spot_img
spot_img

কাবুলে সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে সংলাপ শুরু করল আফগান সরকার

আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো আফগান-সেন্ট্রাল এশিয়া পরামর্শ সংলাপ আয়োজন করেছে আফগানিস্তান। কাবুলে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এই সংলাপে সেন্ট্রাল এশিয়ার পাঁচটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। দেশগুলো হলো উজবেকিস্তান, কিরগিজস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান ও কাজাখস্তান। ইমারাতে ইসলামিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ সংলাপের লক্ষ্য হলো বহুপক্ষীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলা, কূটনৈতিক সমন্বয় জোরদার করা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো এবং পুরো অঞ্চলে সংযোগ বৃদ্ধি করা।

রোববার কাবুলে অনুষ্ঠিত এ সংলাপকে আঞ্চলিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ইমারাতে ইসলামিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাওলানা আমীর খান মুত্তাকী। তিনি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনের স্বাগতিক হতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং পারস্পরিক আস্থা, স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতা এগিয়ে নিতে এ প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাওলানা আমীর খান মুত্তাকী বলেন, এই সংলাপের লক্ষ্য হলো আফগানিস্তান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ জোরদার করা, অর্থনৈতিক একীকরণ এগিয়ে নেওয়া এবং কূটনৈতিক সমন্বয় শক্তিশালী করা। তিনি আরও বলেন, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক সংযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতার সুযোগ অনুসন্ধানেও এ সংলাপ গুরুত্ব দেবে।

মাওলানা মুত্তাকী আফগানিস্তান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বন্ধনের কথা তুলে ধরেন। তিনি এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন এবং ইমাম আবু হানিফা, ইমাম বুখারি ও এ অঞ্চলের আরও বহু প্রভাবশালী আলেম ও চিন্তাবিদের কথা বলেন, যারা একটি অভিন্ন ঐতিহ্য গড়ে তুলতে অবদান রেখেছেন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, আফগানিস্তান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার সম্পর্কের বর্তমান বয়ান সংঘাতের নয়, বরং সুযোগ ও সহযোগিতার। তার ভাষায়, সমৃদ্ধি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন অর্জনের জন্য আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জগুলো সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করাই সবার সম্মিলিত লক্ষ্য।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। তার মতে, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলোর একসঙ্গে পথ চলা প্রয়োজন।

পাকিস্তান প্রসঙ্গে মাওলানা মুত্তাকী বলেন, আফগানিস্তান দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো সংলাপ ও কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে একই সঙ্গে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রেও তারা দৃঢ়। তিনি বলেন, আফগানিস্তান পারস্পরিক সম্মান ও সংলাপের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়, তবে নিজেদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার অধিকারও তাদের রয়েছে।

আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতিগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাওলানা মুত্তাকী ভারসাম্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামো প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে সেন্ট্রাল এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে, যাতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফগানিস্তানের উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে তিনি একটি স্থিতিশীল ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, ব্যাপক দুর্নীতির অবসান এবং মাদক চাষ প্রায় পুরোপুরি নির্মূল হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক নীতির লক্ষ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং বিশেষ করে সেন্ট্রাল এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা।

এই সংলাপ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে ওঠে। মাওলানা মুত্তাকী আশাব্যঞ্জক বাণিজ্য পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ২০২৫ সালে সেন্ট্রাল এশিয়ার সঙ্গে আফগানিস্তানের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। তার ভাষায়, আগামী ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে এ বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করাই লক্ষ্য।

তিনি বলেন, সেন্ট্রাল এশিয়াকে দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা আফগানিস্তানের কৌশলগত অবস্থান দেশটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। আলোচনায় তাপি গ্যাস পাইপলাইন, কাসা-১০০০ জ্বালানি প্রকল্প, লাপিস লাজুলি বাণিজ্য রুট এবং ছয়-জাতি করিডরের মতো প্রকল্প উঠে আসে।

তাপি গ্যাস পাইপলাইন প্রসঙ্গে বলা হয়, হেরাত-তুর্কমেনিস্তান সীমান্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং ১২০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের প্রস্তুতি রয়েছে। কাসা-১০০০ প্রকল্পের মাধ্যমে কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন এগিয়ে যাচ্ছে বলেও জানানো হয়। পাশাপাশি বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক সংযোগকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল নিরাপত্তা ও সীমান্ত সহযোগিতা। তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানসহ সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আফগানিস্তানের ২ হাজার ৩০০ কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত রয়েছে। এ সংলাপে যৌথ নিরাপত্তা উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়, বিশেষ করে মাদক পাচার, অবৈধ অভিবাসন ও উগ্রবাদের মতো সীমান্তপারের হুমকি মোকাবিলার বিষয়ে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সীমান্ত স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর প্রচেষ্টাকেও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হয়।

আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে মাওলানা মুত্তাকী কয়েকটি প্রস্তাব দেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, নিয়মিত বৈঠকের মাধ্যমে আফগানিস্তান-সেন্ট্রাল এশিয়া পরামর্শ সংলাপকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া, বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতার রূপরেখা তৈরির জন্য বিশেষজ্ঞ সম্মেলনের আয়োজন, অভিন্ন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত উদ্বেগ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা ও গ্রিন সেন্ট্রাল এশিয়ার মতো উদ্যোগে আঞ্চলিক অংশগ্রহণ আরও বিস্তৃত করা।

সমাপনী বক্তব্যে তিনি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সমর্থন ও অঙ্গীকারের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি আঞ্চলিক সম্পৃক্ততায় আফগানিস্তানের বাস্তববাদী ও সহযোগিতামূলক অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তার মতে, এই সংলাপ একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও আন্তঃসংযুক্ত অঞ্চল গড়ে তোলার পথে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

এই প্রথম আফগানিস্তান-সেন্ট্রাল এশিয়া পরামর্শ সংলাপকে আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে অভিন্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন। ধারাবাহিক সংলাপ ও সহযোগিতা বজায় থাকলে সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলো ও আফগানিস্তান আরও সমন্বিত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।

সূত্র : আরিয়ানা নিউজ

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ