১৯৪৭ সালে গঠিত অখণ্ড পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ঘিরে প্রচলিত একটি বয়ান হলো, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য তিনিই নাকি বাংলাকে ভাগ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ সরকারি নথি, তৎকালীন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং বঙ্গীয় আইনসভার ভোটের ফল সামনে রাখলে ভিন্ন ইতিহাস দেখা যায়। জিন্নাহ বাংলা ভাগের দাবি তোলেননি। বরং সংকটের শেষ পর্যায়ে তিনি প্রকাশ্যেই বঙ্গভাগের বিরোধিতা করেছিলেন।
ভারতবর্ষের মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়েও তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। প্রশ্ন ওঠে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অখণ্ড বাংলা পাকিস্তানে যাবে, নাকি কলকাতাসহ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চলকে আলাদা করে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
এ সময় বঙ্গভাগের দাবিতে সবচেয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে হিন্দু মহাসভা। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ছিলেন এই আন্দোলনের প্রধান মুখগুলোর একজন। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই তিনি বাংলা ভাগের দাবি জোরালোভাবে সামনে আনেন। পরে বঙ্গীয় হিন্দু মহাসভার সম্মেলনে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে পৃথক পশ্চিমবঙ্গ গঠনের দাবি আরও সংগঠিত রূপ পায়। বঙ্গীয় কংগ্রেসের বড় অংশও কলকাতাসহ পশ্চিমাঞ্চলকে ভারতের সঙ্গে রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়।
অন্যদিকে বাংলাকে অখণ্ড রাখার চেষ্টা করছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন শরৎচন্দ্র বসুসহ কয়েকজন হিন্দু নেতা। ২৭ এপ্রিল সোহরাওয়ার্দী স্বাধীন ও সার্বভৌম অখণ্ড বাংলার প্রস্তাব প্রকাশ্যে সামনে আনেন। প্রয়োজন হলে বাংলা ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের বাইরে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেও থাকতে পারে, এমন পথও তারা খোলা রাখতে চেয়েছিলেন।
এর আগের দিন, ২৬ এপ্রিল, ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে জিন্নাহর বৈঠকেও অখণ্ড বাংলার প্রসঙ্গ ওঠে। ব্রিটিশ নথিতে সংরক্ষিত সেই আলোচনায় দেখা যায়, বাংলা পাকিস্তানে যোগ না দিয়ে স্বাধীন ও অখণ্ড থাকলেও জিন্নাহ তাতে আপত্তি করেননি। কলকাতাকে বাংলা থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রশ্নেও তিনি আপত্তি তোলেন। কলকাতা ছাড়া বাংলার কী মূল্য থাকবে, এমন প্রশ্নও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
জিন্নাহর অবস্থান আরও পরিষ্কার হয় ৪ মে দেওয়া তার প্রকাশ্য বিবৃতিতে। বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের বিরোধিতা করে দেওয়া সেই বিবৃতি আজও ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভসে সংরক্ষিত রয়েছে।
বিবৃতিতে জিন্নাহ বলেন, কংগ্রেস পাঞ্জাব ভাগের দাবি তুলছে এবং হিন্দু মহাসভা বাংলা ভাগের জন্য জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। তার বক্তব্য ছিল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলা ও পাঞ্জাবকে আবার ধর্মীয় রেখায় ভাগ করা হলে পাকিস্তান খণ্ডিত ও দুর্বল হয়ে পড়বে। এভাবে একের পর এক অঞ্চল ভাগ করার নীতির পরিণতি নিয়েও তিনি সতর্ক করেন।
অখণ্ড বাংলার উদ্যোগ শুধু কথার মধ্যে থাকেনি। ২০ মে সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসুসহ সংশ্লিষ্ট নেতাদের আলোচনায় স্বাধীন বাংলার একটি বাস্তব পরিকল্পনা তৈরি হয়। এতে বাংলা স্বাধীন রাষ্ট্র হবে এবং ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কী হবে, সেটি বাংলা নিজেই নির্ধারণ করবে, এমন প্রস্তাব রাখা হয়।
সমকালীন রাজনীতিক অলি আহাদ তার ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’ গ্রন্থে বঙ্গভাগের দাবি এবং স্বাধীন অখণ্ড বাংলার উদ্যোগের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। একই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম লীগ নেতা আবুল হাশিমও তার স্মৃতিকথা ‘ইন রেট্রোস্পেক্ট’-এ অখণ্ড বাংলা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরেছেন। তবে জিন্নাহর অবস্থানের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায় তার নিজের প্রকাশ্য বিবৃতি ও ব্রিটিশ সরকারি নথিতেই।
অখণ্ড বাংলার পরিকল্পনার বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় কংগ্রেস হাইকমান্ড। জওহরলাল নেহরু ও বল্লভভাই প্যাটেল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলার পরিকল্পনা মেনে নেননি। তাদের আশঙ্কা ছিল, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন বাংলা ভবিষ্যতে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারে। ফলে হিন্দু মহাসভার বঙ্গভাগ আন্দোলন এবং কংগ্রেস নেতৃত্বের বিরোধিতার মুখে অখণ্ড বাংলার উদ্যোগ ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
অবশ্য মুসলিম লীগের মধ্যেও সবাই স্বাধীন বাংলার পক্ষে ছিলেন না। খাজা নাজিমুদ্দিন ও মাওলানা আকরম খানের নেতৃত্বাধীন একটি অংশ পূর্ববঙ্গকে সরাসরি পাকিস্তানের অংশ করার পক্ষে ছিল। কিন্তু জিন্নাহর নিজের প্রকাশ্য অবস্থান বাংলা ভাগের বিপক্ষেই ছিল।
কে বাংলা ভাগ চাইছিল, তার সবচেয়ে পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায় ২০ জুনের বঙ্গীয় আইনসভার ভোটে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্বাঞ্চলের প্রতিনিধিরা ১০৬-৩৫ ভোটে বাংলা ভাগের বিপক্ষে অবস্থান নেন। বিপরীতে অমুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমাঞ্চলের প্রতিনিধিরা ৫৮-২১ ভোটে বাংলা ভাগের পক্ষে ভোট দেন। ব্রিটিশ পরিকল্পনা অনুযায়ী যেকোনো একটি অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভাগের পক্ষে গেলেই বাংলা বিভক্ত হওয়ার পথ খুলে যেত।
শেষ পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলের ওই ভোটই বঙ্গভাগের পথ নিশ্চিত করে।
ভারতবর্ষের মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জিন্নাহ। কিন্তু সেই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাকে ভাঙা তার দাবি ছিল না। বরং ১৯৪৭ সালের নির্ণায়ক সময়ে তিনি বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন এবং প্রয়োজন হলে পাকিস্তানের বাইরেও একটি স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলার পথ খোলা রাখতে রাজি ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত অখণ্ড বাংলার সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। পূর্ববঙ্গ যুক্ত হয় পাকিস্তানের সঙ্গে, আর পশ্চিমবঙ্গ যায় ভারতের অংশে।
কিন্তু ১৯৪৭ সালের দলিল, জিন্নাহর নিজের বক্তব্য এবং বঙ্গীয় আইনসভার ভোট মিলিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার, কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলা ভাগ চাননি।
সূত্র : ব্রিটিশ ন্যাশনাল আর্কাইভস; দ্য ট্রান্সফার অব পাওয়ার, ১৯৪২-৪৭; বঙ্গীয় আইনসভার কার্যবিবরণী; অলি আহাদের ‘জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫’; আবুল হাশিমের ‘ইন রেট্রোস্পেক্ট’।












