রাজধানীর বায়তুল মোকাররমের পূর্ব গেটে শুরু হওয়া ইসলামী বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে কবি, লেখক ও ভাষা গবেষক সাইফ সিরাজের ভাষাগদ্যের বই ‘ভাষারাজনীতি: হীনমন্যতা, আভিজাত্য ও পলিটিক্স’। বাংলা ভাষার শব্দ ও সাংস্কৃতিক রাজনীতি নিয়ে বইটি রচিত হয়েছে।
বইটি নিয়ে লেখক সাইফ সিরাজ জানান, দীর্ঘ চার বছর ধরে তিনি এই বইয়ের গদ্যগুলো লিখেছেন। শব্দের বানান, বাংলা বর্ণের হারিয়ে যাওয়া, সহজীকরণের নামে জটিলতা বাড়ানো কিংবা প্রমিত-অপ্রমিতের দ্বন্দ্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বইটিতে আলোচনা করেছেন।
বইটির ‘বাংলা বর্ণের বিপদ’ অধ্যায়ে লেখক বলেন, “আধুনিক সময়ে ‘অন্ত্যস্থ ব’কে বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্ণটিকে বাদ দিয়ে ব-ফলা দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে, এটা কোনোভাবেই শৃঙ্খলা হতে পারে না, সংস্কার হতে পারে না। ব-ফলা দিয়ে কম্বল, প্রতিবিম্ব, লম্বা লেখা যায়। কিন্তু স্বাগত, বিশ্ব, স্বাক্ষর লেখার জন্য ‘অন্ত্যস্থ ব’ লাগে। আমাদের মনে আসছে আর বাদ দিয়ে দিয়েছি। কখনো ভাবিনি, এর ফলে সংকটটা কোথায় তৈরি হবে। এখন কোনো নবীন অথবা কিশোর যদি প্রশ্ন করে, ‘দুইটাই ‘ব’ তাহলে দুইটাতে দুই উচ্চারণ কেন?’ তখন আসলে জবাব থাকে না।”
সাইফ সিরাজ বাংলা ভাষায় আরবি শব্দের বানানে মূলানুগ উচ্চারণের প্রবণতার সমালোচনা করলেও ‘নবী’কে ‘নবি’ না করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। বানানের সংস্কার ও মূলানুগ বানান প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, আরবরা বাংলাদেশকে বলেন ‘বানজালাদিশ’। মিশরকে বলেন ‘মিসর’। মরক্কোকে বলেন ‘মারাকিশ’। জিব্রাল্টারকে বলেন ‘জাবালুত তারিক’। পাকিস্তানকে বলেন ‘বাকিস্তান’। আলজেরিয়াকে বলেন ‘জাজায়ের’। তারা কাছাকাছি উচ্চারণের চেষ্টা করেন না। সাধারণত তাদের কেউ ‘নিজস্ব বানানের’ মতো নিজেই ইনস্টিটিউট বা একাডেমিয়া হয়ে বসেন না।
গ্রন্থটিতে সাইফ সিরাজ উল্লেখ করেন, ইংরেজরা মিশরকে ‘ইজিপ্ট’, হাদিসকে ‘হাদিথ’, ইউসুফকে ‘জোসেফ’, ইয়াকুবকে ‘জ্যাকব’, ইব্রাহিমকে ‘আব্রাহাম’, ভারতকে ‘ইন্ডিয়া’, ইবনে সিনাকে ‘আভিসেনা’ ইত্যাদি বানানে লিখে থাকে। এটি তাদের ভাষার এবং ধর্মীয় কিতাবাদিরও নিজস্বতা। সেখানে এসব নিয়ে খুব একটা বিশৃঙ্খলা দেখা যায় না। তাদের লেখালেখিতে কখনোই আরবির নিকটতম উচ্চারণের প্রচেষ্টা দেখা যায় না।
এভাবে নানাবিধ যুক্তি-তর্ক, ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে আড়াই শত পৃষ্ঠার বইটি শেষ হয়েছে। বইটির পাতায় পাতায় শব্দের অর্থ বদলের রাজনীতি, শব্দ ও শিরোনামে কাউকে অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলার মিডিয়া কারসাজি নিয়ে তিনি আলোচনা করেছেন।
বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাবাজারের রাহনুমা প্রকাশনী। এ প্রসঙ্গে রাহনুমা প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল হক বলেন, ‘এটি একটি মধ্যপন্থার বই। সাইফ সিরাজ ভাষা থেকে ইসলাম দূরীকরণের বিপরীতে যেমন যুক্তি দিয়েছেন, তেমনই ভাষার ইসলামীকরণ প্রচেষ্টারও সমালোচনা করেছেন। আবার ভাষা ও শব্দের ভেতরে কত ধরনের পলিটিক্স লুকিয়ে থাকে, তা-ও সচেতনভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। আমি মনে করি, ‘ভাষারাজনীতি’ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।’
বইটি সম্পাদনা করেছেন জিয়াউদ্দিন সাইমুম।
প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী খন্দকার যুবাইর মাহমুদ।
প্রকাশ করেছেন ‘রাহনুমা প্রকাশনী’।











