ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নে ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের একাংশ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিল (আইএএমসি)। একইসঙ্গে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের জন্য মসজিদের একটি অংশ অপসারণের প্রতিবাদকারী মুসলিম বাসিন্দাদের ওপর পুলিশের পদক্ষেপেরও নিন্দা জানিয়েছে সংগঠনটি।
এক বিবৃতিতে আইএএমসি জানায়, ২৮ সেপ্টেম্বর মসজিদের বাইরে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করেছে। সংগঠনটির দাবি, সংঘর্ষের পর ২০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। সরকারের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ায় কয়েকজনের বিরুদ্ধেও পুলিশি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানায় তারা।
আরও বিক্ষোভ ঠেকাতে ওই এলাকায় ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে বলেও জানায় আইএএমসি।
কয়েক শতাব্দী পুরোনো এই মসজিদটি একটি প্রস্তাবিত সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প নিয়ে বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে। ২০২৮ সালে উজ্জয়নে অনুষ্ঠিতব্য একটি বড় হিন্দু ধর্মীয় উৎসবকে সামনে রেখে সড়ক প্রশস্তকরণের প্রস্তুতি চলছে। এ জন্য কর্তৃপক্ষ মসজিদের একটি অংশ অপসারণের জন্য চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে নামাজের স্থান ও মিনারের কিছু অংশও রয়েছে।
আইএএমসি জানায়, স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা মসজিদটি এড়িয়ে একটি বিকল্প সড়কপথ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে কর্তৃপক্ষ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।
তিন রাত ধরে অবস্থান কর্মসূচির পর বাসিন্দারা মসজিদের অপেক্ষাকৃত ছোট একটি অংশ নিজেরাই সরিয়ে নিতে সম্মত হন বলে জানা গেছে। তবে আইএএমসির অভিযোগ, এরপরও ঘটনাস্থলে ভাঙার যন্ত্রপাতি নিয়ে আসা হয়। এতে বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে মসজিদের একটি অংশ হাতে ভেঙে ফেলেন।
সংগঠনটি মসজিদের আরও ধ্বংসযজ্ঞ অবিলম্বে বন্ধ এবং পুলিশের পদক্ষেপের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
আইএএমসির সভাপতি মোহাম্মদ জাওয়াদ বলেন, উজ্জয়নের ঘটনা ভারতে মুসলিমদের উপাসনালয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর ওপর চলমান একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন।
জাওয়াদ বলেন, “এটি এমন একটি ক্রমবর্ধমান প্রবণতার অংশ, যেখানে দখল, উন্নয়ন বা অবকাঠামো প্রকল্পের অজুহাতে মুসলিমদের উপাসনালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে হুমকির মুখে পড়ছে, গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে অথবা রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের শিকার হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা নাৎসি শাসনামলে ইহুদিদের উপাসনালয় ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংসের কথা মনে করিয়ে দেয়। তার যুক্তি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা হারানোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কোনো সম্প্রদায়ের ওপর পড়তে পারে।
উজ্জয়নের এই ঘটনা মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা ও সরকারি অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে ভারতে সাম্প্রতিক কয়েকটি বিরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সামনে এসেছে।
প্রয়াগরাজে ২০২৩ সালে সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৬ শতকের একটি শাহী মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। উত্তর প্রদেশের সম্ভলে ২০২৪ সালের নভেম্বরে একটি মসজিদকে ঘিরে বিরোধের পর সহিংস সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত চারজন মুসলিম নিহত হন।
আইএএমসি জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের বিরোধ বেড়েছে। এসব বিরোধের মধ্যে দখল, সড়ক প্রশস্তকরণ ও অন্যান্য অবকাঠামো প্রকল্পের অভিযোগের পাশাপাশি মুসলিম ধর্মীয় সম্পত্তির আইনি অবস্থান নিয়েও বিরোধ রয়েছে।
সংগঠনটি উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন ঘটনাও তুলে ধরেছে। সেখানে নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে ধ্বংসযজ্ঞ ও সরকারের অন্যান্য পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে।
আইএএমসি মধ্যপ্রদেশ সরকারকে উজ্জয়নের মসজিদটির আরও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ এবং পুলিশের পদক্ষেপের বিষয়ে একটি স্বাধীন তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার কারণে যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে সংগঠনটি দাবি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানিয়েছে।
আমেরিকাভিত্তিক সংগঠনটি আরও আমেরিকার পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার সময় মুসলিমদের উপাসনালয় ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টি উত্থাপন করতে।
এ ছাড়া ধর্মীয় স্বাধীনতা বা বিশ্বাসের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকদের প্রতি মুসলিমদের ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা নিয়ে হুমকি ও ধ্বংসযজ্ঞের যে বৃহত্তর প্রবণতা রয়েছে বলে সংগঠনটি দাবি করেছে, তা তদন্ত করে দেখার আহ্বান জানিয়েছে আইএএমসি।
ভারতের ধর্মীয় ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের ওপর এ ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের প্রভাব মূল্যায়ন করতে ইউনেসকো ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যবিষয়ক সংস্থার প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিল আমেরিকায় বসবাসরত ভারতীয় মুসলিমদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি অধিকারভিত্তিক সংগঠন। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সংগঠনটির শাখা রয়েছে।
সূত্র : মুসলিম মিরর











