ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইতিহাস প্রমাণ করে, যারা অন্যের ওপর দাদাগিরি করে, জুলুম করে এবং শক্তির ওপর নির্ভর করে, শেষ পর্যন্ত তাদের পরাজয় বা ধ্বংসের মুখোমুখি হতে হয়।
তিনি বলেন, অন্য মানুষের সঙ্গে কেমন আচরণ করা হয়েছে এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়েছে কি না, তার জন্য ব্যক্তি, পরিবার ও শাসকদের জবাবদিহি করতে হবে বলেও জানান তিনি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভারতের ধর্মীয় আলেম, বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে এক বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, আমেরিকা ও ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধের ভিত্তি হলো দাদাগিরির বিরোধিতা এবং নির্যাতিত মানুষের প্রতি সমর্থন। কোনো শক্তিশালী সরকার অন্য দেশগুলোর ওপর নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারে বা তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য করতে পারে, এমন ধারণা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
তিনি বলেন, আমেরিকা বিভিন্ন দেশকে স্বাধীন হয়ে ওঠা থেকে বিরত রাখতে চায়। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি, সংঘাত এবং দেশটির মধ্যে বিভেদ তৈরির প্রচেষ্টা বেড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পেজেশকিয়ান বলেন, সব দেশ ও ব্যক্তির সমান অধিকার রয়েছে এবং ন্যায় ও সুবিচারের মাধ্যমে তাদের একসঙ্গে বসবাস করতে সক্ষম হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন জাতি ও সম্প্রদায়ের নবীদের শিক্ষা মূলত ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং জুলুম প্রতিরোধের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল। কুরআনের শিক্ষার উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের কাছে একজন রাসুল পাঠানো হয়েছিল এবং মানুষের মধ্যে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করার জন্য নবীদের পাঠানো হয়েছিল।
ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, শুরুতে সব মানুষ একই সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মানুষের মধ্যে বিরোধ ন্যায়সংগতভাবে মীমাংসা করা, সংঘাত প্রতিরোধ করা এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্যই হেদায়াত দেওয়া হয়েছিল। তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষ যখন সত্যের পরিবর্তে স্বার্থপরতা ও ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে শুরু করে, তখন বিভেদ সৃষ্টি হয়। এর পরিণতিতে জুলুম ও ক্ষমতার অপব্যবহার দেখা দেয়।
পেজেশকিয়ান বলেন, সরল পথের মূল কথা হলো ন্যায়বিচার করা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা, অন্যের অধিকারকে সম্মান করা এবং মানুষের সেবা করা। ধর্ম, বিশ্বাস, জাতিসত্তা, লিঙ্গ বা জাতীয়তা নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রেই এসব নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত বলেও জোর দেন তিনি।
তাকওয়ার ধারণা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, তাকওয়াবান ব্যক্তি হলেন এমন একজন, যিনি অন্যায় বা বিচ্যুতি ছাড়া একটি লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান। এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের পরিচয় বা পটভূমির ভিত্তিতে নয়, বরং তার আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অঙ্গীকারের ভিত্তিতে তাকে মূল্যায়ন করা হয়।
সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে কুরআনের শিক্ষার উল্লেখ করে পেজেশকিয়ান এতিমদের সাহায্য করা, দরিদ্রদের সহায়তা করা এবং জুলুমের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মানুষের সেবা করা এবং সমাজের দুর্বল সদস্যদের সুরক্ষা দেওয়া থেকে ধর্মীয় অনুশীলনকে আলাদা করা যায় না।
এ ছাড়া ইরানি ও ভারতীয় উৎপাদক এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে সুস্থ অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের আহ্বান জানান পেজেশকিয়ান।
তিনি বলেন, পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়লে প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন ও জনকল্যাণে অবদান রাখা সম্ভব। জুলুম, শোষণ ও ঔপনিবেশিক আধিপত্যমুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে এই সহযোগিতা সহায়ক হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে পেজেশকিয়ান আরও সংহতি, বন্ধুত্ব, মানবিকতা ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ইরান-ভারত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, দুই দেশ তাদের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করে দুই দেশের জনগণের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি এগিয়ে নিতে পারে।
সূত্র: ইসলামিক রিপাবলিক নিউজ এজেন্সি












