spot_img

মক্কা চুক্তিতে অস্বস্তিতে আমিরাত-ইসরাইল জোট

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও দখলদার অবৈধরাষ্ট্র ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের বিপরীতে এই চুক্তিকে একটি শক্তিশালী পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে দেখছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ডেভিড হার্স্ট।

মিডল ইস্ট আইয়ে প্রকাশিত এক মতামতধর্মী প্রতিবেদনে তিনি লিখেছেন, গত ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি আমিরাত ও ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য অপ্রত্যাশিত ছিল। তার দাবি, চুক্তি ঘোষণার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে আমিরাত বিষয়টি জানতে পারে, কিন্তু ততক্ষণে সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ ছিল না।

হার্স্টের ভাষ্য অনুযায়ী, গাজ্জায় দখলদার অবৈধরাষ্ট্র ইসরাইলের গণহত্যার প্রতিক্রিয়ায় একটি বৃহত্তর মুসলিম প্রতিরক্ষা জোট গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আগেই প্রকাশ করেছিলেন। বিভিন্ন বাধার মুখে পড়লেও তিনি এই ধারণা থেকে সরে আসেননি।

অন্যদিকে সৌদি যুবরাজ মুহাম্মাদ বিন সালমান পুরো প্রক্রিয়াটি তুলনামূলকভাবে গোপন রেখেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হার্স্ট মনে করেন, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত এবং আমেরিকার নিরাপত্তা ভূমিকা নিয়ে সৌদি আরবের মধ্যে যে হতাশা তৈরি হয়েছে, মক্কা চুক্তি তারও একটি প্রতিফলন।

সৌদি শূরা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ড. আহমেদ আলতুওয়াইজরি মিডল ইস্ট আইকে বলেন, “মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। সবাই ট্রাম্পের ওপর আস্থা হারিয়েছে। এই চুক্তি শুধু ওই তিন দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষা করে।”

তিনি আরও বলেন, “এটি অঞ্চলকে নতুন করে সাজাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা করতে থাকবে। আরব বিশ্ব ও মুসলিম বিশ্বের আরও দেশ ভবিষ্যতে এ ধরনের চুক্তিতে যোগ দেবে।”

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মক্কা চুক্তির তিন প্রতিষ্ঠাতা দেশের প্রত্যেকেরই আলাদা কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। ড. আলতুওয়াইজরির মতে, ভারতের সঙ্গে বিরোধে এটি পাকিস্তানের জন্য সহায়ক হবে। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য হলেও দখলদার অবৈধরাষ্ট্র ইসরাইলের হুমকির বিপরীতে ন্যাটোর প্রতিরোধ যথেষ্ট নয় বলে মনে করছে। আর সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক শক্তির পাশাপাশি তাদের গোয়েন্দা সক্ষমতা ও কৌশলগত পরিকল্পনা থেকেও উপকৃত হতে পারে।

আমিরাত-ইসরাইল জোটের বিপরীতে নতুন ভারসাম্য

হার্স্ট লিখেছেন, ইসরাইলি কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলবিদরা বেশ কিছুদিন ধরেই একটি সম্ভাব্য ‘সুন্নি মুসলিম জোটের’ বিপরীতে পাল্টা জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করে আসছিলেন। এই পরিকল্পনার কেন্দ্রে ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক সহযোগিতা।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় এই সম্পর্ক আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সে সময় ইসরাইল আবুধাবিতে আয়রন ডোম, আয়রন বিম এবং ড্রোন শনাক্তকারী স্পেকট্রোসহ উন্নত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করে।

হার্স্টের মতে, এটি ছিল আরও বড় আঞ্চলিক পরিকল্পনার অংশ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরাইল তার বিরোধীদের দুর্বল করার পর ভারত থেকে পূর্ব ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলতে চেয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সেই প্রকল্পের বিপরীতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পাল্টা শক্তি হয়ে উঠেছে।

সৌদি-আমিরাত প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ার আশঙ্কা

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মক্কা চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হতে পারে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও গভীর হওয়া।

ইয়েমেন ও সুদানসহ কয়েকটি আঞ্চলিক ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই মতপার্থক্য রয়েছে। আমিরাতি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুলখালেক আবদুল্লাহ মক্কা চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন, “এই চুক্তি যদি জোট না হয়, তাহলে এর উপযুক্ত নাম কী?”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য উপসাগরীয় কাঠামোর বাইরে নতুন রাজনৈতিক ও সামরিক জোট গড়ে তুলছে, যা জিসিসির সহযোগিতাকে দুর্বল করতে পারে।

তার বক্তব্যের জবাবে সৌদি প্রিন্স আবদুল রহমান বিন মুসায়েদ বলেন, “কোনো রাষ্ট্র নিজের উপযুক্ত মনে করা যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করার অধিকার রাখে না? এটা কি প্রত্যেক রাষ্ট্রের সার্বভৌম বিষয় নয়?”

সৌদি বিশ্লেষক ড. আহমেদ আল-সানিয়ে মক্কা চুক্তিকে রিয়াদের স্বাধীন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, সৌদি আরব এখন আর অন্যদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য শুধু অর্থ জোগানোর কেন্দ্র হয়ে থাকতে চায় না, বরং উপসাগরীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান শক্তি হতে চায়।

মিশরকে নিয়ে মতপার্থক্য

হার্স্টের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মক্কা চুক্তিতে মিশরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সংশয় ছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, সামরিক তথ্য আমেরিকা বা ইসরাইলের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। একই সঙ্গে মিশরের সেনাবাহিনী বাস্তবে কতটা সামরিক সুবিধা দিতে পারবে, তা নিয়েও তাদের সন্দেহ ছিল।

তবে তুরস্ক মিশরকে এই কাঠামোয় যুক্ত করতে আগ্রহী। হাকান ফিদান সম্প্রতি মিশর সফরে গিয়ে আশা প্রকাশ করেন, কায়রো ভবিষ্যতে আনুষ্ঠানিক অংশীদার হিসেবে মক্কা চুক্তিতে যুক্ত হবে।

আরব বিশ্বের সামনে নতুন বিকল্প

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিকে আমিরাত-ইসরাইল ঘনিষ্ঠতা, অন্যদিকে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মক্কা চুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যে দুটি ভিন্ন কৌশলগত বলয় তৈরি করছে।

আমেরিকার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডোর সিঙ্গার মিডল ইস্ট আইকে বলেন, প্রথম দেখায় আমিরাত-ইসরাইল ব্লক দুই পক্ষকেই বেশি দৃশ্যমান সুবিধা দিতে পারে। তবে মক্কা চুক্তি শেষ পর্যন্ত আরও বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে এবং তুলনামূলকভাবে কম লেনদেননির্ভর হতে পারে।

হার্স্টের মতে, মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি এর আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা। সৌদি আরবকে মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। বিপরীতে আমেরিকার সামরিক সহায়তায় ইসরাইল প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে থাকলেও সেই শক্তি প্রয়োগে প্রয়োজনীয় আঞ্চলিক বৈধতা তার নেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজ্জা ও দক্ষিণ লেবাননে দখলদার অবৈধরাষ্ট্র ইসরাইলের সামরিক লক্ষ্য এখনো পূরণ হয়নি। একই সময়ে ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

হার্স্টের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই পরিস্থিতিতে আরব বিশ্ব নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিকল্পের জন্য ক্রমেই মক্কা চুক্তির দিকে তাকাতে পারে। এটি সফলভাবে সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে তার মতে, গত কয়েক বছরের যুদ্ধে যে কার্যকর আঞ্চলিক পাল্টা প্রতিরোধ অনুপস্থিত ছিল, মক্কা চুক্তি সেই শূন্যতা পূরণের সবচেয়ে শক্তিশালী কাঠামো হিসেবে সামনে এসেছে।

সূত্র : মিডল ইস্ট আই

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ