পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের সরকার ও সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার মধ্যেই জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের আমীর মাওলানা ফজলুর রহমানের পরিবার ও ঘনিষ্ঠ নেতাদের ঘিরে তৎপরতা জোরদার করেছে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো। একের পর এক দুর্নীতির তদন্ত, তলব, প্রশাসনিক নোটিশ এবং সরকারি মন্ত্রীদের প্রকাশ্য আক্রমণকে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের জন্য চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখছে জমিয়ত। দলটির দাবি, সরকারের নীতির বিরোধিতা এবং সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
সর্বশেষ রোববার (৮ নভেম্বর) মাওলানা ফজলুর রহমানের ছেলে ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মাওলানা আসাদ মাহমুদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়েরের সুপারিশ করেছে পাকিস্তানের ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এফআইএ)। পাকিস্তান পোস্টে অবৈধ নিয়োগের অভিযোগে তলবের পরও হাজির না হওয়ায় তাঁকে ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্ত এড়িয়ে চলা ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে তাঁর নাম বিদেশযাত্রা নিয়ন্ত্রণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগে জাতীয় জবাবদিহি ব্যুরো (ন্যাব) আগামী ১০ নভেম্বর আসাদ মাহমুদকে তদন্ত দলের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। ২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান পোস্টে নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে এই তদন্ত চলছে। ওই সময় শাহবাজ শরীফের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন আসাদ মাহমুদ।
তদন্তকারী সংস্থাগুলোর দাবি, পাকিস্তান পোস্টে ৩ হাজার ৯৩৮টি পদে নিয়োগের অনুমোদন থাকলেও ৪ হাজার ২৫২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিলুপ্ত ঘোষিত পদে নিয়োগ, জাল নথি ব্যবহার এবং নিয়োগবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
সরকারের মিত্র থেকে বিরোধী অবস্থানে জমিয়ত
পাকিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের পেছনে রয়েছে সরকার ও জমিয়তের সম্পর্কের বড় ধরনের পরিবর্তন। ২০২২ সালে ইমরান খানের সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শাহবাজ শরীফের নেতৃত্বে জোট সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মাওলানা ফজলুর রহমান। তাঁর দলও ওই সরকারের অংশ ছিল।
কিন্তু ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। নির্বাচনে কারচুপি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে নতুন সরকারে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকে জমিয়ত। এরপর থেকে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনীর প্রভাবের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সমালোচনা করে আসছেন মাওলানা ফজলুর রহমান।
সাম্প্রতিক সময়ে এই বিরোধ আরও তীব্র হয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নর শাসন জারিকে কেন্দ্র করে।
গত ১১ অক্টোবর ইমরান খানের দল পিটিআইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা স্থগিত করে সেখানে গভর্নর শাসন জারি করে কেন্দ্রীয় সরকার। পাশাপাশি সেনাবাহিনী মোতায়েনেরও অনুমোদন দেওয়া হয়। নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিকে সরকার এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও মাওলানা ফজলুর রহমান একে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার জন্য উদ্বেগজনক বলে সমালোচনা করেন।
অক্টোবরের শেষ দিকে জাতীয় পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেনাবাহিনীর প্রভাব এবং শাহবাজ শরীফ সরকারের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাকিস্তান কোনো নির্দিষ্ট জেনারেলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর এসব বক্তব্যের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভী প্রকাশ্যে কঠোর সমালোচনা করেন। পাল্টা জবাবে জমিয়ত নেতারা অভিযোগ করেন, সরকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার পরিবর্তে সেনাবাহিনীর সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে।
মাওলানা ফজলুর রহমানের পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক পদক্ষেপ
সরকারের সঙ্গে বিরোধ তীব্র হওয়ার মধ্যেই গত ৩০ অক্টোবর ইসলামাবাদে মাওলানা ফজলুর রহমানের ব্যবহৃত বাসভবনে অবৈধ স্থাপনার অভিযোগে নোটিশ দেয় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)।
বাড়িটির আইনগত মালিকের নামে দেওয়া ওই নোটিশকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ বলে মন্তব্য করেন মাওলানা ফজলুর রহমানের ছেলে মাওলানা আসজাদ মাহমুদ। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক মতবিরোধকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধে রূপান্তর করা হচ্ছে।
এরপর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আসাদ মাহমুদসহ জমিয়তের একাধিক নেতা ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর তৎপরতা সামনে আসে।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, এফআইএ, ন্যাব ও সিডিএ পৃথক অনুসন্ধানের মাধ্যমে মাওলানা ফজলুর রহমানের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিভিন্ন কার্যক্রম পরীক্ষা করছে।
এদিকে ৪ নভেম্বর ইসলামাবাদে মাওলানা ফজলুর রহমানের বাসভবনে পিটিআইসহ বিরোধী দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর শাসন এবং সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়।
একসময় ইমরান খানের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে পিটিআইয়ের এই যোগাযোগ পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
চাপ দিয়ে জমিয়তের অবস্থান বদলানো যাবে না: মাওলানা ফজলুর রহমান
সরকারি সংস্থাগুলোর তৎপরতার প্রতিবাদে ইতোমধ্যে পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। দলটির নেতারা মাওলানা ফজলুর রহমান ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত সম্মানহানির চেষ্টা চালানোর অভিযোগ করেছেন।
শনিবার (৭ নভেম্বর) ইসলামাবাদে এক সম্মেলনে মাওলানা ফজলুর রহমান বলেন, জবাবদিহির নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চালানো হচ্ছে। তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের চাপের মধ্যে রাখা হচ্ছে।
তিনি জানান, দীর্ঘ ৩৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির মামলা হয়নি। অথচ এখন তাঁকে দুর্নীতিবাজ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে।
জমিয়ত প্রধান বলেন, তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ নতুন কোনো বিষয় নয়। অতীতেও এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছেন তাঁরা। কিন্তু কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করে জমিয়তের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করানো যাবে না।
তিনি আরও বলেন, জমিয়ত কোনো কর্তৃপক্ষের তৈরি রাজনৈতিক দল নয়; বরং ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক শক্তি।
অন্যদিকে সরকারি কর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, দুর্নীতিবিরোধী তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রচলিত আইন অনুযায়ী নেওয়া হচ্ছে।
তবে সরকার ও সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে মাওলানা ফজলুর রহমানের সমালোচনা তীব্র হওয়ার মধ্যেই তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক রাষ্ট্রীয় সংস্থার তৎপরতা পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় গভর্নর শাসনের বিরোধিতা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে অবস্থান এবং পিটিআইসহ বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের পর এসব পদক্ষেপকে রাজনৈতিক চাপের অংশ হিসেবে দেখছে জমিয়ত। যদিও তদন্তগুলোর পেছনে সরকার বা সেনাবাহিনীর সরাসরি রাজনৈতিক নির্দেশ থাকার স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত প্রমাণ এখনো প্রকাশিত হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে একসময়ের সরকারঘনিষ্ঠ জমিয়ত এখন সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাতে অবস্থান করছে। রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি পরিবার ও ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক তদন্তের মধ্যেও নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকার ঘোষণা দিয়েছেন মাওলানা ফজলুর রহমান।
সূত্র: দুনিয়া নিউজ, এআরওয়াই নিউজ, ডন, আজ নিউজ ও দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন (পাকিস্তান)।











