spot_img
spot_img

সিরিয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত হয়ে দল বিলুপ্তির ঘোষণা দিলো কুর্দিদের এসডিএফ

সিরিয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত হয়ে দল বিলুপ্তির ঘোষণা দিলো কুর্দি নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র দল এসডিএফ (সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেস)।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) একীভূত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এসডিএফ প্রধান ‘মাজলুম আবদি’ এই ঘোষণা দেন।

দামেস্কের প্রেসিডেন্ট ভবনে দেওয়া ঘোষণায় তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আহমদ শারার সরকারের সঙ্গে করা একটি একীভূতকরণ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমাদের সংগঠনটি বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এসডিএফ সিরীয় সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে এবং এখন থেকে স্বাধীন বাহিনী হিসেবে কার্যক্রম চালাবে না।

কুর্দি নেতৃত্বাধীন এই বাহিনী একসময় সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কার্যত একটি স্বায়ত্তশাসিত এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত। তবে জানুয়ারিতে সরকারি বাহিনীর অভিযানের পর তারা তাদের অধিকাংশ ভূখণ্ড হারায়। এরপর শারা সরকারের সঙ্গে একীভূত হওয়ার একটি চুক্তিতে সই করে, যেখানে কুর্দিদের সাংস্কৃতিক, বেসামরিক ও শিক্ষাগত অধিকারের স্বীকৃতিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আবদি তার বক্তব্যে বলেন, আজ আমরা এমন একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি, যখন আমরা সিরিয়ার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটিয়ে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও পুনর্গঠন নামে একটি নতুন অধ্যায় শুরু করছি।

তিনি বলেন, আমরা চাই, এই দিনটি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নির্মাণের ক্ষেত্রে এবং অস্ত্রের যুগ থেকে শান্তির যুগে সত্যিকারের উত্তরণের সূচনা করবে।

এছাড়াও বলেন, সিরিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি সময়ে এসডিএফ একটি বড় দায়িত্ব বহন করেছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে এবং দেশটি শান্তির একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। তাই আমরা সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সেসের দায়িত্বের সমাপ্তি ঘোষণা করছি এবং পূর্ণ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে একটি স্বাধীন সামরিক বাহিনী হিসেবে এর বিলুপ্তি ঘোষণা করছি।

‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’

এসডিএফ একসময় সিরিয়ায় আইএসআইএল (ISIL) বা আইএসআইএসের (ISIS) এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমেরিকার প্রধান অংশীদার ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার গণহত্যাকারী ও স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর ওয়াশিংটন শারার নেতৃত্বাধীন দামেস্কের নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে।

দামেস্ক থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক হেইদি পেট বলেন, এসডিএফের বিলুপ্তি সিরিয়ার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত।

তিনি বলেন, শারা সরকারের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনের সঙ্গে এসডিএফের ভাগ্যও বদলে গেছে। একই সঙ্গে সংগঠনটির ভারী অস্ত্র এবং ওয়াইপিজে—নারী যোদ্ধাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অমীমাংসিত প্রশ্ন থাকায় একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াটি সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চলেছে।

তিনি বলেন, “ওয়াইপিজে যুক্তি দিয়েছিল যে তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একীভূত করা উচিত। তারা পেশাদার সৈনিক—তারা আইএসআইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং সৈনিক হিসেবেই কাজ চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু দামেস্ক তাদের কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছিল। তাই এসব অমীমাংসিত প্রশ্নের কারণেই এতদিন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্তির ঘোষণা দেওয়া হয়নি।”

তবে উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় এই প্রক্রিয়া কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

আসাদ পরিবারের ৫০ বছরের শাসনামলে কুর্দিরা প্রান্তিক অবস্থায় ও নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত ছিল। দামেস্কে দেওয়া বক্তব্যে আবদি জোর দিয়ে বলেন, শারাও কুর্দি ভাষায় শিক্ষার অধিকার সংরক্ষণের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তিনি আরও বলেন, চলতি বছরেই কুর্দি ভাষায় শিক্ষা চালুর জন্য তারা কাজ করবেন।

আবদি আরো বলেন, “আমরা সব মানুষের জন্য একটি নতুন সিরিয়া গড়ে তুলতে চাই—কুর্দি, আরব, তুর্কমেন ও আসিরীয়দের জন্য; এমন একটি ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল সিরিয়া, যা তার শিশুদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করবে এবং তরুণদের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করবে।”

সিরিয়ায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন দেশটিতে ওয়াশিংটনের দূত টম ব্যারাক। এসডিএফকে সিরীয় রাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন, ট্রাম্পের দূরদর্শী নেতৃত্ব এসডিএফকে সুশৃঙ্খলভাবে একীভূত হওয়ার পথ খুলে দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চুক্তিতে শিক্ষাক্ষেত্রে কুর্দি ভাষার স্বীকৃতির পাশাপাশি আবদি এবং উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় কুর্দি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের প্রধান ইলহাম আহমেদের জন্য সিরীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।

যদিও দামেস্ক থেকে এসব নিয়োগের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি, তবে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাজলুম আবদিকে শারার উপদেষ্টা এবং ইলহাম আহমেদকে পার্লামেন্টের প্রশাসনে নিয়োগ দেওয়া হবে।

ব্যারাক বলেন, এই পদক্ষেপটি তাদের নেতৃত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান, আমাদের কুর্দি অংশীদারদের আত্মত্যাগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় তাদের গঠনমূলক অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দেয়।

‘প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে’

বিশ্লেষকেরা বলেছেন, এসডিএফের বিলুপ্তি একটি ঐক্যবদ্ধ সিরিয়া গঠনের ভিত্তি তৈরিতে সহায়তা করবে।

সিরিয়ান-আমেরিকান অধ্যাপক ও লেখক সালেহ মুবারক বলেন, আসাদ সরকারের পতনের পর সবচেয়ে কম সংঘাতপূর্ণ পথ অনুসরণ করার জন্য আমি উভয় পক্ষের, বিশেষ করে সরকারের প্রশংসা করছি।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, এই পদক্ষেপ দক্ষিণে এবং সম্ভবত পশ্চিমেও থাকা অন্যান্য বিদ্রোহীদের ওপর প্রভাব ফেলবে। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে, সিরিয়া একটি দেশ হিসেবেই থাকবে—এবং আমরা ধর্ম, মাজহাব, ভাষা ও জাতিসত্তাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে যে বৈচিত্র্য ধারণ করি, সেটিকে স্বীকৃতি ও উদযাপন করা হবে। তবে আহমদ শারার সরকার ভাষাগত অধিকারসহ কুর্দিদের অধিকার স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় এখন পর্যন্ত তা প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।

তবুও তিনি বলেন, বড় কোনো সমস্যা ছাড়াই চুক্তিটি এই পর্যায়ে পৌঁছায় উদযাপনের অবশ্যই কিছু কারণ আছে। কিন্তু এটিই গল্পের শেষ নয়। সিরিয়ার গড়পড়তা কুর্দির মধ্যে এই প্রত্যাশা অনেক বেশি যে, এটি সিরিয়ার সবার জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করবে।

উল্লেখ্য, আমেরিকা সিরিয়াকে চূড়ান্ত ভাবে ‘সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্র’ তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার একদিন পর এসডিএফ বিলুপ্তির এই ঘোষণা এসেছে। কয়েক দশক ধরে চালু থাকা ওই তালিকাভুক্তির কারণে সিরিয়ার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপ হয়েছিল। বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়া ও আমেরিকার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে এটি ছিল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

শারা এই পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেছিলেন, “সিরিয়া একটি অন্ধকার কলঙ্ক ঝেড়ে ফেলছে এবং তার অতীতের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় ছিঁড়ে উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণের পথে যাত্রা শুরু করছে।”

সূত্র: আল জাজিরা

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ