধারাবাহিকতায় অভিযোগ উঠেছে, মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকে বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
সব ক্ষেত্রেই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানোর আগে কোনো পূর্ব নোটিশও দেওয়া হয়নি। মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও, আশপাশে অনুমোদন ছাড়া নির্মিত হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনাগুলো অক্ষত রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উচ্ছেদের সংখ্যা বাড়তে থাকায় আইনের দৃষ্টিতে সমান আচরণ, ধর্মীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
দিল্লিতে ২০০ বছরের পুরোনো দরগাহ ভাঙা
২০২৬ সালের ৬ মে দিল্লির মঙ্গলপুরী ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া ফেজ-২ এলাকায় অবস্থিত দরগাহ পাঁচ পীরান ভেঙে ফেলা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও খাদেমদের মতে, দরগাহটি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
ভোরে দিল্লি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা ডিডিএ বিপুল পুলিশ মোতায়েনের মধ্যে দরগাহটির বড় অংশ ভেঙে দেয়। কর্তৃপক্ষ দাবি করে, ভেঙে ফেলা অংশটি সরকারি জমিতে অবৈধ দখল ছিল এবং ধর্মীয় কমিটির অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় সব আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়েছিল।
তবে দরগাহর খাদেম ও আইনজীবীরা এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তারা জানান, এ বিষয়ে আইনি আপত্তি আগেই দাখিল করা হয়েছিল এবং দরগাহটির ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। ঘটনাটি নগর উন্নয়ন প্রকল্পে ধর্মীয় স্থাপনার সুরক্ষা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করে।
পিতমপুরায় মাদরাসা স্থাপনা ভাঙলেন বিজেপি বিধায়ক
দিল্লির পিতমপুরায় ২১ মে বিজেপি বিধায়ক কর্নাইল সিংয়ের নেতৃত্বে একটি দল একটি স্থাপনা ভেঙে দেয়। সিং স্থাপনাটিকে ডিডিএর জমিতে নির্মিত “অবৈধ মাদরাসা” বলে দাবি করেন।
তিনি কয়েক ডজন সমর্থক ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে ঘটনাস্থলে যান এবং নির্মাণাধীন বলে জানানো একটি সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বড় জনতা স্লোগান দিচ্ছে এবং স্থাপনার অংশবিশেষ ভাঙছে। সিং নিজেও এ কার্যক্রমের ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে শেয়ার করেন।
ঘটনাটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির এ ধরনের উচ্ছেদ কার্যক্রমে সরাসরি অংশ নেওয়া উচিত কি না।
ফরিদাবাদে ৫০ বছরের পুরোনো মসজিদ উচ্ছেদ
২০২৬ সালের ২৯ মে হরিয়ানার ফরিদাবাদের মসজিদ চক এলাকায় প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো একটি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়। মসজিদটি এনআইটি-৩ এলাকায় প্রায় ৭০০ বর্গগজ জায়গাজুড়ে ছিল।
ফরিদাবাদ পৌর করপোরেশন জানায়, গুরুগ্রাম, ফরিদাবাদ ও নয়ডা রিজিওনাল র্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম বা আরআরটিএস করিডোর এবং প্রস্তাবিত উড়ালসড়কের জন্য জমি খালি করতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভোরের আগেই বিপুল পুলিশ উপস্থিতিতে উচ্ছেদ শুরু হয়। অস্থিরতা ঠেকাতে মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
কর্মকর্তারা দাবি করেন, সবুজ বেল্টের জমিতে দখল সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ও ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনালের আদেশ অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা পর্যাপ্ত নোটিশ না দেওয়ার অভিযোগ করেন এবং দীর্ঘদিনের একটি ইবাদতস্থল হারানোর ঘটনায় ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
মুম্বাইয়ে দুটি মসজিদ ভাঙার পর উত্তেজনা
৩০ মে মুম্বাইয়ের বান্দ্রা ইস্ট এলাকায় দখলবিরোধী উচ্ছেদ কার্যক্রমের সময় দুটি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়। বুলডোজার দিয়ে স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এরপর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়।
এরপর জুন মাসে উচ্ছেদ কার্যক্রম আরও দ্রুতগতিতে শুরু হয়।
গুজরাটে তিন দরগাহ ও কবরস্থান ভাঙা
২০২৬ সালের ১ জুন গুজরাটে তিনটি দরগাহ ও একটি মুসলিম কবরস্থান ভেঙে দেয় কর্তৃপক্ষ। জমি বা পরিকল্পনা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বৃহত্তর উচ্ছেদ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে এসব স্থাপনা ভাঙা হয় বলে জানানো হয়।
দরগাহগুলো শুধু স্থাপনা নয়, বরং মুসলিমদের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সেখানে মানুষ দোয়া, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং অলিদের স্মরণে সমবেত হন। কবরস্থান ভাঙার ঘটনা উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়, কারণ ইসলামে কবরস্থানের গভীর ধর্মীয় ও আবেগগত গুরুত্ব রয়েছে।
অধিকারকর্মীরা বলেন, ধর্মীয় ও দাফনস্থল নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে হলে বাড়তি সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। ঘটনাটি জাতীয় পর্যায়ে চলমান বৃহত্তর বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে, যেখানে প্রশ্ন উঠেছে, দখলবিরোধী উচ্ছেদ কার্যক্রম ন্যায়সঙ্গতভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না এবং নগর বা প্রশাসনিক প্রয়োজন দেখা দিলে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলো কীভাবে সুরক্ষিত রাখা উচিত।
গোরেগাঁওয়ে ৭০ বছরের পুরোনো দরগাহ উচ্ছেদ
মঙ্গলবার (২ জুন) মুম্বাইয়ের গোরেগাঁও এলাকায় হজরত সৈয়দ বরকত আলী শাহ পীর বাবা দরগাহ ভেঙে দেয় কর্তৃপক্ষ। দরগাহটি ৭০ বছরের বেশি পুরোনো ছিল।
আরে কলোনিতে দখলবিরোধী উচ্ছেদ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে বিপুল পুলিশ মোতায়েনের মধ্যে এটি ভাঙা হয়। এ ঘটনায় প্রতিবাদ শুরু হয় এবং মহারাষ্ট্রে ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।
বারাণসীতে আজগাইব শহীদ মসজিদ উচ্ছেদ
২ জুন রাতে উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে কাশী রেলওয়ে স্টেশনের ভেতরে রাজঘাটের কাছে অবস্থিত আজগাইব শহীদ মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়। স্থানীয়দের মতে, মসজিদটি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এবং দীর্ঘদিন ধরে এটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
কর্তৃপক্ষ জানায়, কাশী মডেল রেলওয়ে স্টেশনের পুনর্গঠনের জন্য নির্ধারিত রেলওয়ের জমিতে মসজিদটি ছিল। তাদের দাবি, আদালতের কার্যক্রম এবং মসজিদ কমিটিকে বারবার নোটিশ দেওয়ার পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও মুসলিম কমিউনিটির সদস্যরা বলেন, মসজিদটির ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব ছিল এবং এটি সংরক্ষণ করা উচিত ছিল। ঘটনাটি ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন প্রকল্প ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ককে আরও জোরালো করে।
পুনেতে ১০০ বছরের পুরোনো দরগাহ ভাঙা
৩ ও ৪ জুন রাতের মধ্যে পুনের বোপোদি মেট্রো স্টেশনের কাছে প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো হজরত শামসুদ্দিন কাদেরি দরগাহ ভেঙে ফেলে পৌর কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় নেতারা দীর্ঘদিন ধরে দরগাহটিকে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি ও সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে আসছিলেন।
ঘটনার পর পুনে মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের সাধারণ সভায় উত্তপ্ত আলোচনা হয়। এনসিপি নেতা গফুর পাঠানসহ বিরোধী নেতারা অভিযোগ করেন, আইনি প্রক্রিয়া ও পূর্ব নোটিশ ছাড়াই দরগাহটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
পুনেজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, কমিউনিটি নেতা ও অধিকারকর্মীরা উচ্ছেদের ঘটনায় স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেন। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ থাকা দীর্ঘদিনের একটি ধর্মীয় স্থাপনাকে কেন অপসারণের লক্ষ্যবস্তু করা হলো।
মহা বিকাশ আঘাড়ির কাউন্সিলররাও পিএমসি সদর দপ্তরে কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রতিবাদের ঘোষণা দেন। তারা পৌর কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি এবং দরগাহ উচ্ছেদের পরিস্থিতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেন।
সাম্ভালে দরগাহ ও মসজিদ উচ্ছেদ
৫ জুন উত্তর প্রদেশের সাম্ভালের বাঘাউ গ্রামে দখলবিরোধী উচ্ছেদ কার্যক্রমের সময় একটি দরগাহ ভেঙে দেয় জেলা প্রশাসন। ভক্তদের দাবি, দরগাহটি ৫০০ থেকে ৬০০ বছরের পুরোনো। তবে কর্তৃপক্ষ জানায়, এটি সরকারি জমিতে নির্মিত হয়েছিল এবং আদালত থেকে কোনো রেহাই না পাওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই উচ্ছেদ করা হয়েছে।
বিপুল পুলিশ নিরাপত্তার মধ্যে এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সরাসরি উচ্ছেদ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
৬ জুন সাম্ভালে মসজিদ মুস্তফা কাদেরি ভেঙে ফেলার ঘটনা আরও বিতর্ক তৈরি করে। মসজিদের ভেতর থেকে “আই লাভ মুহাম্মদ” স্লোগানসংবলিত ৪৯টি পোস্টার ও একটি সবুজ পতাকা উদ্ধারের অভিযোগে পুলিশ মসজিদের খাদেমসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করে।
কর্তৃপক্ষ দাবি করে, মসজিদটি কবরস্থানের জন্য নির্ধারিত জমিতে অবৈধভাবে নির্মিত হয়েছিল। পুলিশ এমন ধারাও প্রয়োগ করে, যা কথিতভাবে জনসাধারণের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে সক্ষম বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন, মসজিদের ভেতরে নবী মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশকারী পোস্টার কীভাবে অপরাধ হতে পারে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও অধিকারকর্মীরাও বলেন, ধর্মীয় অভিব্যক্তিকে অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়।
১০ জুন সাম্ভালের দৌলতপুর খান এলাকায় একটি ঈদগাহের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেয় রাজস্ব বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন। একই সঙ্গে একটি কক্ষ অপসারণের কাজ শুরু করা হয়।
সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট বিকাশ চন্দ্রের নেতৃত্বে কর্মকর্তারা বিপুল পুলিশ উপস্থিতিতে পৌরসভার ক্রেন ও বুলডোজার ব্যবহার করেন। কর্মকর্তারা জানান, জমি জরিপে দেখা গেছে স্থাপনাগুলো প্লট নম্বর ৪৩২-এর ওপর নির্মিত, যা সরকারি নথিতে জনপথ হিসেবে রেকর্ডভুক্ত।
প্রথমে প্রাচীর ভাঙার পর সংলগ্ন কক্ষ খালি করার জন্য দখলকারীদের অল্প সময় দেওয়া হয়। এতে তারা শ্রমিক ভাড়া করে বাকি স্থাপনাটি নিজেরাই ভেঙে ফেলতে এবং নির্মাণসামগ্রী সরিয়ে নিতে পারেন।
জয়পুরে নুরানি মসজিদ ভাঙা
৮ জুন রাজস্থানের জয়পুরে নুরানি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়। মালভিয়া নগরের নন্দপুরী এলাকায় অবস্থিত মসজিদটি ১৯৮১ সালে স্থানীয় বাসিন্দাদের দানে নির্মিত হয়েছিল। চার দশকের বেশি সময় ধরে এটি মুসলিম কমিউনিটির ইবাদতস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
জয়পুর ডেভেলপমেন্ট অথরিটি জানায়, মালভিয়া নগর ও জগতপুরাকে সংযুক্তকারী সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে মসজিদটি অপসারণ করা হয়েছে। উচ্ছেদের আগে প্রায় ৩ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়, কয়েকটি এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয় এবং জমায়েতের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
কর্মকর্তারা দাবি করেন, স্থাপনাটি সড়কের সীমানার মধ্যে পড়েছিল এবং অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনার সঙ্গে এটিও সরানো হয়েছে। তবে রাজস্থান ওয়াকফ বোর্ড ও কমিউনিটি নেতারা অভিযোগ করেন, মসজিদটি নিবন্ধিত ওয়াকফ সম্পত্তি ছিল এবং বিচারাধীন আইনি কার্যক্রম থাকা সত্ত্বেও এটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।
মহারাষ্ট্রে নুরি মসজিদ উচ্ছেদ
৮ জুন মহারাষ্ট্রের ভায়ান্দর ইস্টের আজাদ নগর বা গোল্ড নেস্ট সার্কেল এলাকায় অবস্থিত নুরি মসজিদ ভেঙে দেয় মীরা-ভায়ান্দর মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন। ভোরে বিপুল পুলিশ মোতায়েনের মধ্যে উচ্ছেদ কার্যক্রম চালানো হয়।
কর্তৃপক্ষ জানায়, মসজিদটি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের সংরক্ষিত প্লট নম্বর ১২২-এ নির্মিত হয়েছিল। ওই জমি প্রস্তাবিত বালাসাহেব ঠাকরে আর্ট হলসহ জনসাধারণের অবকাঠামোর জন্য নির্ধারিত ছিল।
ইটাওয়ায় ৮০০ বছরের পুরোনো মাজার ভাঙার অভিযোগ
জুন মাসে উত্তর প্রদেশের ইটাওয়ায় সৈয়দ শাহ বাবা মাজার ভেঙে ফেলা হয়। বন বিভাগ জানায়, মাজারটি সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে নির্মিত ছিল।
ইটাওয়া শহর থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে ফিশার ফরেস্ট এলাকায় অবস্থিত মাজারটি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রায় ৩ হাজার বর্গফুট সরকারি জমি দখল করে ছিল। কর্তৃপক্ষ জানায়, মাজারের আইনি অবস্থান প্রমাণে খাদেম কোনো নথি দেখাতে পারেননি। এরপর বিপুল পুলিশ নিরাপত্তার মধ্যে সাত ঘণ্টার কার্যক্রমে তিনটি বুলডোজার দিয়ে মাজারটি ভেঙে ফেলা হয়।
তবে খাদেম দাবি করেন, মাজারটি প্রায় ৮০০ বছরের পুরোনো এবং ভক্তদের কাছে এর গভীর ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। মাজারটির দাবি করা ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং এর আগে হিন্দু সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে স্থাপনাটিকে অননুমোদিত দাবি করে অভিযোগ করার কারণে উচ্ছেদটি বিতর্ক সৃষ্টি করে।
উচ্ছেদের পর বন বিভাগ খালি করা জমিতে গাছ লাগায় এবং একে বন পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের অংশ বলে জানায়।
বারাণসীতে ১ হাজার বছরের পুরোনো মসজিদ গঞ্জ শহীদা উচ্ছেদের মুখে
১৭ জুন আবারও বারাণসীতে নতুন বিতর্ক দেখা দেয়। কাশী রেলওয়ে স্টেশনের কাছে অবস্থিত ঐতিহাসিক মসজিদ গঞ্জ শহীদার দেয়ালে রেল প্রশাসন নোটিশ সাঁটিয়ে কমিটিকে ২০ জুনের মধ্যে স্থান খালি করতে বলে।
মসজিদ কমিটির দাবি, মসজিদটি প্রায় ১ হাজার বছরের পুরোনো। এটি হিজরি ১০৩৪ সাল, অর্থাৎ আনুমানিক ১৬২৪-২৫ খ্রিষ্টাব্দের সময়কার। কমিটির দাবি, ১৮৮৩-৮৪ সালের সেটেলমেন্ট মানচিত্র এবং আগের রাজস্ব রেকর্ডেও মসজিদটির উল্লেখ রয়েছে।
তবে রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, কাশী রেলওয়ে স্টেশনের পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় রেলওয়ের জমিতে মসজিদটি অবস্থিত এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসারেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মসজিদ কমিটি এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, রেলস্টেশন নির্মাণের বহু আগেই মসজিদটির অস্তিত্ব ছিল। তারা নোটিশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বারমেরে চার মসজিদ উচ্ছেদ
১৮ জুন রাজস্থানের বারমের জেলার মালানা গ্রাম এলাকায় চারটি মসজিদ ভেঙে দেয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। এর এক দিন আগে, ১৭ জুন নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ করা হয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থাতেই পরদিন উচ্ছেদ করা হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, মসজিদগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমিতে নির্মিত হয়েছিল এবং ওই জমি এ ধরনের ব্যবহারের জন্য আইনগতভাবে রূপান্তর করা হয়নি। এলাকায় প্রায় ১২টি মসজিদকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এতে স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে ভয় ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এসব উচ্ছেদ যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও আইনের দৃষ্টিতে সমান আচরণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, উচ্ছেদ কার্যক্রম আইনগত ও প্রশাসনিক নিয়ম মেনেই পরিচালিত হচ্ছে।
বুলডোজার যখন ভারতজুড়ে ধর্মীয় ভূদৃশ্য বদলে দিচ্ছে, তখন বিতর্ক আর শুধু দখলের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা এবং দেশটিতে সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের ভবিষ্যৎকে স্পর্শ করছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষার আহ্বান জাস্টিস ফর অলের
সাম্প্রতিক উচ্ছেদের ঢেউ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ১৭ জুন আমেরিকাভিত্তিক অধিকার সংগঠন জাস্টিস ফর অল ভারতে মসজিদ ভাঙার ঘটনা দ্রুত বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংগঠনটি সাম্ভাল, বারাণসী ও জয়পুরে সাম্প্রতিক উচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে।
বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে তিনটি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। তাদের মতে, এই প্রবণতা ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আইনের দৃষ্টিতে সমান আচরণ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। সংগঠনটি বিশেষভাবে সাম্ভালের মসজিদ মুস্তফা কাদেরি, বারাণসীর শহীদ আজগাইব মসজিদ এবং জয়পুরের নুরানি মসজিদের কথা উল্লেখ করে।
জাস্টিস ফর অল অভিযোগ করে, ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করছে। সংগঠনটি ভারতের বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজকে সম্মিলিতভাবে “ঘৃণার রাজনীতি”র বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়।
সংগঠনটি আরও বলেছে, ভারতের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। উচ্ছেদের সংখ্যা বাড়তে থাকলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও গভীর হতে পারে বলেও সতর্ক করে তারা।
ভারতে দখলবিরোধী উচ্ছেদ কার্যক্রম এবং ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যেই এ বিবৃতি এসেছে। কর্তৃপক্ষ ধারাবাহিকভাবে দাবি করছে, এসব পদক্ষেপ আইনগত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনেই নেওয়া হচ্ছে। তবে সমালোচকদের মতে, জনআস্থা বজায় রাখা এবং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার জন্য স্বচ্ছতা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।











