গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি সংকট নিরসন এবং দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধসহ সাত দফা দাবিতে শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকা থেকে খুলনা, যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়া পর্যন্ত লংমার্চ করবে ১১ দলীয় ঐক্য। প্রায় ৪১০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ কর্মসূচিতে ১৯ জেলার নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অংশ নেবেন। আয়োজকদের আশা, লংমার্চে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি যুক্ত হতে পারে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বেলা ১১টায় রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার। লংমার্চের সার্বিক প্রস্তুতি ও কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের সাত দফা দাবি আদায় এবং সরকারের ব্যর্থতা ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের প্রতিবাদে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে তৃতীয় দফায় এ লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে। আগের দুটি লংমার্চের তুলনায় এবারের কর্মসূচি সবচেয়ে দীর্ঘ।
তিনি বলেন, লংমার্চ সফল করতে ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সাত দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলা এবং সরকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে।
সাত দফা দাবিতে যা বললেন গোলাম পরওয়ার
সাত দফা দাবির প্রথমটি গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার জনগণের গণরায় অস্বীকার করে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর করছে। একই দিনে অনুষ্ঠিত দুটি ভোটের একটির ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, অথচ অন্যটির ফলাফল অস্বীকার করা হচ্ছে। এটি দ্বিচারিতা ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গের শামিল।
তিনি বলেন, সরকার আন্তরিক হলে আগামী ৯ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় সংসদ অধিবেশনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত গণহত্যার বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি উল্লেখ করে জামায়াতের এ নেতা বলেন, ওই আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষ নিহত এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের অনেকে এখনো দেশে-বিদেশে চিকিৎসাধীন। জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের, বিশেষ করে যারা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি, তাদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, সার ও জ্বালানি সংকটের কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। বরং নতুন করে গ্যাসসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বাড়ানোর উদ্যোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারকে অবিলম্বে এসব পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে হত্যা, সহিংসতা, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও রাজনৈতিক সংঘাত বেড়েই চলেছে। এমনকি সরকারি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সরকারের বিভিন্ন স্তরে দলীয়করণ চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পর্যন্ত দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ নিয়োগ, ডিলারশিপ বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। হাটবাজার, ঘাট, বালুমহাল, পরিবহন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে। চাঁদাবাজির ধরন বদলায়নি, শুধু চাঁদাবাজদের পরিচয় ও দলের নাম পরিবর্তন হয়েছে।
১৯ জেলার অংশগ্রহণ, দেড় হাজার গাড়ির বহর
লংমার্চে ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে শুরু করে খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়াসহ মোট ১৯ জেলার নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা অংশ নেবেন বলে জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি বহরে যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কর্মসূচি সফল করতে নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ঢাকা ও খুলনা রেঞ্জের পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায় থেকে সহযোগিতার আশ্বাস পাওয়া গেছে।
লংমার্চের কারণে মহাসড়কে সাধারণ মানুষের চলাচল ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সাময়িক অসুবিধা হতে পারে বলে স্বীকার করেন জামায়াতের এ নেতা। এ জন্য সাধারণ মানুষ, পথচারী, পরিবহনশ্রমিক, ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের কাছে আগাম দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে তাঁরা মহাসড়কের এক পাশ ব্যবহার করে কর্মসূচি পরিচালনার চেষ্টা করবেন।
লংমার্চে অংশগ্রহণকারীদের সর্বোচ্চ ধৈর্য, সংযম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য, স্লোগান কিংবা প্রতিপক্ষকে আঘাত করে এমন আচরণ করা যাবে না। পথে নতুন কোনো জেলা থেকে গাড়ি বহরে যুক্ত হলে সেগুলো বহরের একেবারে শেষ প্রান্তে যুক্ত করতে হবে।
নিরাপত্তা, চিকিৎসা, অ্যাম্বুলেন্স, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত দলগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করবে বলে জানান তিনি। দীর্ঘ যাত্রার জন্য অংশগ্রহণকারীদের প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী সঙ্গে রাখতে হবে। প্রত্যেক গাড়ির টোলের টাকাও নিজ দায়িত্বে প্রস্তুত রাখতে হবে।
বায়তুল মোকাররম থেকে সকাল ৮টায় যাত্রা শুরু
মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ৭টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এতে ১১ দলের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন। এরপর সকাল ৮টায় ছয় শতাধিক গাড়ির বহর নিয়ে লংমার্চ শুরু হবে। পথে আরও গাড়ি যুক্ত হয়ে বহরের সংখ্যা দেড় হাজারে পৌঁছাতে পারে।
লংমার্চের পথ হবে ঢাকা থেকে শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাটের ফকিরহাট, রূপসা সেতু হয়ে খুলনা। এরপর যশোর ও ঝিনাইদহ হয়ে কুষ্টিয়ায় পৌঁছাবে বহর। সেখানে শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভায় অংশ নেবেন লংমার্চের নেতাকর্মীরা।
পথে ছয়টি স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, সকাল ৯টায় শরীয়তপুরের জাজিরার নাওডোবায় প্রথম পথসভা হবে। এরপর বেলা ১১টায় বাগেরহাটের ফকিরহাটের কাঁটাখালীর মোড়ে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে।
দুপুর সাড়ে ১২টায় খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বরে এবং বেলা ২টায় ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডের স্বাধীনতা চত্বরে পথসভা হবে। বিকেল সাড়ে ৩টায় যশোরের মুড়লীর মোড়ে এবং বিকেল ৫টায় ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে।
সবশেষে রাত সাড়ে ৮টায় কুষ্টিয়ার শহীদ আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী জনসভায় যোগ দেবে লংমার্চের বহর।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, মোবারক হোসাইন ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জাহিদুর রহমান এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার।
মিয়া গোলাম পরওয়ার লংমার্চ সফল করতে দেশবাসী, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যমকর্মী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।











