spot_img

মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে ঐক্য যেন নষ্ট না হয়: প্রধানমন্ত্রী

দলীয় নেতাকর্মীদের বিগত ১৭ বছরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেন, মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে এর কারণে যেন দলের ঐক্য নষ্ট না হয়। ঐক্যে ফাটল ধরলেই ফ্যাসিস্ট ও গুপ্তরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে।

সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, বিগত সময়ে সবাই যেভাবে ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, আগামীতেও সেভাবেই ঐক্য ধরে রাখতে হবে। বিগত নির্বাচনে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দলকে বিজয়ী করেছেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একইভাবে ঐক্যবদ্ধ থেকে দলকে জিতিয়ে আনতে হবে।

তিনি বলেন, ‘ঐক্য থাকলে ফ্যাসিস্ট বা গুপ্ত কেউ ঢুকতে বা সুবিধা করতে পারবে না। ঐক্যে ফাটল ধরলেই তারা সুযোগ নেবে।’

বিগত ১৭ বছরে নেতাকর্মীদের ত্যাগ ও নির্যাতনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনারা দলকে গেল ১৭ বছরে টিকিয়ে রেখেছেন। তখন গুম, খুন, নির্যাতনের শিকার হয়েও আপনারা সবাই মিলে দল সামলিয়েছেন। এই সময়ে আপনারা নিজের পরিবারের চেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন, টাকা খরচ করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘টেনশন, যন্ত্রণা দলের জন্য যেমন নিয়েছেন, তেমন নিজের পরিবারের জন্যও কি নিয়েছেন? না। এভাবে দেশের সব বিএনপি নেতাকর্মী ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এখন সেই নির্যাতনের ভয় নেই। তখন সবাই সবার পাশে থেকে দল চালাতেন, সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এখন কেন ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারবেন না?’

হাইব্রিড ও গুপ্তদের বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক করে তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে নির্বাচন হওয়া নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো বসে আছে। আরেকটি গোষ্ঠী দেশের বাইরে বসে ষড়যন্ত্র করছে।

তিনি আরও বলেন, ‘দল অবশ্যই সুসংগঠিত করতে হবে। দল গোছাতে হাইব্রিড ও গুপ্ত, এই দুটি বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। তারা যেন দলের নেতৃত্বে ঢুকতে না পারে।’

নেতাকর্মীদের ত্যাগের বিনিময়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা কি চান, আপনাদের দল দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকুক? তাহলে তৃণমূলে ঐক্য থাকতে হবে। তৃণমূলকে শক্তিশালী থাকতে হবে। আপনাদের কারণেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে।’

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাচ্ছেন, সেখানে অনেক প্রস্তুতি দরকার। সেটা কি আপনাদের আছে? নেই। প্রস্তুতি না থাকলে জিততে পারবেন? না। না পারলে সরকার চলবে কীভাবে? সরকার থাকতে পারবে?’

তারেক রহমান বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন আমরা অবশ্যই দেব। বর্ষার পর আলোচনা করে ঠিক করব। এর আগে আপনাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আপনারা বসে সিদ্ধান্ত নেবেন কে চেয়ারম্যান, কে সদস্য হবেন, আর কে দল চালাবেন। আমরা দলকে নিয়ে সামনে চলতে চাই। সামনে এগোতে চাই।’

হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে কেউ যেন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে সুযোগ নিতে না পারে, সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের সতর্ক করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েকদিন পর হিন্দুদের বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এখানে যারা আছেন, তাদের বলছি, আর যারা আসেননি, আপনারা তাদেরও বলবেন, তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেকোনো মূল্যে শান্তিপূর্ণভাবে সফল করতে হবে। যেন কেউ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে। কেউ যেন সেই সুযোগ না পায়।’

বক্তব্যের শুরুতে বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতি, অনিয়ম ও উন্নয়নের নামে লুটপাটের চিত্র তুলে ধরেন তারেক রহমান।

তিনি আরও বলেন, ‘গত ১৭ বছরে এত উন্নয়ন, উন্নয়ন শুনতাম। আসলে উন্নয়নটা হয়েছে কোথায়? হয়েছে, তবে সেটা তাদের পকেটের উন্নয়ন। এখন দেখছি, সেসব উন্নয়ন কোনো কাজেই আসছে না। সব ক্ষেত্র তারা ধ্বংস করে গেছে।’

উন্নয়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে ৫৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অথচ পদ্মা সেতুর সমমানের ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা। রূপপুর প্রকল্পেও অস্বাভাবিক ব্যয় হয়েছে।

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের প্রকাশিত শ্বেতপত্রে দেখানো হয়েছে, গত ১৭ বছরে প্রতিবছর ১৬ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।

‘উন্নয়ন মানেই কি শুধু রাস্তা-ঘাট করা?’ এমন প্রশ্ন রেখে তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন জেলায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে কেন? ঢাকা শহরে বড় বড় ফ্লাইওভার দেখা গেলেও ড্রেন ও খাল ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে সব জায়গায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন হবে, আমরা করব। কিন্তু উন্নয়ন মানেই কি শুধু রাস্তা-ঘাট? আমরা উপজেলা পর্যায়ের ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার কাজ হাতে নিয়েছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার ভিত্তি করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে খালেদা জিয়ার সরকার সেগুলোকে ৫১ শয্যায় উন্নীত করেছিল। বর্তমান সরকার সেগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করবে।

তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে অসুস্থ হলে শিশুদের খুব কষ্ট হয়। তাই সারা দেশে এক হাজারটি শিশু হাসপাতাল করব। উন্নয়ন বলতে শুধু রাস্তা-ঘাট নয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু চিকিৎসা, খাল খনন, সবই উন্নয়ন।’

দেশের চরম সংকটকালীন সময়ে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারকে আরও কয়েকটি জটিল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘কী অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি, সে সম্পর্কে আপনাদের খুব ভালো ধারণা আছে। ব্যাংকিং খাত দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে, চিকিৎসা খাতও নাজুক। মহানগর ও জেলায় যারা আছেন, তারা হয়তো কিছুটা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের অবস্থা খুবই নাজুক।’

তারেক রহমান বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে বাংলাদেশের সনদের বিদেশে কোনো মূল্য নেই। শিক্ষিতরাই সবচেয়ে বেশি বেকার, অথচ অল্প শিক্ষিতরা কিছু কাজ করে যাচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, এসব কাজ না হওয়ার মূল কারণ জবাবদিহির অভাব। জবাবদিহি বলতে নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্বাচন হবে এবং মানুষ ভোট দিয়ে তাদের শাসক নির্বাচন করবে। গত ১৭ বছরে সেই জবাবদিহির ব্যবস্থাও ধ্বংস করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এমন ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। আমরা বলেছিলাম ফ্যামিলি কার্ড দেব, দিয়েছি। কৃষক কার্ড দেব, সেটিও শুরু করেছি। যা যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, সেসব বাস্তবায়ন শুরু করেছি। পরিকল্পনা ছিল বলেই কাজ শুরু করতে পেরেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব নিয়েছি ফেব্রুয়ারিতে। তার একদিন পরই রমজান শুরু হয়। সেই রমজানে আমরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়তে দিইনি। মানুষ তুলনামূলক স্বস্তিতে রমজান কাটিয়েছে।’

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া ও সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এতে সরকারকে অতিরিক্ত আড়াই বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হয়েছে।

দেশ পরিচালনায় সবার দায়িত্বশীল ভূমিকার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি বলেন, একটি পরিবারের পাঁচজন বিভিন্ন কাজ করলে একজনের দায়িত্ব যদি ঘর গুছিয়ে রাখা হয়, কিন্তু সবাই মিলে ঘর নোংরা করে, তাহলে সেই একজনের পক্ষে সবার ময়লা পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। সবাই মিলে পরিষ্কার রাখলে ময়লাও কম হবে।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, ‘পরিবার যেমন, দেশও তেমন। আপনারা এখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। তাই আপনাদের বুঝেশুনে কাজ করতে হবে।’

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ