spot_img

পাকিস্তান যুদ্ধ চাইলে আমরা যুদ্ধ করবো, আর শান্তি চাইলে আমরা শান্তির জন্য প্রস্তুত: আফগানিস্তান

আফগানিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোল্লা মুহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদ বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বিরোধ সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে আফগান সরকার ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু ইসলামাবাদের অনড় অবস্থান এবং উত্তেজনা বাড়ানোর নীতির কারণে সেই প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি।

তোলো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, কাবুল পাকিস্তানের সঙ্গে বিভিন্ন দেশে একাধিক দফা আলোচনা করেছে। এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্কে। তবে বৈঠকগুলোর সময়কার ইঙ্গিত থেকে বোঝা যাচ্ছিল, পাকিস্তান পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবেই পরিস্থিতিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মোল্লা ইয়াকুব বলেন, আলোচনায় আফগান প্রতিনিধি দল স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, উভয় দেশের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের প্রতি সম্মান বজায় রেখে পারস্পরিক লিখিত নিশ্চয়তার ভিত্তিতে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে তারা প্রস্তুত। প্রস্তাব ছিল, দুই দেশের কোনো ভূখণ্ডই যেন অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়।

তিনি বলেন, আলোচনার সময় আফগান সরকার জোর দিয়ে বলেছিল, বাণিজ্যিক সড়ক বন্ধ করা বা অভিবাসীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা সমস্যার সমাধান নয়। বরং এমন মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করতে পারে।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, আলোচনায় পাকিস্তান একটি দাবি তোলে, বিতর্কিত ‘ডুরান্ড লাইন’-এর পরিবর্তে “আনুষ্ঠানিক সীমান্ত” শব্দটি ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু আফগান প্রতিনিধি দল জানিয়ে দেয়, এই বিষয়টি জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এটি সরকারের এখতিয়ারের বিষয় নয়।

তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান আফগানিস্তানকে অনুরোধ করেছিল, ডুরান্ড লাইনের এপাশে বসবাসরত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে, যেমনটি তারা ওপাশে করে থাকে। কিন্তু কাবুল এই প্রস্তাব সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করে।

মোল্লা ইয়াকুব জানান, আলোচনা যখন সৌদি আরবে গড়ায়, তখন নতুন কিছু দাবি তোলা হয়। এর মধ্যে ছিল জাতিসংঘের তালিকাভুক্ত কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর বিষয়। তবে কাবুল স্পষ্ট করে জানায়, “সন্ত্রাসবাদ” শব্দটির কোনো একক ও সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। তাই এভাবে বিষয়টি তুলে ধরা সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।

তিনি বলেন, এসব আলোচনায় আফগান প্রতিনিধি দল সদিচ্ছা দেখিয়েছিল। সৌদি প্রতিনিধি দল কাবুল সফর করলে আফগানিস্তান পাকিস্তানি সামরিক বন্দিদের মুক্তি দেয়। একই সঙ্গে কাবুল একটি স্পষ্ট প্রস্তাব দেয়, দুই দেশের ভূখণ্ড যেন একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও জানান, আফগানিস্তান মধ্যস্থতাকারীদের কাছে তথ্য দিয়েছিল যে আইএসের সদস্য এবং আফগান সরকারের বিরোধীরা পাকিস্তানে সমর্থন, সংগঠন ও সমাবেশের সুযোগ পাচ্ছে। এসব বিষয় একটি স্পষ্ট চুক্তির মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানানো হয়।

তিনি বলেন, আফগানিস্তান পাকিস্তানকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, আফগান ভূখণ্ডে কোনো ধরনের লঙ্ঘন গ্রহণযোগ্য নয়। কাবুল আশা করেছিল, সৌদি মধ্যস্থতার মাধ্যমে ইসলামাবাদ শান্তির বার্তা দেবে। কিন্তু আফগান বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোয় সেই আশা ভেঙে যায়।

মোল্লা ইয়াকুব বলেন, আফগানিস্তান যুদ্ধ শুরু করেনি; তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল আত্মরক্ষার অংশ। তিনি জানান, আফগান বাহিনী সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে, অথচ আফগান বেসামরিক নাগরিকরাই হামলার শিকার হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, শুরুতে আফগান প্রতিক্রিয়া সীমিত ছিল। কিন্তু পাকিস্তান পক্ষ থেকে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় সেই প্রতিক্রিয়ার পরিসর ধীরে ধীরে বেড়েছে।

আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, কাবুল পাকিস্তানের জনগণ বা তাদের বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শত্রুতা মনে করে না। যুদ্ধ চলবে কি না বা শেষ হবে কি নাম, তা ইসলামাবাদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

তার ভাষায়, “পাকিস্তান যদি যুদ্ধ বেছে নেয়, আমরা যুদ্ধ করব। আর যদি শান্তি বেছে নেয়, আমরা শান্তির জন্য প্রস্তুত।”

মোল্লা ইয়াকুব জানান, আফগান সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কোনো বার্তা তারা পায়নি, যা পাকিস্তানের শান্তির প্রস্তুতির ইঙ্গিত দেয়। তবে তিনি বলেন, কূটনীতির দরজা এখনো সবার জন্য খোলা রয়েছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব উভয় দেশের ওপরই পড়বে। কাবুলে অস্থিরতা দেখা দিলে ইসলামাবাদেও অস্থিরতা দেখা দেবে। আফগানিস্তান কখনোই মেনে নেবে না যে তাদের রাজধানীকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে এবং তারা কোনো জবাব দেবে না।

মোল্লা ইয়াকুব মুজাহিদ আরও জানান, আফগানিস্তান পাকিস্তান ও তেহরিকে তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) মধ্যে বিরোধ সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছিল। এই উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়।

মোল্লা ইয়াকুব অভিযোগ করেন, ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আফগান সরকারকে সন্ত্রাসবাদের সমর্থক হিসেবে তুলে ধরতে চায়। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে এমন একটি পরিকল্পনা থাকতে পারে যার লক্ষ্য আফগানিস্তানে অবশিষ্ট অস্ত্র ধ্বংস করা।

তিনি বলেন, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বোমাবর্ষণে সামরিক স্থাপনাগুলোও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। এর মধ্যে বাগরাম ঘাঁটিও রয়েছে, যা বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন। ঘাঁটিটি হস্তান্তর না করলে খারাপ পরিণতির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।

মোল্লা ইয়াকুবের মতে, পাকিস্তানের নীতি হচ্ছে আফগানিস্তানকে দুর্বল অবস্থায় রাখা, যাতে প্রয়োজনে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। পাকিস্তানের কিছু পক্ষ এমনও চায়, কাবুল যেন তার পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের সময় ইসলামাবাদের সঙ্গে পরামর্শ করে, যা আফগানদের কাছে অবাস্তব।

বক্তব্যের শেষে আফগান প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বকে তাদের নীতি পরিবর্তনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতাকে যৌথ স্বার্থ হিসেবে দেখা উচিত।

একই সঙ্গে তিনি আফগান জনগণকে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান এবং সরকারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য নাগরিকদের প্রশংসা করেন।

পাশাপাশি পাকিস্তানের জনগণ, রাজনীতিবিদ ও আলেমদের প্রতিও তিনি বার্তা দেন। তিনি বলেন, আফগানিস্তান পাকিস্তানের জনগণের সঙ্গে শত্রুতা চায় না। তাই তিনি তাদের আহ্বান জানান, সামরিক নেতৃত্বকে বোঝাতে যে, যুদ্ধ অব্যাহত রাখা দুই দেশের কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না।

সুত্র: হুরিয়াত রেডিও

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ