আমেরিকার সিনেটে প্রথম মুসলিম হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মিশিগানের ডেমোক্র্যাট নেতা আবদুল এল-সায়েদ। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে তার এই বিজয় মুসলিম আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। একই সঙ্গে আমেরিকার জাতীয় রাজনীতিতে আগামী দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তার সামনে।
মুসলিম আমেরিকানদের কাছে এল-সায়েদের এই বিজয় কেবল মিশিগানের একটি আসনে জয়লাভ নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে থাকা একটি রাজনৈতিক বাধা অতিক্রমের ঘটনা। এর মাধ্যমে আমেরিকার অন্যতম ক্ষমতাধর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সিনেটে একজন মুসলিমের কণ্ঠস্বর পৌঁছেছে।
আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে মুসলিম সম্প্রদায় প্রায়ই নানা ধরনের নজরদারি ও সমালোচনার মুখে পড়ে। দেশটির সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দীর্ঘদিন ধরে তাদের প্রতিনিধিত্ব সীমিত। এমন বাস্তবতায় এল-সায়েদের সিনেটে নির্বাচিত হওয়াকে ব্যতিক্রমী অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এল-সায়েদের এই বিজয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত যাত্রা। ডেট্রয়েটে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও বড় আর্থিক স্বার্থের বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াই, নানা পথ পেরিয়ে সিনেট পর্যন্ত পৌঁছেছেন তিনি।
মিশিগানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মিসরীয় অভিবাসী বাবার ঘরে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আবদুল এল-সায়েদের শিকড় এই অঙ্গরাজ্যেই গভীরভাবে প্রোথিত। এখন ওয়াশিংটনে তিনি সেই মিশিগানেরই প্রতিনিধিত্ব করবেন।
তিনি ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে পড়াশোনা করেন। পরে রোডস বৃত্তি পেয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। সেখানে জনস্বাস্থ্য বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
তবে প্রচলিত চিকিৎসক পেশায় না গিয়ে জনসেবাকে বেছে নেন এল-সায়েদ। ২০১৫ সালে ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। শহরটি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর স্বাস্থ্য বিভাগকে নতুন করে গড়ে তোলার কঠিন দায়িত্ব ছিল তার ওপর।
এল-সায়েদের কাজের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন বিভিন্ন সমস্যা। এর মধ্যে ছিল শিশুদের শরীরে সিসার বিষক্রিয়া, স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ এবং চিকিৎসা ব্যয়জনিত ঋণের মতো বিষয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ওয়েইন কাউন্টির স্বাস্থ্য, মানবসেবা ও প্রবীণ সেনাসদস্যবিষয়ক বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
এই অভিজ্ঞতা এবং স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক সেবা পাওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তির আয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়, তার এই বিশ্বাসই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রথম বড় পদক্ষেপ নেন এল-সায়েদ। এ সময় প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেন তিনি। তবে দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হন।
এই পরাজয়ে তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার অবসান ঘটতে পারত। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। লেখালেখি, পডকাস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জনপরিসরে নিজের অবস্থান ধরে রাখেন। এভাবে অনুসারী তৈরি করেন এবং রাজনৈতিক আলোচনায় নিজের নাম সক্রিয় রাখেন। ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স পুনর্নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিলে এল-সায়েদ নতুন সুযোগ দেখতে পান।
২০২৫ সালের এপ্রিলে মাত্র চারজন কর্মী নিয়ে সিনেট নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করেন তিনি। এরপর শুরু হয় প্রাণবন্ত তৃণমূলভিত্তিক প্রচারাভিযান। এ প্রচারণার অংশ হিসেবে ১১০টি শহর সফর করেন এবং ৫০০টির বেশি নির্বাচনী কর্মসূচিতে অংশ নেন। একপর্যায়ে তার স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্কের সদস্যসংখ্যা প্রায় ১২ হাজারে পৌঁছে যায়।
ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করাকে বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি পডকাস্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণ আমেরিকানদের কাছেও পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণার প্রতি এই তরুণদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংশয় তৈরি হয়েছে।
এল-সায়েদের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে নির্বাচনী অনুদান গ্রহণে তার অস্বীকৃতি। তার যুক্তি ছিল, রাজনীতিবিদদের জবাবদিহি করতে হবে ভোটারদের কাছে, ধনী অনুদানদাতা কিংবা প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর কাছে নয়।
তার নির্বাচনী প্রচারণা ব্যক্তিগত অনুদান ও তৃণমূল পর্যায়ের তহবিল সংগ্রহের ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। নির্বাচনী চক্রজুড়ে এভাবে প্রায় ৫৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে তার প্রচারশিবির। তবে এর অর্থ এই নয় যে, তিনি বিপুল অর্থের রাজনৈতিক লড়াই এড়িয়ে গেছেন। বরং বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে এআইপিএসি-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী হেইলি স্টিভেন্সের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। অন্যদিকে, এল-সায়েদের বিরোধিতা করতেও বাইরের বিভিন্ন গোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। তা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটদের দলীয় মনোনয়ন পেতে সক্ষম হন তিনি।
তার নির্বাচনী প্রচারণার মূল বিষয় ছিল সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার, কর্মজীবী পরিবারগুলোর প্রতি সমর্থন এবং করপোরেট প্রভাব কমানো। পাশাপাশি ইসরাইলকে আমেরিকার সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরুদ্ধেও দৃঢ় অবস্থান নেন তিনি। এই অবস্থানের কারণে যেমন সমর্থন পেয়েছেন, তেমনি সমালোচনারও মুখে পড়েছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই লড়াইয়ে এল-সায়েদ এমন একটি জোট গড়ে তুলতে সক্ষম হন, যা তাকে দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে জয় এনে দেয়। শেষ পর্যন্ত সেই জোটের শক্তিতেই রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে সিনেটের আসনে পৌঁছান তিনি।
মুসলিম আমেরিকানদের কাছে এই নির্বাচনের গুরুত্ব দলীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুসলিমরা আমেরিকার সমাজের অংশ। ব্যবসা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জনসেবা এবং আরও অসংখ্য ক্ষেত্রে তাঁরা অবদান রেখে আসছেন। তা সত্ত্বেও দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের উপস্থিতি এখনো সীমিত।
এল-সায়েদের নির্বাচন সেই চিত্রে পরিবর্তন এনেছে। সিনেটে তার প্রবেশ এই বার্তা দিচ্ছে যে, অভিবাসী পরিবারের সন্তানসহ একজন মুসলিম আমেরিকানও জাতীয় রাজনীতির সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হতে পারেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও মিসরীয় বংশপরিচয় রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছিল। তবে তিনি মিশিগানের ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা বিষয়গুলোতেই নিজের মনোযোগ ধরে রাখেন।
এখানে আরও একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দিক রয়েছে। এল-সায়েদ দেখিয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়াও একজন প্রার্থী সুসংগঠিত প্রচেষ্টা, অধ্যবসায় এবং সাধারণ ভোটারদের মনে সাড়া জাগানো বক্তব্যের মাধ্যমে শক্তিশালী নির্বাচনী প্রচারণা গড়ে তুলতে পারেন।
৪২ বছর বয়সে সিনেটে প্রবেশ করছেন এল-সায়েদ। সামনে তার জন্য রয়েছে সময় ও সম্ভাবনার বিশাল সুযোগ। জনস্বাস্থ্য বিষয়ে অভিজ্ঞতা, নির্বাচনী প্রচারণা পরিচালনার দক্ষতা এবং প্রগতিশীল ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তাকে আমেরিকার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
সিনেট তাকে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরার একটি বড় মঞ্চ দেবে। তিনি কীভাবে এই সুযোগ কাজে লাগান, তার ওপরই নির্ভর করবে তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কত দূর এগোবে।
এখনই তার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সম্ভাবনা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়তো কিছুটা আগেভাগে হয়ে যাবে। তবে একদিন ডেমোক্র্যাটদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী ব্যালটে তার নাম দেখা যেতে পারে, এমন ধারণা একেবারে অবাস্তব নয়।
আমেরিকার রাজনীতিতে প্রায়ই অপ্রত্যাশিত প্রার্থীদের উত্থান ঘটে। আর এল-সায়েদ ইতোমধ্যে দেখিয়েছেন, তাকে কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়।
আপাতত তার অর্জনই যথেষ্ট ঐতিহাসিক। তিনি মুসলিম আমেরিকানদের সামনে থাকা একটি বাধা ভেঙেছেন এবং এমন একটি দরজা খুলে দিয়েছেন, যা এর আগে আমেরিকার সিনেটে তাদের নিজেদের কারও জন্য কখনো খোলা ছিল না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি কী করেন, তা হয়তো আরও বড় এক রাজনৈতিক গল্প হয়ে উঠবে।
সূত্র : আরিয়ানা নিউজ











