জাতীয় সংসদে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের ব্যাখ্যা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
বুধবার (২৪ জুন) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১৪তম দিনে এ ঘটনা ঘটে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ বিরোধীদের আচরণ ও কৌশলের কঠোর সমালোচনা করতে গিয়ে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ নিজেই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী এবং যারা আল্লাহর বান্দাদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্যায্য কৌশল খাটায়, তাদের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়। যারা সরকারের উন্নয়ন ও জনমুখী কর্মকাণ্ডকে স্বীকার না করে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে।”
তার এই বক্তব্যের পরপরই সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন অভিযোগ করেন, কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে দেওয়া বক্তব্যটি রাজনৈতিক অপব্যাখ্যা এবং ঠাট্টা-বিদ্রুপের শামিল। তিনি বলেন, “উনাদের প্রশংসা করলে উনারা আরও বাড়িয়ে দেবেন আর না করলে পেটাবেন কিনা—এমন বোঝানোর মাধ্যমে পবিত্র কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।”
নাজিবুর রহমান মোমেন এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবাণী উল্লেখ করে বলেন, কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা বা অবমাননা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বিগত শাহবাগ আন্দোলনের সময়কার একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কোরআনের আয়াত নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। তিনি সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে সংশ্লিষ্ট বক্তব্য এক্সপাঞ্জ বা বাদ দেওয়ার দাবি জানান।
এর জবাবে স্পিকার বলেন, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ একজন অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য এবং তিনি কোরআন-হাদিস নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করতে পারেন বলে মনে হয় না। তবে বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখা হবে এবং যদি কোনো ভুল ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তাহলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ এবং এখানে কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
পরবর্তীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বক্তব্য দিয়ে বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোরআনের ভুল ব্যাখ্যার অভিযোগ তোলায় জনগণের মধ্যে ভুল বার্তা যেতে পারে। তিনি বলেন, আলমগীর মাহফুজ উল্লাহ একজন মাওলানা এবং তিনি সৎ উদ্দেশ্যে বলেছেন—আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে তা বৃদ্ধি পায়, আর না করলে শাস্তি আসতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে ভুল ব্যাখ্যা করা বা এ নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলা ঠিক হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলমান এবং কেউ ইসলামের অবমাননা করলে সরকার তা নিন্দা করবে, তবে বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সমীচীন নয়।
এ সময় স্পিকার আবারও সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং বলেন, সংসদকে বিরূপ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা উচিত নয়।
এর মধ্যে বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আয়াতের নাজিল হওয়ার প্রেক্ষাপট আড়াল করে বিষয়টিকে দলীয়ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষের জন্য অসংখ্য নেয়ামত দিয়েছেন এবং মানুষের উচিত সেগুলোর যথাযথ ব্যবহার করে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠায় কাজ করা।
মুজিবুর রহমান আরও অভিযোগ করেন, বাজেটের প্রশংসা না করলে বিরোধী দলের ওপর আল্লাহর আজাব আসবে—এমন ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনুচিত। তিনি প্রয়োজনে আলেম বা বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করার দাবি জানান।
পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে স্পিকার অন্য সদস্যদের শান্ত থাকতে বলেন এবং জানান, ট্রেজারি বেঞ্চেও অনেক আলেম রয়েছেন। নতুন করে বিতর্ক না বাড়ানোর শর্তে তিনি সরকারি দলের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন।
কামরুজ্জামান তার বক্তব্যে বলেন, “পবিত্র কোরআনের আয়াতে বলা হয়েছে—আমরা শুনলাম এবং তা পালন করলাম।” তিনি আলেম-ওলামাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সবাইকে সহিহ বিষয় মেনে চলার আহ্বান জানান।
সবশেষে বিতর্কের অবসান ঘটাতে সংসদে বক্তব্য দেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি। তিনি বলেন, সংসদের সিনিয়র নেতারা কথা বলার সময় অন্য সদস্যদের আসন গ্রহণ করা উচিত। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত সংসদ সদস্য নিজে একজন আলেম হওয়ায় তিনি কোনো ব্যঙ্গাত্মক উদ্দেশ্যে কথা বলেননি; বরং সবার আমলকে আরও সহিহ ও দৃঢ় করার উদ্দেশ্যেই বক্তব্য দিয়েছেন।
স্পিকারের ধারাবাহিক হস্তক্ষেপ ও সিনিয়র নেতাদের বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত সংসদের পরিস্থিতি শান্ত হয়।











