আজ ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত জুলাই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত বিজয়ের দুই বছর পূর্ণ হলো। বিপ্লবীদের ভাষায় দিনটি ‘৩৬ জুলাই’। ২০২৪ সালের এই দিনে লাখো মানুষের অপ্রতিরোধ্য জনস্রোতের মুখে ক্ষমতা ও গণভবন ফেলে বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
তার পলায়নের মধ্য দিয়ে অবসান ঘটে সাড়ে ১৫ বছরের দমন-পীড়ন, গুম-খুন, ভোটাধিকার হরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কবজা করে গড়ে তোলা হাসিনা রেজিমের। যে শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে, মানুষকে আয়নাঘরে বন্দী রাখা হয়েছে, আলেম ও মাদরাসার ছাত্রদের রক্ত ঝরানো হয়েছে এবং গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে, ছাত্র-জনতার সম্মিলিত অভ্যুত্থানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই ব্যবস্থার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।
দুই বছর আগের সেই সকাল শুরু হয়েছিল গভীর উদ্বেগ ও অজানা আশঙ্কার মধ্যে। আগের দিন দেশজুড়ে ব্যাপক রক্তপাত ঘটেছিল। অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি ছিল। রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছিল বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্য। উদ্দেশ্য ছিল, ঢাকার বাইরে থেকে কোনো আন্দোলনকারী যেন রাজধানীতে প্রবেশ করতে না পারেন।
কিন্তু ফজরের পর থেকেই বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। জনশূন্য সড়ক ধীরে ধীরে ভরে ওঠে ছাত্র-জনতার মিছিলে। যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, উত্তরা, মিরপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, বকশীবাজার ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হতে থাকে মানুষ। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই, গণভবন।
গণভবনমুখী জনস্রোত
সকালে বকশীবাজারে শহীদ মিনারগামী মিছিলে গুলি চালানোর খবর আসে। হতাহতের পরও মানুষের অগ্রযাত্রা থামেনি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর চারদিক থেকে নামতে থাকে জনতার ঢল।
গুলি, টিয়ারগ্যাস, সাঁজোয়া যান, ব্যারিকেড ও কারফিউ কোনো কিছুই সেদিন জনস্রোতকে থামাতে পারেনি। রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক, শহরতলি থেকে কেন্দ্র, সর্বত্র একই স্লোগান ধ্বনিত হচ্ছিল। জনতার স্রোত যত সামনে এগোচ্ছিল, হাসিনা রেজিমের প্রতিরোধ ততই দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
পতন অনিবার্য বুঝতে পেরে একপর্যায়ে পিছু হটতে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। যে সরকার মাত্র এক দিন আগেও নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ক্ষমতা রক্ষার চেষ্টা করেছিল, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
বাইরে জনতা যখন গণভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন ভেতরে চলছিল শেখ হাসিনার ক্ষমতা ও জীবন রক্ষার শেষ হিসাব-নিকাশ।
জমে থাকা ক্ষোভ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণবিস্ফোরণ হঠাৎ তৈরি হয়নি। এর পেছনে ছিল সাড়ে ১৫ বছরের জমে থাকা ক্ষোভ।
২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফেরার পর শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে দেশের নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১১ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচনের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
পিলখানার রক্তাক্ত অধ্যায়
ক্ষমতায় ফেরার মাত্র দুই মাসের মাথায় ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত হয় দেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড। বিডিআর সদর দপ্তরের ভেতরে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের জিম্মি ও নির্যাতন করা হয়; বহু মরদেহ গণকবরে চাপা দেওয়া হয়।
হত্যাকাণ্ডের সময় সেনা কর্মকর্তাদের উদ্ধারে দ্রুত অভিযান না চালানো, আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ এবং নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের আড়াল করার প্রশ্ন দীর্ঘদিন চাপা দিয়ে রাখে হাসিনা রেজিম। রাষ্ট্রীয় তদন্ত ও বিচারেও হত্যাকাণ্ডের পুরো সত্য, ষড়যন্ত্রের উদ্দেশ্য এবং নেপথ্যের শক্তির পরিচয় উন্মোচিত হয়নি। ৫ আগস্টের পর পিলখানা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন ও দায়ীদের বিচারের দাবি নতুন করে সামনে আসে।
২০১৪ সালের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বিরোধী দলগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়াই। ১৫৩টি আসনে কোনো ভোটের প্রয়োজন হয়নি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারার ঘটনা ঘটে, যা ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রধান বিরোধী দলগুলোকে বাইরে রেখে আওয়ামী লীগের নিজস্ব নেতাদের স্বতন্ত্র ও ডামি প্রার্থী বানিয়ে আরেকটি নির্বাচন আয়োজন করা হয়।
ভোটাধিকার হরণের পাশাপাশি ভিন্নমত দমনে ব্যবহার করা হয় পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা ও দলীয় বাহিনীকে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়। অনেককে গ্রেপ্তার করে বছরের পর বছর কারাগারে রাখা হয়। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা হয়ে ওঠে হাসিনা রেজিমের পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
শাহবাগ থেকে শাপলা ও আয়নাঘর
হাসিনা রেজিমের দমন-পীড়নের অন্যতম বড় শিকার ছিল দেশের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তি, আলেম-উলামা ও মাদরাসার শিক্ষার্থীরা।
আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারের নামে গঠিত ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্বকে একে একে কারাগারে পাঠানো হয়। তাদের কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত অপরাধের বিচারকে সামনে রাখা হলেও বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিপক্ষের সুযোগ, আইন পরিবর্তন এবং মৃত্যুদণ্ডের পদ্ধতি নিয়ে দেশি-বিদেশি আইনজ্ঞ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো গুরুতর প্রশ্ন তোলে। বিশ্লেষকদের কাছে এ বিচার ন্যায়বিচারের চেয়ে ইসলামপন্থী একটি রাজনৈতিক শক্তির নেতৃত্ব নির্মূলের প্রক্রিয়া হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।
২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণার পর শাহবাগে গড়ে তোলা হয় গণজাগরণ মঞ্চ। মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি দ্রুত জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ, ইসলামী প্রতিষ্ঠান বর্জন এবং ইসলামপন্থী সংবাদমাধ্যম বন্ধের আন্দোলনে রূপ নেয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্লগারের ইসলাম ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে অবমাননাকর লেখা সামনে আসার পর গণজাগরণ মঞ্চের ইসলামবিরোধী চরিত্র আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে।
ইসলাম, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং ইসলামী মূল্যবোধের বিরুদ্ধে এ আক্রমণের প্রতিবাদে আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে হেফাজতে ইসলামের আন্দোলন। নাস্তিক ব্লগারদের বিচারসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে সারা দেশ থেকে লাখো আলেম, মাদরাসার ছাত্র ও ধর্মপ্রাণ মানুষ ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করেন। দিনভর অবরোধ শেষে তারা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন।
২০১৩ সালের ৫ মে দিবাগত রাতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থানরত হেফাজতে ইসলামের নিরস্ত্র আলেম-উলামা ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের ওপর পরিকল্পিত ও সমন্বিত গণহত্যা চালায় হাসিনা রেজিম। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে চারদিকের প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির যৌথ বাহিনী অন্ধকারের মধ্যে নির্বিচারে গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। রাতের সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। পরে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘটনার প্রকৃত চিত্র ও হতাহতের সংখ্যা আড়াল করার চেষ্টা চালানো হয়।
শাপলা গণহত্যায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত হয়নি। তবে বহু মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার তথ্য এবং নিহতের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন বিভিন্ন অনুসন্ধান ও প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় উঠে এসেছে। স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের বদলে আলেম, মাদরাসার ছাত্র এবং হেফাজতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির পথ বেছে নেয় হাসিনা রেজিম।
২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদেও একই দমননীতির পুনরাবৃত্তি ঘটে। ঢাকার বায়তুল মোকাররম, চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আলেম, মাদরাসার ছাত্র ও বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়। ২৬ থেকে ২৮ মার্চের মধ্যে অন্তত ১৪ জন নিহত হন এবং কয়েক শ মানুষ আহত হন। এরপর হেফাজতের শীর্ষ নেতা, আলেম ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক মামলা ও গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয়।
রাষ্ট্রের প্রকাশ্য দমননীতির পাশাপাশি ছিল গোপন বন্দিশালা। ‘আয়নাঘর’ হয়ে ওঠে এমন এক ব্যবস্থার প্রতীক, যেখানে মানুষকে তুলে নিয়ে তার অস্তিত্ব পর্যন্ত অস্বীকার করা হতো। পরিবারের সদস্যরা বছরের পর বছর জানতেন না, তাদের স্বজন জীবিত আছেন কি না।
হাসিনা রেজিমের পতনের পর একাধিক গোপন আটককেন্দ্রের তথ্য সামনে আসে। গুমসংক্রান্ত তদন্তে বিভিন্ন নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকা গোপন বন্দিশালা, জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ এবং নির্যাতনের কাঠামোর তথ্যও প্রকাশিত হয়।
হাসিনা রেজিম ‘জঙ্গিবিরোধী অভিযান’-এর নামে দেশজুড়ে গুম, গোপন আটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি ভয়ংকর রাষ্ট্রীয় কৌশল গড়ে তুলেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন স্থান থেকে তরুণদের তুলে নিয়ে দিনের পর দিন গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখত। পরে সাজানো অভিযান ও বন্দুকযুদ্ধের নাটক মঞ্চস্থ করে তাদের হত্যা করা হতো এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘জঙ্গি’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হতো। কল্যাণপুর ও পাতারটেক ছিল এ ধরনের বহুল আলোচিত ঘটনার দুটি উদাহরণ মাত্র। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের উপস্থাপনায় উঠে এসেছে, আটক তরুণদের পূর্বপরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট স্থানে জড়ো করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে অভিযান সাজিয়ে হত্যা করা হতো। ইসলামপন্থী পরিচয়, সরকারবিরোধী অবস্থান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক বক্তব্যের কারণেও অনেকে এই রাষ্ট্রীয় হত্যাযজ্ঞের লক্ষ্যবস্তু হন। নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ব্যবহার করে পরে এসব গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকে ‘সফল জঙ্গিবিরোধী অভিযান’ হিসেবে প্রচার করা হয়।
গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ
হাসিনা রেজিম শুধু রাজপথের বিরোধিতা দমন করেনি, নিপীড়নের খবর মানুষের কাছে পৌঁছানোর পথও বন্ধ করেছে।
২০১৩ সালের এপ্রিলে দৈনিক আমার দেশ কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পত্রিকাটির ছাপাখানা বন্ধ করে প্রকাশনা থামিয়ে দেওয়া হয়।
এর কয়েক সপ্তাহ পর শাপলা গণহত্যার রাতে ঘটনাস্থলের চিত্র প্রচার করছিল দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভি। ৬ মে ভোরে দুটি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। শাপলার মাঠে আলেম ও মাদরাসার ছাত্রদের ওপর অভিযান চলার পাশাপাশি সেই দৃশ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমগুলোর চোখও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।
হাসিনা রেজিমের গণমাধ্যম দমন থেকে মুসলিম বিশ্বকেন্দ্রিক বাংলা সংবাদমাধ্যম ইনসাফও রেহাই পায়নি। ২০১৯ সালের শেষ দিকে কোনো লিখিত নোটিশ বা প্রকাশ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই বাংলাদেশে ‘ইনসাফ’ ব্লক করে দেওয়া হয়। পরে বিকল্প ডোমেইনে সংবাদ প্রকাশ শুরু হলেও ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের আগে সেটিতেও প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি, আমার দেশ ও ইনসাফের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং প্রতিবন্ধকতা ছিল একই দমননীতির অংশ। সরকারের নিয়ন্ত্রিত বয়ানের বাইরে ইসলামপন্থী, সরকারবিরোধী ও নিপীড়িত মানুষের বক্তব্য যেন শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য প্রচলিত ও ডিজিটাল উভয় গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।
হাসিনার পতনের এক দফা
দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণের উপলক্ষ তৈরি করে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন।
প্রথমদিকে আন্দোলনের দাবি ছিল কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার। কিন্তু শিক্ষার্থীদের দাবি অবজ্ঞা করা, আন্দোলনকারীদের অবমাননা এবং ছাত্রলীগকে তাদের বিরুদ্ধে নামিয়ে দেওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রীসহ সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার দৃশ্য দেশজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী বিক্ষোভ দমনে গুলি, টিয়ারগ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে।
রংপুরে নিরস্ত্র আবু সাঈদ দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দাঁড়ানোর পর পুলিশের গুলিতে নিহত হন। সেই দৃশ্য আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়। পানি বিতরণ করতে গিয়ে মীর মুগ্ধের লুটিয়ে পড়া, ওয়াসিমের রক্তাক্ত দেহ, এপিসি থেকে ইয়ামিনকে ফেলে দেওয়া এবং একের পর এক তরুণের মৃত্যুর দৃশ্য মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দেয়।
আন্দোলন দমনে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ সীমিত করা হয়। কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী নামানো হয়। রাতের অন্ধকারে বাড়ি বাড়ি অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরবর্তী অনুসন্ধানে উঠে আসে, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলন ও তা দমনের প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু।
হত্যাকাণ্ড যত বেড়েছে, আন্দোলনে মানুষের অংশগ্রহণও তত বিস্তৃত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রাস্তায় নামে স্কুল-কলেজের ছাত্র, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শ্রমিক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, শিল্পী, অভিভাবক, আলেম, মাদরাসার ছাত্র এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা।
কোটা সংস্কারের দাবি পেরিয়ে আন্দোলন পরিণত হয় রাষ্ট্র সংস্কারের লড়াইয়ে। ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার পদত্যাগের এক দফা ঘোষণা করা হয়। ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়।
জুলাইয়ের লড়াইয়ে ইসলামপন্থীরা
জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা থাকলেও চূড়ান্ত বিজয়ের পেছনে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরের মানুষ অংশ নেয়। মাদরাসার ছাত্র, আলেম-উলামা ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তির অবদান ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাষ্ট্রীয় দমনযন্ত্রের চরিত্র তাদের কাছে নতুন ছিল না। শাপলা গণহত্যা, মোদিবিরোধী আন্দোলনে গুলি, আলেমদের কারাবাস এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা জুলাইয়ে ছাত্রদের পাশে দাঁড়ান।
মাদরাসার শিক্ষার্থীরা যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, সাইনবোর্ড, বাড্ডা, উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেন। ঢাকার বাইরেও হাটহাজারী, পটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদরাসার ছাত্র ও ইসলামপন্থী জনতা বিক্ষোভ ও প্রতিরোধে অংশ নেয়।
বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী এলাকায় তাদের ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। মাদরাসার শিক্ষার্থীরা পুলিশের বাধার মুখে সড়কে অবস্থান নেন, আহতদের উদ্ধার করেন, খাবার ও পানি সরবরাহ করেন এবং গণভবনমুখী জনস্রোত সচল রাখতে ভূমিকা রাখেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রায় এক শ আলেম, হাফেজ ও মাদরাসা শিক্ষার্থী শাহাদাতবরণ করেন। দীর্ঘ অনুসন্ধান, শহীদ পরিবারের সাক্ষ্য ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে ইতোমধ্যে ৮৫ জনের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। যাত্রাবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্মুখসারিতে থেকে তাদের আত্মত্যাগ ও প্রতিরোধ জুলাই অভ্যুত্থানের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি মাদরাসার ছাত্রদের রক্তেও অর্জিত হয়েছে ৩৬ জুলাইয়ের বিজয়।
কৌশলগত কারণে রাজনৈতিক দলগুলো আন্দোলনের প্রকাশ্য নেতৃত্বে না থাকলেও বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির এবং অন্যান্য ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির নেতাকর্মীরা মাঠপর্যায়ে অংশ নেন। জুলাইয়ের শেষ দিকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেও আন্দোলন থামানো যায়নি।
শেষ মরণকামড়েও ঠেকেনি পতন
এক দফা ঘোষণার পর শেখ হাসিনা ক্ষমতা ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ব্যবহারের শেষ চেষ্টা চালান। ৪ আগস্ট দেশজুড়ে ব্যাপক প্রাণহানির পরও রাতে গণভবন ও সামরিক নিয়ন্ত্রণকক্ষে বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক হয়। ঢাকার প্রবেশপথে কঠোর অবস্থান নিয়ে পরদিনের গণজমায়েত ঠেকানোর পরিকল্পনা করা হয়।
কিন্তু পরিস্থিতি ততক্ষণে হাসিনা রেজিমের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতও কমে আসছিল। দেশের বিভিন্ন দিক থেকে ঢাকার দিকে এগিয়ে আসছিল লাখো মানুষ।
সেনাবাহিনীর ভেতরেও সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালিয়ে হাসিনা সরকারকে রক্ষার বিষয়ে আপত্তি জোরালো হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর করতে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি না চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর পূর্ণ সমর্থন হারানোর পর হাসিনার ক্ষমতায় টিকে থাকার শেষ ভরসাও ভেঙে পড়ে।
গণভবনে হাসিনার শেষ সকাল
৫ আগস্ট সকালেও গণভবনে বৈঠক হয়। পরে প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনা তখনো ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হচ্ছিলেন না। তিনি পুলিশপ্রধানকে দেখিয়ে সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান, পুলিশ আন্দোলন দমন করতে পারলে সেনাবাহিনী কেন পারবে না।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরিস্থিতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে আর বেশি সময় কঠোর অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব নয়। বাহিনীর সদস্যরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতও প্রায় শেষ।
সামরিক কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে বোঝান, ঢাকার চারদিক থেকে লাখো মানুষের মিছিল গণভবনের দিকে এগিয়ে আসছে। দ্রুত ক্ষমতা ছেড়ে নিরাপদ স্থানে না গেলে তাকে আর সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।
পরে প্রকাশিত বিবরণে বলা হয়, শেখ রেহানা প্রথমে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তাতেও তিনি রাজি না হলে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জয় মায়ের সঙ্গে কথা বলার পর শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়তে সম্মত হন।
৪৫ মিনিট, তারপর দিল্লির পথ
গণভবনমুখী জনস্রোত দ্রুত এগিয়ে আসায় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গোছানোর জন্য শেখ হাসিনাকে প্রায় ৪৫ মিনিট সময় দেওয়া হয়। তিনি জাতির উদ্দেশে একটি ভাষণ দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বলেও পরে প্রকাশিত বিবরণে উঠে আসে। কিন্তু হাতে সময় না থাকায় তাকে সে সুযোগ দেওয়া হয়নি।
বেলা সোয়া ১টার দিকে ঘোষণা আসে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। এই ঘোষণার পরই মানুষ বুঝতে পারে, হাসিনা রেজিমের পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বেলা আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনার পলায়নের খবর ছড়িয়ে পড়ে। বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে গণভবন থেকে বের হন তিনি। সামরিক হেলিকপ্টারে তাদের কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে নেওয়া হয়। সেখান থেকে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানে দিল্লির উদ্দেশে পালিয়ে যান।
বিমানটি দিল্লির অদূরে উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। পরে শেখ হাসিনাকে দিল্লির একটি নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
সাড়ে ১৫ বছর ধরে কঠোর হাতে দেশ শাসন করা শেখ হাসিনার বিদায় ছিল করুণ। যে গণভবন থেকে তিনি রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতেন, সেই গণভবন থেকে মাত্র কয়েকটি ব্যাগ নিয়ে তাকে পালাতে হয়। দলীয় নেতাকর্মী ও প্রশাসনে থাকা অনুগতদের ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে নিজের নিরাপত্তার জন্য দিল্লির আশ্রয় নেন তিনি।
জনতার বিজয়, ক্ষোভের বিস্ফোরণ
হাসিনা দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজধানীসহ সারা দেশে বাঁধভাঙা বিজয়োল্লাস শুরু হয়। শাহবাগ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় সংসদ ভবন, গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
মানুষ জাতীয় পতাকা হাতে রাস্তায় নামে। ঢাকার অলিগলি থেকে জেলা, উপজেলা ও গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে আনন্দ মিছিল। চট্টগ্রামের দুই নম্বর গেট, মুরাদপুর, জিইসি, আগ্রাবাদ, চকবাজার ও নিউমার্কেটসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো মানুষের উচ্ছ্বাসে ভরে যায়।
জনতার একটি বড় অংশ গণভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রবেশ করে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে ভোটাধিকার হরণ, গুম, হত্যা, মামলা, কারাবন্দিত্ব ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের প্রতীক হয়ে ওঠা বিভিন্ন দলীয় কার্যালয়, শেখ মুজিবের মুরাল ও স্থাপনাতেও ক্ষুব্ধ মানুষ প্রবেশ করে। কিছু স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নে জমে থাকা জনক্ষোভের প্রেক্ষাপটেই এসব ঘটনা ঘটে।
বিজয়ের দিনেও বিভিন্ন স্থানে গুলি ও প্রাণহানি ঘটে। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পরও যাত্রাবাড়ী, সাভার ও আশুলিয়ার কয়েকটি স্থানে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর অভিযোগ আসে। ফলে বিজয়ের দিনটিও বহু পরিবারকে স্বজন হারানোর বেদনা দিয়ে যায়।
খালেদা জিয়ার মুক্তি ও ছত্রভঙ্গ আওয়ামী লীগ
বিকেলে জাতির উদ্দেশে বক্তব্যে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হবে। তিনি হত্যাকাণ্ড ও অন্যায়ের বিচারের আশ্বাস দিয়ে জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি, আহতদের চিকিৎসা এবং নিহতদের পরিবারকে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তির সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। ২০১৮ সালে কারাবন্দী এবং ২০২০ সাল থেকে সরকারের শর্তে গৃহবন্দী থাকা খালেদা জিয়া পরদিন মুক্তি পান। হাসিনা রেজিমের পতনের পর তার মুক্তি দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়নের অবসানের অন্যতম প্রতীকী ঘটনায় পরিণত হয়।
হাসিনার পলায়নের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতৃত্ব দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও দলীয় নেতাদের অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। কেউ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে পালান, কেউ বিমানযোগে অন্য দেশে আশ্রয় নেন।
যে দল রাষ্ট্রীয় বাহিনী, প্রশাসন এবং দলীয় শক্তির ওপর নির্ভর করে সাড়ে ১৫ বছর দেশ শাসন করেছিল, ক্ষমতার আশ্রয় হারানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই দলের সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
৩৬ জুলাইয়ের অসমাপ্ত অঙ্গীকার
৫ আগস্টের বিজয় কোনো ব্যক্তি, দল বা একক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্জন নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সূচনা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন স্কুল-কলেজের ছাত্র, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, নারী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আলেম, মাদরাসার ছাত্র এবং সাধারণ মানুষ।
এই ইতিহাসে শাপলা গণহত্যার ক্ষত বহন করা, মোদিবিরোধী আন্দোলনে গুলি ও কারাবাসের শিকার হওয়া এবং দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় দমন সহ্য করা ইসলামপন্থী জনগোষ্ঠীর অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকার প্রবেশপথে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ, আহতদের উদ্ধার এবং ৫ আগস্ট গণভবনমুখী জনস্রোত এগিয়ে নেওয়ার ভূমিকা জুলাইয়ের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের অংশ।
দুই বছর পরও সবচেয়ে বড় সত্য হলো, ৫ আগস্ট কোনো শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের ফল ছিল না। অসংখ্য শহীদের রক্ত, হাজার হাজার আহত মানুষের যন্ত্রণা এবং লাখো মানুষের জীবন বাজি রেখে রাজপথে নামার মধ্য দিয়ে এই বিজয় অর্জিত হয়েছে।
হাসিনা দিল্লিতে পালিয়েছেন, তার রেজিমের পতন হয়েছে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য শুধু একজন শাসককে সরানো ছিল না। লক্ষ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্র নির্মাণ, যেখানে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে কোনো ব্যক্তি বা দল অনির্দিষ্টকাল ক্ষমতায় থাকতে পারবে না; রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে না; আয়নাঘরে মানুষকে অদৃশ্য করা যাবে না এবং সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠ বন্ধ করে সত্যকে চাপা দেওয়া যাবে না।
৩৬ জুলাই বাংলাদেশের মানুষকে দেখিয়েছে, অস্ত্র, কারাগার, গুম, সেন্সরশিপ ও দলীয় শক্তি দিয়ে একটি জাতিকে চিরকাল বন্দী রাখা যায় না। জনতার সম্মতি ছাড়া কোনো ক্ষমতা স্থায়ী নয়।
৫ আগস্ট তাই শুধু হাসিনার দিল্লিতে পলায়নের দিন নয়। এটি জুলাইয়ের শহীদ, আহত, নিপীড়িত রাজনৈতিক কর্মী, কারাবন্দী আলেম, মাদরাসার ছাত্র, কণ্ঠরুদ্ধ সংবাদমাধ্যম এবং দীর্ঘদিনের বঞ্চিত মানুষের সম্মিলিত বিজয়ের দিন। শহীদদের রক্তে লেখা সেই বিজয়ের ইতিহাস রক্ষা এবং ফ্যাসিবাদের সব কাঠামো নির্মূল করাই এখন জাতির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।











