spot_img
spot_img

আজ আফগানিস্তানের বিজয় দিবস

দুই দশকের যুদ্ধ, বিদেশি সামরিক আগ্রাসন ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট আফগানিস্তানের ইতিহাসে নতুন মোড় আসে। সেদিন রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করেন ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের মুজাহিদরা। পতন ঘটে আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত সরকারের। দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। দীর্ঘ ২০ বছরের লড়াই শেষে আবারও আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নেয় ইমারাতে ইসলামিয়া।

ইমারাতে ইসলামিয়া ১৫ আগস্টকে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করে। তাদের কাছে দিনটি আমেরিকা ও ন্যাটোর দীর্ঘ সামরিক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বিজয় এবং স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রতীক। আজ সেই বিজয়ের পাঁচ বছর পূর্ণ হলো। আফগান সরকারের ২০২৬ সালের সরকারি ছুটির তালিকাতেও ১৫ আগস্ট ‘বিজয় দিবস’ হিসেবে রয়েছে। আর ১৯ আগস্ট দেশটির ঐতিহাসিক স্বাধীনতা দিবস।

দুই দশকের আগ্রাসন ও যুদ্ধ

২০০১ সালের ৭ অক্টোবর আমেরিকার নেতৃত্বে আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসন শুরু হয়। এর পরপরই ইমারাতে ইসলামিয়ার প্রথম শাসনের পতন ঘটে। এরপর আমেরিকা ও ন্যাটোর সামরিক দখলদারিত্ব এবং পশ্চিমা সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে প্রায় দুই দশক লড়াই চালিয়ে যান আফগান মুজাহিদরা।

দীর্ঘ সেই লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে ২০২১ সালে একের পর এক প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে ইমারাতে ইসলামিয়া। দ্রুত বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি। ১৫ আগস্ট মুজাহিদরা কাবুলে প্রবেশ করেন। একই দিন আশরাফ গনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে পশ্চিমা সমর্থিত সরকারের পতন চূড়ান্ত হয়।

তবে তখনও বিদেশি সেনাদের প্রত্যাহার পুরোপুরি শেষ হয়নি। কাবুল বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে আরও দুই সপ্তাহ মার্কিন সামরিক তৎপরতা চলে। ৩০ আগস্ট রাতে সর্বশেষ মার্কিন সামরিক বিমান কাবুল ছেড়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে আমেরিকার প্রায় ২০ বছরের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটে। ইমারাতে ইসলামিয়ার সরকারি ছুটির তালিকায় ৩১ আগস্টকে আলাদাভাবে ‘প্রস্থান দিবস’ হিসেবেও রাখা হয়েছে।

দীর্ঘ যুদ্ধের পর নিরাপত্তা

গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনগুলোর একটি নিরাপত্তা পরিস্থিতি। আগের মতো দেশজুড়ে সরকার ও সশস্ত্র বিরোধীদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নেই। দীর্ঘদিন যুদ্ধ, বিমান হামলা, রাতের অভিযান ও সংঘাতের মধ্যে জীবন কাটানো সাধারণ আফগানদের জন্য এটি বড় পরিবর্তন।

ইমারাতে ইসলামিয়া সার্বিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠাকে গত পাঁচ বছরের অন্যতম প্রধান অর্জন হিসেবে তুলে ধরছে। পাশাপাশি ইসলামি শরিয়াহ বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিকেও নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করছেন দেশটির কর্মকর্তারা। এবারের বিজয় দিবসের সরকারি আয়োজনেও নিরাপত্তা, শরিয়াহভিত্তিক শাসন ও স্বাধীনতাকে সামনে আনা হয়েছে।

যুদ্ধ বন্ধ হওয়ায় দেশের ভেতরে চলাচল সহজ হয়েছে। দীর্ঘদিন সংঘাতের কারণে থমকে থাকা পুনর্গঠন ও বড় উন্নয়ন প্রকল্পেও নতুন করে কাজ শুরু হয়েছে। আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও আফগানিস্তানের অবস্থান কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে কাবুল।

ঘুরে দাঁড়ানোর পথে অর্থনীতি

২০২১ সালে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে আফগানিস্তানের অর্থনীতি। বৈদেশিক সহায়তা ব্যাপকভাবে কমে যায়। বিদেশে থাকা আফগান রাষ্ট্রের বিপুল সম্পদ আটকে দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেনেও তৈরি হয় নানা প্রতিবন্ধকতা।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানো, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন শক্তিশালী করা এবং বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা শুরু করে ইমারাতে ইসলামিয়া।

বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে আফগানিস্তানের অর্থনীতি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২৬ অর্থবছরেও প্রায় ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। তবে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের ঘাটতি ও বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখছে বিশ্বব্যাংক।

গত অর্থবছরে ইরান ও পাকিস্তান থেকে প্রায় ৩৭ লাখ আফগান দেশে ফিরে এসেছেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রত্যাবর্তনে জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। অর্থনীতি বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ওই সময়ে মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।

ফলে অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনমানের উন্নতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

আফিম চাষ নির্মূলে বড় অগ্রগতি

ইমারাতে ইসলামিয়ার গত পাঁচ বছরের সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি মাদকবিরোধী অভিযান। আমীরুল মুমিনীন শাইখুল হাদিস মাওলানা হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নির্দেশে আফিম চাষ নিষিদ্ধ করার পর দেশটিতে পপি চাষ ব্যাপকভাবে কমে এসেছে।

জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর ইউএনওডিসির হিসাবে, ২০২৪ সালে আফগানিস্তানে ১২ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে পপি চাষ হয়েছিল। ২০২৫ সালে তা আরও ২০ শতাংশ কমে প্রায় ১০ হাজার ২০০ হেক্টরে নেমে আসে। নিষেধাজ্ঞার আগের ২০২২ সালের তুলনায় আফিম চাষ এখন খুবই নিচু পর্যায়ে রয়েছে।

ইউএনওডিসিও এই পরিবর্তনের পেছনে আফিম চাষের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রাখার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে। একসময় বিশ্বের আফিম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আফগানিস্তানে এমন পরিবর্তন আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্ব পেয়েছে।

ইমারাতে ইসলামিয়া মাদক চাষ ও পাচার নির্মূলকে নিজেদের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে।

এগিয়ে চলছে বড় অবকাঠামো প্রকল্প

দীর্ঘ যুদ্ধের পর দেশ পুনর্গঠনে বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পে কাজ করছে ইমারাতে ইসলামিয়া। এর মধ্যে উত্তর আফগানিস্তানের কুশ তেপা খাল অন্যতম। বিশাল এই সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে অনাবাদি জমিকে কৃষির আওতায় আনা এবং খাদ্যে স্বনির্ভরতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটির প্রথম ধাপ শেষ করে দ্বিতীয় ধাপের কাজও অনেক দূর এগিয়েছে বলে জানিয়েছে ইমারাতে ইসলামিয়া।

আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে মধ্য এশিয়া থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় বিদ্যুৎ নেওয়ার কাসা-১০০০ প্রকল্পের কাজও আবার শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ২০২১ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া আফগান অংশের কাজ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে পুনরায় শুরু হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত শত শত বিদ্যুৎ টাওয়ারের কাজ এগিয়েছে এবং পুরো প্রকল্প ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।

তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান হয়ে পাকিস্তান ও ভারতে গ্যাস সরবরাহের টাপি প্রকল্পের কাজও আফগান ভূখণ্ডে এগোচ্ছে। আফগান সরকারের অর্থনৈতিক দপ্তর বলছে, প্রকল্পটি ভবিষ্যতে ট্রানজিট আয়, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইমারাতে ইসলামিয়া খনি, কৃষি, বিদ্যুৎ, সড়ক, রেল ও আঞ্চলিক যোগাযোগের প্রকল্পগুলোকে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও পরিবর্তন

২০২১ সালের আগস্টে ইমারাতে ইসলামিয়া আবার ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ছিল তাদের সামনে অন্যতম বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও বিভিন্ন দেশ ধীরে ধীরে কাবুলের সঙ্গে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়াতে থাকে।

এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি দেয়। রুশ সরকারের সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাওলানা আমীর খান মুত্তাকিকে জানানো হয়। একে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানায় কাবুল।

এর পাশাপাশি চীন, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো, ইরান, তুরস্ক, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে ইমারাতে ইসলামিয়া।

আফগান কর্মকর্তারা বলে আসছেন, পারস্পরিক সম্মান, একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় কাবুল।

সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ

পাঁচ বছরে বড় ধরনের যুদ্ধের অবসান এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটলেও আফগানিস্তানের সামনে এখনো বেশ কিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়া, বিনিয়োগের ঘাটতি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক আফগানের ফিরে আসা। বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনীতি বাড়লেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনমানে একই হারে উন্নতি আসছে না।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও এখনো সীমিত। মেয়েদের শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান ও সরকারব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে পশ্চিমা দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ইমারাতে ইসলামিয়ার মতপার্থক্য রয়েছে।

ইমারাতে ইসলামিয়া বলে আসছে, আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্বের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান এবং আফগান জনগণের ধর্মীয় ও জাতীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতে।

বিজয়ের পাঁচ বছর

পাঁচ বছর পর ১৫ আগস্টকে আফগানিস্তান শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের বার্ষিকী হিসেবে স্মরণ করছে না। ইমারাতে ইসলামিয়ার কাছে দিনটি দীর্ঘ বিদেশি সামরিক দখলদারিত্বের অবসান এবং দুই দশকের লড়াইয়ে বিজয়ের প্রতীক। এবারের পঞ্চম বার্ষিকীতেও দেশজুড়ে সরকারি আয়োজনে দিনটিকে ‘বিজয় দিবস’ হিসেবেই স্মরণ করা হচ্ছে।

২০০১ সালে শুরু হওয়া যুদ্ধের মধ্যে আফগানিস্তানের একটি প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে সংঘাত, হামলা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট সেই দীর্ঘ অধ্যায়ের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

এরপর পাঁচ বছরে নিরাপত্তা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, অবকাঠামো, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশ কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, সাধারণ মানুষের জীবনমান, পূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মতো বড় চ্যালেঞ্জও সামনে রয়েছে।

দুই দশকের লড়াই ও বিদেশি দখলদারিত্বের অবসানের পর পাওয়া এই বিজয়ের সুফল সাধারণ আফগানদের জীবনে কতটা পৌঁছে দেওয়া যায়, সেটিই এখন ইমারাতে ইসলামিয়ার সামনে বড় পরীক্ষা।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ