spot_img
spot_img

ইসরাইলি নির্বাচনে ঝুলে থাকা ফল, সরকার গঠনে কঠিন সমীকরণ

ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটের ২৬তম মেয়াদের নির্বাচনের প্রায় চূড়ান্ত ফলাফলে সরকারপন্থী ও বিরোধী কোনো জোটই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে ডানপন্থী কিংবা বাম ও মধ্যপন্থীদের মাধ্যমে সরকার গঠনের কয়েকটি সম্ভাব্য পথ সামনে এলেও সবগুলোই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

নির্বাচনে আরব দলগুলো নজিরবিহীনভাবে ১৯টি আসন পাওয়ায় বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নতুন করে ডানপন্থী সরকার গঠনের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তার জোট পেয়েছে মাত্র ৫৩টি আসন। অথচ ২০২২ সালের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছিল ৬৪টি আসন।

নির্বাচনের ফল পাল্টানোর চেষ্টা হিসেবে নেতানিয়াহু ও ডানপন্থী জোট আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়। তারা অভিযোগ করে, নেসেট নিয়ন্ত্রণ ও ডানপন্থী সরকার পতনের লক্ষ্যে আরব দলগুলো শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। ডানপন্থী নেতারা এ নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে দাবি করেন, নির্বাচনে যা ঘটেছে তা ‘নতুন ৭ অক্টোবর, তবে নরম পদ্ধতিতে’।

নির্বাচনের ফল সরকারপন্থী ও বিরোধী উভয় জোটকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। কারণ উভয় জোটের ভেতরেই শক্তিশালী বিরোধিতা রয়েছে। ফলে নির্বাচনী প্রচারণার সময় যেসব জোটকে তারা পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছিল, এখন সেগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ‘পরিবর্তন জোটের’ ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন। এই জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ‘ইয়াশার’ দলের নেতা গাদি আইজেনকোট। তার দল পেয়েছে ২১টি আসন।

শনিবার সন্ধ্যায় আইজেনকোট আগামী সরকারে আরব দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা অথবা বাইরে থেকে তাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করার বিষয়ে চারটি শর্ত প্রকাশ করেন। এর মধ্যে প্রধান শর্ত হলো ‘রাষ্ট্রের ইহুদি চরিত্র’ ও ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ স্বীকার করা, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া এবং ‘হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা ও গাজ্জা উপত্যকা থেকে তাদের নির্মূলের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া’।

পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আইজেনকোটের এসব শর্ত আরব দলগুলোর সঙ্গে জোটের দরজা খোলার চেয়ে তা বন্ধ করার কাছাকাছি। তিনি বরং ‘প্রচলিত চিন্তার বাইরে’ কিছু পথ খুঁজছেন। এর মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহুর জোটের দুর্বল জায়গায় আঘাত করে সেটিকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা। এ ক্ষেত্রে তিনি অতি-ধর্মীয় হেরেদি দল ‘শাস’ ও ‘ইহুদাত হাতোরাহ’কে নিজের সম্ভাব্য সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। অথবা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে সরকার পতন ঠেকাতে বাইরে থেকে তাদের সমর্থন নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে পারেন।

অন্যদিকে, ‘ইসরাইল বেইতেনু’ দলের নেতা আভিগদোর লিবারম্যানের দল সর্বশেষ নির্বাচনে ৭টি আসন পেয়েছে। গত কয়েক দিনে একাধিক বিবৃতিতে লিবারম্যান স্পষ্ট করেছেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কোনো সরকারে তিনি যোগ দেবেন না। একইভাবে আরব দলগুলো অংশীদার এমন কোনো সরকারেও তিনি যোগ দেবেন না। তার এই অবস্থানের কারণে আইজেনকোটের জোট থেকে ৭টি আসন কমে যায় এবং অনানুষ্ঠানিক জোটটি ৪১টি আসনে নেমে আসে।

গত দুই দিনে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের মধ্যে ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। এ অবস্থায় ‘ইয়েদিওত আহরোনোত’ পত্রিকা লিকুদ দলের সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এমন একটি সমাধানের জন্য যে ছাড় দিতে হবে, তা বহন করা তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন।

কারণ এই জোট নেতানিয়াহুকে নির্বাচনী প্রচারণার সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে বাধ্য করবে। তিনি তখন জোটের বাইরে কোনো জোট না করার এবং তার প্রচলিত অংশীদারদের কাউকে বাদ না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিশেষ করে তাকে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ও কট্টরপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন ‘ইহুদি শক্তি’ দলকে বাদ দিতে হবে।

আইজেনকোট সংখ্যালঘু সরকার গঠনের পথ বেছে নিতে পারেন কি না, সে বিষয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, নির্বাচনী প্রচারণার সময়ও তিনি এই সম্ভাবনার কথা বারবার বলেছিলেন।

তিনি জোটের বাইরের দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের চেষ্টা করছিলেন। এর মধ্যে ছিল ‘ইহুদাত হাতোরাহ’ দল। এই দলটি সর্বশেষ নির্বাচনে পাওয়া ৭টি আসন দিয়ে তাকে সমর্থন করলে তিনি ৫৫টি আসন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতেন, যেখানে নেতানিয়াহুর হাতে থাকত ৫৩টি আসন। তবে হেরেদি দলগুলোর সঙ্গে বসতে লিবারম্যানের আপত্তি থাকায় এই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।

হেরেদিরা এই জোটে সম্মতি দেওয়ার বিনিময়ে বড় ধরনের দাবি করছে। এর মধ্যে প্রধান হলো সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ থেকে অব্যাহতির আইন পাস করা। এমনকি ‘ইয়েশ আতিদ’ দলের নেতা ইয়ার লাপিদও এই দাবি মেনে নিতে রাজি নন।

সবশেষে, অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী ফল আইজেনকোটের সামনে কার্যকর সরকার গঠনের খুব বেশি পথ খোলা রাখেনি। কারণ আরব দলগুলো এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে, যা তাদের ছাড়া সরকার গঠনকে কঠিন করে তুলেছে।

নেতানিয়াহুর সামনেও পরিস্থিতি আইজেনকোটের চেয়ে ভালো নয়। ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় তার জোট ১১টি আসন হারিয়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। বাম ও মধ্যপন্থী দলগুলোর সঙ্গে জোট না করে তিনি ডানপন্থী সরকার গঠন করতে পারবেন না। অথচ এসব দল আলোচনায় বসার আগেই একটি শর্ত দিচ্ছে, ইতামার বেন-গভিরকে সরাতে হবে।

ডানপন্থীরা বিরোধী দল ও আরব দলগুলোর কাছে ১১টি আসন হারিয়েছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, দুটি ডানপন্থী দল নির্বাচনে নির্ধারিত ন্যূনতম ভোটের হার অতিক্রম করতে পারেনি। ফলে ডানপন্থীরা কয়েক লাখ ভোট হারিয়েছে।

এ ছাড়া নেতানিয়াহুর বর্তমান সরকারের প্রতি ইসরাইলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের ক্ষোভও এর অন্যতম কারণ। বিশেষ করে বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচের বিভিন্ন উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড, বাড়িঘর ধ্বংস এবং আরব সমাজে অপরাধের বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। এর ফলে ইসরাইলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা ভোটের বাক্সের মাধ্যমে নিজেদের ভাষায় ডানপন্থী সরকারকে ‘প্রতিশোধ’ দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।

এই পর্যায়ে নেতানিয়াহু প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজগের কাছে প্রথমে আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। তিনি আশা করছেন, আইজেনকোট এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবেন। সরকার গঠনের জন্য তাকে ২৮ দিন সময় দেওয়া হবে, যা আরও দুই সপ্তাহ বাড়ানো যেতে পারে।

আইজেনকোট ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে নিজের প্রস্থান ঠেকাতে নেতানিয়াহু ‘প্রচলিত চিন্তার বাইরে’ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করবেন। এর মধ্যে আইজেনকোটের জোটের নেসেট সদস্যদের নিজের দিকে টেনে আনার চেষ্টাও থাকতে পারে।

সবশেষে, সরকারপন্থী ও বিরোধী উভয় জোটের কার্যকর সরকার গঠনে ব্যর্থ হওয়া এখন একটি বাস্তব সম্ভাবনা হয়ে উঠেছে। সে ক্ষেত্রে আবারও ভোটারদের কাছে ফিরে গিয়ে নতুন নির্বাচন আয়োজনের পথই সামনে আসতে পারে।

এতে নেতানিয়াহু সরকারপ্রধান হিসেবে আরও কিছু সময় থাকার সুযোগ পাবেন। ততদিন তিনি নেসেট সদস্যদের শপথ নেওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ তিনি আশঙ্কা করছেন, বিরোধীরা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে এমন কিছু আইন পাস ও বাতিল করতে পারে, যেগুলো পাস করাতে ডানপন্থীরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে বিচারব্যবস্থা সংস্কারের আইন এবং ৭ অক্টোবরের ঘটনাবলি নিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিশন গঠনের আইন।

সূত্র : সাফা নিউজ এজেন্সি

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ