আমেরিকা ও অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে আবারও যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কার মধ্যে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত স্বেচ্ছাসেবকদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইরান। ‘জানফাদা’ বা ‘জীবন উৎসর্গকারী’ নামে এই কর্মসূচিতে ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ নিবন্ধন করেছেন বলে দাবি করেছে ইরান সরকার। এতে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নিচ্ছেন।
তবে সরকারের এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন কর্মী কর্মসূচিটির ওয়েবসাইটের সোর্স কোড বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, নিবন্ধিত মানুষের সংখ্যা ৪০ লাখেরও কম। নিবন্ধনের জন্য শুধু একটি ফোন নম্বর প্রয়োজন হয়েছে, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরের প্রয়োজন হয়নি।
মার্চের শেষ দিকে আমেরিকা ও অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধের চরম পর্যায়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়। এখন তা ইরানের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির বিভিন্ন শহরের সড়ক ও প্রধান চত্বরে অস্থায়ী প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অধীন বাসিজ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রতিনিধিরা অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
ইরানের ৩১টি প্রদেশের বিভিন্ন শহরে এই কর্মসূচিকে ঘিরে সমাবেশ, শোভাযাত্রা ও সশস্ত্র মহড়া হয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ ইসফাহান, জানজান, শিরাজ, কেরমান, মাশহাদ, বোজনুর্দ ও আহভাজেও এসব আয়োজন করা হয়েছে।
বাসিজের প্রশিক্ষণবিষয়ক উপপ্রধান আলি কাউসারি জানান, তেহরানের অন্তত ১৪টি প্রধান চত্বরকে স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে চায় আইআরজিসি। প্রতিটি প্রদেশের রাজধানীতে অন্তত এক থেকে তিনটি চত্বর এ কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
ইরানের উত্তরাঞ্চলীয় গিলান প্রদেশের এক বাসিন্দা জানান, প্রদেশটির বিভিন্ন শহরের সড়কে নিয়মিত এসব প্রশিক্ষণকেন্দ্র দেখা যায়। সেখানে ম্যাগাজিনে গুলি ভরা, পিস্তল ও অ্যাসল্ট রাইফেল প্রস্তুত করা এবং গুলি ছোড়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। নিরাপত্তার কারণে ওই বাসিন্দা নিজের নাম প্রকাশ করতে চাননি।
গত ১৫ অক্টোবর গিলান প্রদেশের রাশত শহরে সরকারপন্থি একটি সমাবেশকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বিরোধের ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একপর্যায়ে সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা যায়। তবে এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো মন্তব্য করেনি।
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) তেহরানের কাছের কারাজ শহরের বাসিন্দাদের জানফাদার একটি মহড়ার কারণে বিস্ফোরণ ও বিকট শব্দ হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।
ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান প্রদেশের রাজধানী সানানদাজেও বড় পরিসরে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট সংবাদ সংস্থা তাসনিম এটিকে শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের মহড়া হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে বিদেশে অবস্থানরত কয়েকটি ইরানি মানবাধিকার সংগঠন এ ধরনের সশস্ত্র কর্মসূচিকে ভয় দেখানোর অভিযান হিসেবে দেখছে। তাদের বক্তব্য, জানুয়ারিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভে হাজারো বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার কয়েক মাস পর এসব আয়োজন করা হচ্ছে।
ইরান সরকার দাবি করেছে, দেশের সব প্রদেশের ৪০০টির বেশি কাউন্টিতে বিক্ষোভ হয়েছিল। সরকারের অভিযোগ, আমেরিকা ও অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের পরিকল্পনায় ইসলামি শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাতে ওই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। তবে বিক্ষোভ দমনের সময় কর্তৃপক্ষ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে বলে জাতিসংঘের একটি স্বাধীন অনুসন্ধান মিশনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
কাতারে জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেহরান কামরাভা মনে করেন, আমেরিকা ও অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ ইরানের রাজনীতিতে আরও বিপ্লবী মনোভাবাপন্ন শক্তিগুলোর সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
আইআরজিসির কমান্ডার নেমাতুল্লাহ বাঘেরি বলেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার জনগণকে সমর্থন করছে এবং জনগণও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ও ইসলামি বিপ্লবের পাশে রয়েছে, তা তুলে ধরা হচ্ছে।
আয়োজকদের ভাষ্য, নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবকদের ভবিষ্যতে উদ্ধার অভিযান, সামাজিক সেবা এবং গণমাধ্যম ও আর্থিক সহায়তার কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। আমেরিকার যুদ্ধ, নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে সৃষ্ট চাপ কমাতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার কমানোর আহ্বানও জানিয়েছে সরকার।
প্রায় আট মাসের ক্ষয়ক্ষতিপূর্ণ যুদ্ধের পর এই কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছে ইরান সরকার। এই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন, জীবনযাত্রার মানের অবনতি হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার বেসামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কর্মসূচিতে শিশুদেরও যুক্ত করা হচ্ছে। স্কুলগুলোতে এ ধরনের উদ্যোগের পরিসর বাড়ছে। ইরানের শিক্ষামন্ত্রী আলিরেজা কাজেমি জানান, বাসিজ শিক্ষার্থীদের ‘শিক্ষার্থী জানফাদা’ হিসেবে নিবন্ধন করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে শিশুদের নিয়ে আরও কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে।
অধ্যাপক কামরাভার মতে, এ ধরনের জনসম্পৃক্ততা বৃহত্তর সমাজে রাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে সরকারের বিদ্যমান সমর্থকদের মধ্যে আনুগত্য আরও দৃঢ় হতে পারে।
সূত্র: আলজাজিরা











