ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে অনুষ্ঠিত কথিত ‘ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে’ ঘিরে জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি, মিথ্যা পরিচয় ব্যবহার এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি কে. এম. কামরুল কাদের ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল দেন।
এর আগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরীর পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান গত ৩০ আগস্ট এই রিটটি করেন। রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার, লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার ও চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছে।
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন এডভোকেট মোহাম্মদ আহসান। তাকে সহযোগিতা করেন এডভোকেট ইশরাত হাসান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল।
রুলে গত ১০ জুলাই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে অনুষ্ঠিত কথিত সমলিঙ্গ তথা ট্রান্সজেন্ডার বিয়েকে কেন্দ্র করে জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি ও প্রতারণামূলক ব্যবহার, মিথ্যা পরিচয় প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে এসব অভিযোগ তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
রিটে বলা হয়, গত ১০ জুলাই ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে তাসনুভা আনান শিশিরকে ‘কনে’ হিসেবে উপস্থাপন করে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ঘটনাটি বাংলাদেশের প্রথম ‘ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে’ হিসেবে প্রচারিত হয়।
রিট আবেদনকারীর দাবি, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে দুই জন্মগত পুরুষের মধ্যে বিবাহ বা স্বঘোষিত ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের ভিত্তিতে একজন জন্মগত পুরুষকে বিবাহের উদ্দেশ্যে নারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো বিধান নেই।
রিটে আরও বলা হয়, বিয়ের সময় ‘শিশির বিশ্বাস’ নামে যে জাতীয় পরিচয়পত্র মন্দির কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছিল, তাতে ৬৪৬৫০১৮১৮৯ নম্বরটি ব্যবহার করা হয়। অথচ ওই নম্বরের প্রকৃত জাতীয় পরিচয়পত্রের মালিক মো. জাহিদুল ইসলাম।
রিটে সংযুক্ত নথি অনুযায়ী, তাসনুভা আনানের নিজস্ব জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ৬৪০৬৬৭৭৬১৪। রিট আবেদনকারীর দাবি, জাহিদুল ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে নাম, ছবি, পিতা-মাতার নাম ও জন্মতারিখ পরিবর্তন করে ‘শিশির বিশ্বাস’ নামে একটি ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছিল।
রিটে ২০২৩ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠির উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশে লিঙ্গ পরিবর্তনের বৈধতা প্রদানকারী কোনো আইন বা বিধান নেই বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল।
রিট আবেদনকারীর আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, “এই রিটের বিষয় শুধু কথিত ট্রান্সজেন্ডার বিয়ে নয়। এখানে অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরির গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে এমন একটি বৈবাহিক অবস্থানকে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার কোনো আইনগত স্বীকৃতি বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে নেই। আমরা আদালতের কাছে এসব অভিযোগের তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ চেয়েছি।”
রিটে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৩ ও ২৭, দণ্ডবিধির ৪১৯, ৪৬৮, ৪৭১ ও ৪৯৬ ধারা এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ৩৭৭ ধারার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৪, ১৫৬ ও ১৫৭ ধারা এবং পুলিশ আইন, ১৮৬১-এর ২৩ ধারার আলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
এর আগে রিট আবেদনকারীর পক্ষ থেকে গত ২৪ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নোটিশ ডিমান্ডিং জাস্টিস পাঠিয়েছিলেন এডভোকেট ইশরাত হাসান। নোটিশে তিন দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় রিটটি করা হয়।











