হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সিরিয়া যেন লেবাননে হামলা চালায়, এমনটি চেয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার বাহিনী ইসরাইলের চেয়ে ভালোভাবে হিজবুল্লাহকে মোকাবিলা করতে পারত।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বাঁ শহরে জি-৭ শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প বলেন, “ইসরাইল অনেক দিন ধরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করছে এবং এতে অনেক বেশি মানুষ নিহত হচ্ছে। আমি ইসরাইলকে পরামর্শ দিয়েছি, হিজবুল্লাহর বিষয়টি সিরিয়াকে সামলাতে দিতে।”
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শার’আর প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “তিনি অত্যন্ত সক্ষম।”
ট্রাম্প আরও বলেন, “অন্য সবাইকে হত্যা না করে ইসরাইল যদি কাজটি করতে না পারে, তাহলে তিনি কাজটি করবেন। সিরিয়া কাজটি করবে।”
চলতি মাসে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো দামেস্কের লেবাননে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বললেন ট্রাম্প। এমন পদক্ষেপ ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ একটি পরিস্থিতি আবারও উসকে দিতে পারে। কারণ, ১৯৭৬ সালে সিরিয়া লেবাননে হামলা চালিয়েছিল এবং ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশটির একাংশ দখল করে রেখেছিল।
গত ৭ জুন ট্রাম্প বলেছিলেন, লেবাননে আল-শার’আ সহায়তা করতে খুবই আগ্রহী হবেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রায়ই আল-শার’আর প্রশংসা করেন। তিনি তাঁকে অত্যন্ত শক্তিশালী নেতা, একজন কঠোর মানুষ বলে বর্ণনা করেছেন।
তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্য তুরস্কে নিযুক্ত তাঁর নিজের রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক দূত টম ব্যারাকের বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। গত মার্চে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে আমেরিকা সিরিয়াকে লেবাননে হামলা চালাতে চাপ দিয়েছে বলে যে দাবি করা হয়েছিল, ব্যারাক তা অস্বীকার করেছিলেন।
রয়টার্স প্রথম জানিয়েছিল, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করতে সহায়তার জন্য পূর্ব লেবাননে সেনা পাঠাতে সিরিয়ার ওপর চাপ দিচ্ছিল আমেরিকা।
সতর্ক অবস্থানে দামেস্ক
প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব লেবাননে সিরিয়ার হামলার অনুমোদন দিয়েছিল আমেরিকা এবং দামেস্ক বিষয়টি “সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা” করছিল।
এতে আরও বলা হয়, আল-শার’আ সরকার আশঙ্কা করছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং সিরিয়ার সংখ্যালঘু শিয়াদের মধ্যে সম্ভাব্য অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। দেশটিতে আলাওয়ি, দ্রুজ ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে দফায় দফায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে।
৪৩ বছর বয়সী আল-শারা ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক হামলা প্রতিহত করতে সেখানে যাওয়ার পর প্রায় পাঁচ বছর আমেরিকার কারাগারে ছিলেন। পরে তিনি আল-কায়েদার সিরীয় শাখা আল-নুসরা ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা করেন।
সিরিয়ার সরকারের প্রতি অনুগত সেনা লেবাননে মোতায়েন করা হলে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আগুন আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, লেবাননে ইসরাইলের হামলা ইতোমধ্যে সেই উত্তেজনাকে উসকে দিচ্ছে।
আল-শারার সমর্থকদের মধ্যে সালাফি যোদ্ধারাও রয়েছেন। সালাফিরা সুন্নি ইসলামের এমন একটি ধারার অনুসারী, যারা ইসলামের আক্ষরিক ব্যাখ্যা অনুসরণ করেন এবং মুসলমানদের প্রথম তিন প্রজন্মের ঐতিহ্যের ওপর গুরুত্ব দেন।
হিজবুল্লাহ লেবাননের বৃহত্তম শিয়া দল। এটি একই সঙ্গে একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ও আধাসামরিক সংগঠন, যা ইরানের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হিজবুল্লাহ সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষে লড়াই করেছিল।
আল-শারার সশস্ত্র সংগঠন হায়াত তাহরির আল-শাম ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করে।
আল-শারাকে বর্ণনা করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “হিজবুল্লাহকে মোকাবিলায় তিনি খুবই দক্ষ। তিনি তাদের পছন্দ করেন না।”
তবে আল-শারার সরকার জানিয়েছে, লেবাননে সেনা মোতায়েনের কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই। গৃহযুদ্ধে সিরিয়া মারাত্মকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। দেশটি এখন উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর সহায়তায় পুনর্গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে সৌদি আরব ও কাতার দেশটিকে সহায়তা করছে।
নিজ দেশের দক্ষিণ সীমান্তেও আল-শারা একটি ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতির মুখোমুখি। আসাদের পতনের সুযোগ নিয়ে ইসরাইল দক্ষিণ সিরিয়ায় জাতিসংঘের একটি বাফার জোন দখল করে। গত গ্রীষ্মে দেশটি এমন শক্তিশালী বিমান হামলা চালায়, যা রাজধানী দামেস্ক পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
ইসরাইল সিরিয়ার হারমোন পর্বতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। এটি ওই অঞ্চলের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুজ নেতা শেখ হিকমত সালামান আল-হাজরিকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তার মাধ্যমে ইসরাইল নিজেকে সিরিয়ার দ্রুজ সংখ্যালঘুদের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাও করেছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই











