বর্তমান সরকারের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও জ্বালানি ক্রয়ের নীতিমালাজনিত সংকটের কারণে দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং এবং জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম।
বুধবার (১২ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে ‘লুটপাট নয়, উৎপাদন; বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা’ এবং জনগণের সরকারের কথা বললেও বাস্তবে ‘অলিগার্কদের সরকার’ গড়ে উঠছে। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যেই নিজেদের প্রতিশ্রুত ‘নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি’ থেকে সরে গিয়ে বিপরীত পথে হাঁটছে।
তিনি বলেন, বিএনপির ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ খাতে দায়মুক্তি আইনসহ সব ‘কালাকানুন’ বাতিলের স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল। পতিত ফ্যাসিবাদী সরকার এসব আইনের আড়ালে কুইক রেন্টাল ও আইপিপির নামে ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছিল এবং বিএনপি তখন এর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল। এখন বিএনপি সরকার নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিই মানছে না।
নাহিদ ইসলাম বলেন, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে, বসুন্ধরা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস বড় পরিমাণে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও নিজস্ব ব্যবস্থায় বাজারজাতের অনুমতি চেয়ে সরকারকে চিঠি দিয়েছে। এরপর ৬ আগস্ট জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বিপিসিকে মাত্র চার দিন সময় দিয়ে ১০ আগস্টের মধ্যে ‘বেসরকারি খাতে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণন নীতিমালা ২০২৬’-এর খসড়া জমা দিতে বলে।
এর বিপক্ষে মত দেওয়ায় বিপিসির চেয়ারম্যানকে ‘অন্যায়ভাবে’ সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নাহিদ প্রশ্ন রাখেন, ‘জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্বালানি নীতিমালার খসড়ার জন্য চার দিনের সময় দেওয়া বিএনপির সুশাসনের কী নমুনা?’
একই সঙ্গে ২৮ জুলাই অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মেয়াদের জ্বালানি তেল আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ১০ দিন করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তার দাবি, এতে বড় আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা অংশ নিতে পারবেন না এবং দরদাতা সংকট তৈরি হয়ে দাম বাড়ার পাশাপাশি ‘সিন্ডিকেটের দরজা’ খুলে যাবে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যদি অংশীজনদের মতামত নেওয়াই উদ্দেশ্য হতো, তবে চার দিনের আলটিমেটাম কেন? তদন্ত কমিটিতে দুই দিন কেন? বিপিসির চেয়ারম্যান অপসারণে এই তাড়াহুড়ো কীসের ইঙ্গিত?’
বিএনপি সরকারের সঙ্গে ‘লোডশেডিং’ শব্দটি আবার সমার্থক হয়ে উঠছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ২০০১-২০০৬ মেয়াদেও উৎপাদন না বাড়িয়ে বিতরণ লাইন বাড়ানোর অসমন্বিত ‘উন্নয়ন’ দেখা গেছে। দুই দশক পরেও বিএনপি শিক্ষা নেয়নি।
সরকারের পক্ষ থেকে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার মতো অর্থ নেই, এমন বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেশের গ্রস রিজার্ভ প্রায় ৩৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ৩২ বিলিয়ন ডলার।
তিনি আরও বলেন, ১ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে ৯১৫ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বাস্তবে ডলার রয়েছে। নেই সময়মতো ক্রয়ের শিডিউল ও সময়সূচিভিত্তিক ক্রয় পরিকল্পনা। তার দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্ধারিত শিডিউল অনুযায়ী প্রথম কয়েক মাস জ্বালানি এসেছে। এরপর প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে ক্রয়প্রক্রিয়া সচল রাখা হয়নি। সেখান থেকেই বিপর্যয়ের শুরু।
তিনি বলেন, বিষয়টি এমন নয় যে বিপিসিকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ব্যর্থ হয়েছে। বরং বিপিসিকে ক্রয় শিডিউলের অনুমোদনই সময়মতো দেওয়া হয়নি।
নাহিদ ইসলাম প্রশ্ন তোলেন, ‘পছন্দের সরবরাহকারীর ব্যাপারে চাপ দিতে গিয়েই কি আমদানির শিডিউল বিপর্যস্ত হয়েছে?’
একটি পরিকল্পিত কাঠামো দাঁড় করানো হচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ করতে দাও না, সংকট তৈরি হোক, বলো সরকারি খাত পারছে না, বেসরকারি অলিগার্কের হাতে লাইসেন্স তুলে দাও।’
বিদ্যুৎ বিতরণেও একই কৌশল নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, ভুতুড়ে বিল ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলে পরে বিদ্যুৎ বিতরণ বেসরকারিকরণের যুক্তি তৈরি করা হচ্ছে। এর পেছনে ‘কমিশন ও রেন্ট সিকিং’ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দেশে বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোডশেডিং চলছে বলেও দাবি করেন নাহিদ ইসলাম।
বিবৃতিতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১০ আগস্ট রাত ১টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগে ৯ আগস্ট ৩ হাজার ৬৭১ এবং ৩ আগস্ট ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছিল।
তিনি বলেন, বর্তমানে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। গ্রামাঞ্চলে দিনে ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না।
সরকার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে সংকটের কারণ হিসেবে দেখালেও পিজিসিবির তথ্য তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগেই এপ্রিলে লোডশেডিং পরিস্থিতি নাজুক ছিল।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ দৈনিক লোডশেডিং ছিল ৪১ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা, জুলাইয়ে ৩২ হাজার এবং আগস্টে ৫৩ হাজার কিলোওয়াট ঘণ্টা।
তিনি বলেন, ‘অর্থাৎ যুদ্ধ শুরুর আগেই সংকট তৈরি হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ একমাত্র কারণ নয়।’
নাহিদ ইসলাম বলেন, ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আগুন লাগার পর দৈনিক ৫১ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। ৫ আগস্ট আংশিক সরবরাহ ফিরে আসে।
এ ঘটনায় স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে তিনি প্রশ্ন করেন, রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ত্রুটি ছিল কি না এবং এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন কোথায়।
একই সঙ্গে দেশের গ্যাস সরবরাহের এক-চতুর্থাংশ দুটি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আংশিক সরবরাহ ফিরতে ১৫ দিন লাগা একটি রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতা কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, জনস্বার্থে বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ক্রমে নিয়ন্ত্রিত গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষক হয়ে উঠছে।
এলপিজির উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বেসরকারি আমদানিকারকদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পর সিলিন্ডারের দাম কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা মানুষ নিজের পকেটেই টের পেয়েছে।
এখন ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনেও একই পথে হাঁটার আয়োজন চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু পরিবহন ভাড়া নয়, সেচ ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে বাজারের প্রতিটি পণ্যের দামে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের অভিযোগ শুধু একটি দলের বিরুদ্ধে ছিল না, বরং একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল। যে ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কয়েকটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থে নির্ধারিত হতো এবং এর খেসারত দিত সাধারণ মানুষ।
তিনি বলেন, ‘মানুষ রক্ত দিয়েছে শাসক বদলানোর জন্য নয়, ব্যবস্থা বদলানোর জন্য।’
তার অভিযোগ, বিএনপি সরকারের হাতে রাষ্ট্র এখন জনগণের প্রতিনিধি নয়, ‘গুটিকয় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ব্যবস্থাপক’ হয়ে উঠছে।
## সংকট মোকাবিলায় নাহিদ ইসলামের ১৫ দফা প্রস্তাব
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছেন নাহিদ ইসলাম।
আগামী ৩০ দিনের জন্য তার প্রস্তাবগুলো হলো:
১. তড়িঘড়ি বেসরকারিকরণ প্রক্রিয়া স্থগিত করে উন্মুক্ত অংশীজন আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া।
২. আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ১০ দিন থেকে আবার ৪২ দিনে ফিরিয়ে নেওয়া।
৩. বিপিসির সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ক্রয় শিডিউল অবিলম্বে অনুমোদন এবং আগামী চার থেকে ছয়টি অর্থনৈতিক প্রান্তিকের ক্রয় ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা।
৪. মহেশখালী এফএসআরইউ দুর্ঘটনার স্বাধীন কারিগরি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
৫. গ্যাস বরাদ্দে তথ্যভিত্তিক অগ্রাধিকার সূচক চালু করা।
৬ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে তার প্রস্তাবগুলো হলো:
৬. বিপিসির একচেটিয়া ভাঙতে প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্র, একাধিক অংশীদার, স্বচ্ছ জবাবদিহি ও রাষ্ট্রীয় কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা।
৭. পরিশোধিত তেলের পরিবর্তে অপরিশোধিত তেল আমদানির সুযোগ দিয়ে নিজস্ব রিফাইনারি স্থাপনের শর্ত আরোপ করা। একই সঙ্গে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ দ্রুত শেষ করা।
৮. ক্যাপাসিটি চার্জের পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা করা এবং দায়মুক্তি আইন বাতিল করা।
৯. আইপিপির বকেয়া নিষ্পত্তিতে আঞ্চলিক মডেল অনুসরণ করে বিতরণ সংস্থাগুলোর সিস্টেম লস কমানো ও আদায়-দক্ষতা বাড়ানোর বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা।
১০. বিদ্যুৎ বিলে স্মার্ট মিটারিং বাধ্যতামূলক করা।
১১. এলপিজির দাম মানুষের সাধ্যের মধ্যে ফিরিয়ে এনে বিদ্যমান মনোপলি ভাঙতে নতুন উদ্যোক্তা যুক্ত করা।
১২. মহেশখালীর বাইরে তৃতীয় ও চতুর্থ এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা।
১৩. সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে পিএসসি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা এবং দীর্ঘ সিদ্ধান্তহীনতায় চলে যাওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া।
১৪. বাপেক্সে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি রিজার্ভার ব্যবস্থাপনা, অনুসন্ধান ও উন্নয়নকূপ খননে অভিজ্ঞ বিদেশি অংশীদার যুক্ত করা।
১৫. সৌরবিদ্যুৎকে সাধারণ মানুষের নাগালে আনতে প্যানেল, কনভার্টার, ব্যাটারি ও অ্যাপ্লায়েন্সের শুল্ক শূন্যে নামানো, নেট মিটারিং ও ফিড-ইন কাঠামো স্পষ্ট করা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা দৃশ্যমান করা।
নাহিদ ইসলাম বলেন, জ্বালানি খাত জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন। এখানে ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দেয় কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও ছোট ব্যবসায়ী, যারা কোনো কমিশন পান না।
তিনি বলেন, সরকারের প্রথম দায় জনগণের প্রতি, কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর প্রতি নয়। এই সহজ কথাটি পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার ভুলে গিয়েছিল। বিএনপি সরকারও ভুলে যাওয়ার পথে।
নাহিদ ইসলাম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘মাফিয়া তোষণের মূল্য বাংলাদেশ একবার দিয়েছে, আর নয়। এবারের ভুল, ব্যর্থতা ও অলিগার্ক তোষণের নীতি এনসিপি রুখে দাঁড়াবে।’










