ভারতে ইসলাম গ্রহণের পর পারিবারিক বাধা ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বিরোধিতার মুখে পড়া আয়ুষ মালিক, যিনি ইসলাম গ্রহণের পর মুহাম্মাদ আলী নাম গ্রহণ করেন, অবশেষে আদালতে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর হিন্দুধর্মে ফিরে যাওয়ার ভিডিও প্রকাশ করা হলেও আদালতে তিনি জানিয়েছেন, স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং ইসলামই পালন করতে চান।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) এলাহাবাদ হাইকোর্টে বিচারপতি সন্দীপ জৈনের সামনে হাজির হন ৩১ বছর বয়সী মুহাম্মাদ আলী।
আদালতে তিনি জানান, ২০১৪ সালেই নিজের ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন। কেউ তাঁকে জোর করেনি, ভয় দেখায়নি কিংবা কোনো প্রলোভনও দেখায়নি। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে ধর্মের মৌলিক বিধিবিধান পালন করে আসছিলেন তিনি।
কিন্তু তাঁর বাবা দেবরাজ সিং মালিক ও পরিবারের সদস্যরা ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। মুসলিম তরুণী চাঁদনী কুরেশির সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কেও তাঁদের আপত্তি ছিল।
আদালতে মুহাম্মাদ আলী জানান, এসব কারণে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় এবং গত ৪ জুন থেকে বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে তাঁর বাবা দাবি করেন, ছেলেকে প্রভাবিত করা হয়েছে এবং তাঁর মগজধোলাই করা হয়েছে।
তবে মুহাম্মাদ আলীর বক্তব্য শোনার পর আদালত জানান, তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। নিজের ধর্ম, বসবাসের স্থান ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার তাঁর রয়েছে। পরিবারের আপত্তির কারণে সেই স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া যায় না। তাঁর বক্তব্য অবিশ্বাস করার মতো কোনো উপাদানও আদালতের সামনে আসেনি।
শেষ পর্যন্ত তাঁকে মুক্ত করে আদালত জানান, তিনি নিজের পছন্দের স্থানে বসবাস ও ইসলাম পালন করতে পারবেন। চাঁদনীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের বিষয়েও আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
ইসলাম গ্রহণের পর স্ত্রী ও শ্বশুরের গ্রেপ্তার
উত্তর প্রদেশের শামলি জেলার ওষুধ ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান মুহাম্মাদ আলীর নামাজ আদায়ের ভিডিও গত জুনে ছড়িয়ে পড়লে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো তাঁর ইসলাম গ্রহণের বিরোধিতা শুরু করে।
এ সময় মুহাম্মাদ আলী প্রকাশ্যেই জানান, চাঁদনীর সঙ্গে পরিচয়ের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন। বিয়ের জন্য ধর্ম পরিবর্তনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে চাঁদনীকে নিজের স্ত্রী হিসেবেও পরিচয় দেন তিনি।
কিন্তু তাঁর বাবা অভিযোগ করেন, চাঁদনী ও তাঁর পরিবার সম্পত্তির লোভে ছেলেকে ধর্মান্তরিত করেছেন।
গত ৬ জুন বাবার অভিযোগে ধর্মান্তরবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়। এরপর চাঁদনী ও তাঁর বাবা ইসলাম কুরেশিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।
মুহাম্মাদ আলী প্রকাশ্যেই স্ত্রী ও শ্বশুরের গ্রেপ্তারের বিরোধিতা করেন এবং নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে ইসলাম গ্রহণের কথা জানান। এরপরও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা চলতে থাকে। পরে ২৪ জুলাই আদালত চাঁদনী ও তাঁর বাবার জামিন মঞ্জুর করেন।
হিন্দুধর্মে ফেরার ভিডিওর পর আদালতে নতুন মোড়
গত ২৯ জুন মুহাম্মাদ আলীর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। সেখানে তাঁকে হিন্দু ধর্মীয় আচার পালন করতে দেখা যায়। পরিবারের কষ্টের কথা উল্লেখ করে হিন্দুধর্মে ফিরে আসার ঘোষণাও দেন তিনি।
অথচ এর আগে প্রকাশ্যেই তিনি জানিয়েছিলেন, চাপের মুখেও হিন্দুধর্মে ফিরে যাবেন না।
পরিবারের প্রকাশিত ভিডিওটির পর তাঁকে বেআইনিভাবে আটকে রাখার বিষয়টি সামনে আসে। তাঁর বন্ধু সুলতান এ নিয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টে বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ আবেদন করেন।
গত ৯ সেপ্টেম্বর আদালত তাঁকে হাজির করার নির্দেশ দেন।
অবশেষে বুধবার আদালতে হাজির হয়ে মুহাম্মাদ আলী স্পষ্ট করেন, ইসলাম গ্রহণ তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত এবং তিনি স্বাধীনভাবে ইসলাম পালন করতে চান।
আদালত তাঁর বক্তব্যকে অবিশ্বাস করার কোনো কারণ পাননি। একই সঙ্গে তাঁর ধর্মীয় ও ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করে বন্দি প্রত্যক্ষীকরণ আবেদন নিষ্পত্তি করেন।
তবে চাঁদনী ও তাঁর বাবার বিরুদ্ধে দায়ের করা পৃথক ফৌজদারি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এই শুনানিতে হয়নি।
সূত্র : লাইভল, বার অ্যান্ড বেঞ্চ, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও অমর উজালা।











