বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেছেন, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা এককেন্দ্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সরকারি নিয়োগে দলীয় প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা জরুরি।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস উপজেলা শাখা আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সারা দেশে নাগরিক সমাবেশের মাধ্যমে দুটি বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে চায়। প্রথমত, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত, তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য জরুরি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে সরকারের ব্যর্থতার বিষয়ে জনগণকে সচেতন করা এবং সরকারকে সতর্ক করা।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী ও ৈ স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটলেও জনগণের প্রত্যাশিত নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। মানুষের আত্মত্যাগের লক্ষ্য শুধু সরকার পরিবর্তন ছিল না; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং দেশের ওপর যেকোনো ধরনের আধিপত্যের অবসান ঘটানো।
তিনি আরও বলেন, একই দিনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং জনগণ পৃথক দুটি ব্যালটে তাদের মতামত দিয়েছে। সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হলে গণভোটে জনগণের দেওয়া মতামতও সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। গণভোটের রায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
মামুনুল হক বলেন, গণভোটে বাংলাদেশের মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এই রায়ের উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা দল স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারে।
তিনি বলেন, আমরা এমন একটি ব্যবস্থা চাই, যেখানে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করবে, সরকারি নিয়োগে দলীয় বিবেচনার সুযোগ থাকবে না এবং পুলিশ-প্রশাসন কোনো রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, জনগণের জন্য কাজ করবে।
সরকারি নিয়োগে দলীয় প্রভাবের সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, যে দল ক্ষমতায় আসে, তাদের রাজনৈতিক কর্মীদের রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হবে।
মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আগামী দিনের নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিপুল মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা শুধু ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঙ্খিত সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।
মামুনুল হক বলেন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধে যেতে চায় না। তবে রাষ্ট্র সংস্কার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে দলটি নীতিগত অবস্থান থেকে কোনো আপস করবে না।
তিনি বলেন, আমরা ব্যক্তির বিরুদ্ধে নই; আমরা একটি বৈষম্যমূলক ও এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন চাই। এমন ব্যবস্থা চাই না, যা ভবিষ্যতে আবার কোনো শাসককে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ দেবে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক মর্যাদাভিত্তিক সম্পর্ক চায়। তবে বাংলাদেশের ওপর কোনো ধরনের আধিপত্য বা হস্তক্ষেপ জনগণ মেনে নেবে না।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বন্ধুত্ব করতে চাইলে বাংলাদেশ উত্তম বন্ধু হিসেবে পাশে থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হলে জনগণ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যাকান্ড ও অপরাধের মামলায় অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশে করিমগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি মুফতি মোহাম্মদ দ্বীন ইসলামের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ হাদী এবং বায়তুল মাল সম্পাদক মাওলানা ফজলুর রহমান। এ সময় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।










