গোবর, গোমূত্র ও কথিত প্রাচীন টোটকা দিয়ে সন্তানহীনতা দূর করা এবং ত্বকের রোগ সারানোর দাবি করে বিতর্কের কেন্দ্রে এসেছেন ভারতের কথক অনিরুদ্ধাচার্য জি মহারাজ। তার এসব বক্তব্য নিয়ে দেশটির বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনুসারীদের অনেকে তার কথায় আস্থা রাখলেও চিকিৎসক ও বিজ্ঞানমনস্ক ব্যক্তিরা এসব দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
অনিরুদ্ধাচার্যের সবচেয়ে আলোচিত দাবিগুলোর একটি হলো, সন্তানহীনতার সমস্যা দূর করতে গোবরের সঙ্গে বেরিয়ে আসা গম দিয়ে তৈরি রুটি খাওয়া। তার দাবি, কোনো দম্পতি সন্তানহীনতার সমস্যায় ভুগলে আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) বা আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে বিশেষ এক দেশি পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারেন।
বছরখানেক আগে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রথমে একটি গরুকে আস্ত গম খাওয়াতে হবে। এরপর গরুর গোবরের সঙ্গে বেরিয়ে আসা অপাচ্য গম সংগ্রহ করতে হবে। পরিষ্কার পানি দিয়ে গম ধুয়ে রোদে শুকিয়ে গুঁড়া করে আটা তৈরি করতে হবে। সেই আটা দিয়ে রুটি বানিয়ে ভগবানকে নিবেদন করার পর খেলে পুরুষের শুক্রাণুর সমস্যা এবং নারীর জরায়ুর বিভিন্ন জটিলতা দূর হতে পারে বলে দাবি করেন তিনি। এমনকি এ পদ্ধতিতে সন্তান লাভও সম্ভব বলে দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া অনিরুদ্ধাচার্যের দাবি, খাঁটি দেশি গরুর গোবর শরীরে মাখলে কিংবা তা দিয়ে গোসল করলে ত্বকের বিভিন্ন রোগ সেরে যায় এবং ত্বকে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা ফিরে আসে। অন্যদিকে, বিস্কুটের মতো আধুনিক প্যাকেটজাত খাবারকে তিনি ‘বিষ-কিট’ বা বিষের সমতুল্য বলে আখ্যা দিয়েছেন। পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনে গোমূত্র ব্যবহারের পক্ষেও কথা বলেছেন তিনি।
গত এক থেকে দুই বছরে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রবচন ও টেলিভিশনের সরাসরি বিতর্ক অনুষ্ঠানে তার এসব বক্তব্য সামনে এসেছে। জি নিউজ ও টাইমস নাউ নবভারতের মতো চ্যানেলে গোবর ব্যবহার করে সৌন্দর্য বৃদ্ধি এবং গোবর থেকে পাওয়া গমের মাধ্যমে সন্তান লাভের দাবিগুলো নিয়ে সরাসরি বিতর্ক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার আয়োজন করা হয়েছে। টিভি৯ ভারতবর্ষে সম্প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারেও সন্তান লাভের জন্য গোবরের সঙ্গে বেরিয়ে আসা গমের আটা দিয়ে তৈরি রুটি খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল প্রকাশিত টিভি৯ ভারতবর্ষের একটি প্রতিবেদনেও তার এ বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে।
গত কয়েক বছরে তার এসব বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং লাখ লাখবার দেখা হয়েছে। প্রাচীন গ্রন্থ ‘রঘুবংশমে’ বর্ণিত রাজা দিলীপের কাহিনির ব্যাখ্যা দিয়েও নিজের এসব দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছেন তিনি।
অনিরুদ্ধাচার্যের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে তার বক্তব্যে আস্থা রেখে অনেক অনুসারী এসব পদ্ধতি অনুসরণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সন্তানহীনতার মতো সংবেদনশীল ও মানসিকভাবে কষ্টদায়ক বিষয়কে কেন্দ্র করে এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক পরামর্শ ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সন্তান লাভের আশায় কিছু দম্পতি আধুনিক চিকিৎসার পরিবর্তে এসব কথিত টোটকার ওপর নির্ভর করতে পারেন। একইভাবে ত্বকের রোগ সারানোর আশায় গোবর শরীরে মাখার মতো অস্বাস্থ্যকর পদ্ধতিও অনুসরণ করতে পারেন অনেকে। এতে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিস্তার ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
অনিরুদ্ধাচার্যের দাবিগুলোর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নিয়েও চিকিৎসক ও যুক্তিবাদীরা প্রশ্ন তুলেছেন। টেলিভিশনের বিতর্ক অনুষ্ঠানে চিকিৎসক ও যুক্তিবাদী আলোচকেরা বলেছেন, গোবর বা পশুর মল থেকে পাওয়া শস্যদানা খেলে সন্তানহীনতা দূর হয়, এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ক্লিনিক্যাল বা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণায়ও গোবর ও গোমূত্রের কথিত স্বাস্থ্যগত উপকারিতার দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরিশোধিত গোবর বা পশুর মলের সংস্পর্শে আসার ফলে বিভিন্ন জীবাণু ও সংক্রমণের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এতে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, পেটের অসুখ ও পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।
গরুকে হিন্দু ধর্মে পবিত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এর সমর্থনে প্রাচীন ধর্মীয় গ্রন্থের উল্লেখও করেন অনেকে। তবে সমালোচকদের বক্তব্য, ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞানের দাবিকে এক করে দেখা উচিত নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই না করা এবং স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পদ্ধতিকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে প্রচার করা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। তাদের মতে, এ ধরনের প্রচার ভারতের সংবিধানে উল্লিখিত বিজ্ঞানমনস্কতা ও অনুসন্ধিৎসু মনোভাব গড়ে তোলার মৌলিক কর্তব্যেরও পরিপন্থি।
সব মিলিয়ে, ধর্মীয় বিশ্বাস ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে অবৈজ্ঞানিক স্বাস্থ্যপরামর্শ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গরুকে পবিত্র মনে করা এক বিষয়, আর গোবর ও গোমূত্রকে আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি গ্রহণের আগে তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি যাচাই করা জরুরি।
সূত্র: টিভি৯ ভারতবর্ষ, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব হেলথ প্ল্যানিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট, রয়টার্স।











