মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আমেরিকা ও ইরানের সম্ভাব্য একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তির ১৪ দফা খসড়া প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
খসড়ায় যুদ্ধবিরতি, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ রয়েছে।
সিএনএনের দাবি, একজন মার্কিন কর্মকর্তার কাছ থেকে তারা সমঝোতা স্মারকের খসড়া কপি পেয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) থেকে বুধবার (১৭ জুন) ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি-৭ সম্মেলনে উপস্থিত একজন কূটনীতিক এবং আলোচনার সঙ্গে যুক্ত আরও দুই কূটনৈতিক সূত্র নথিটির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
তবে হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র বলেছেন, ফাঁস হওয়া নথিটি চূড়ান্ত সমঝোতার প্রকৃত প্রতিফলন নয়।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মুহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ গত রোববার ডিজিটালভাবে চুক্তিটিতে সই করেছেন।
শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তি সম্পন্ন করতে ৬০ দিনের সময়সীমা কার্যকর হবে।
খসড়া অনুযায়ী, আমেরিকা ইরানকে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানির অনুমতি দেবে। পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পূরণ করলে ইরান ৩০০ বিলিয়ন ডলারের উন্নয়ন তহবিলে প্রবেশাধিকার পেতে পারে।
তবে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে খসড়ায় সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
চুক্তির ১৪ দফা
১. ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান, আমেরিকা এবং বর্তমান যুদ্ধে জড়িত তাদের মিত্ররা সমঝোতা স্মারকে সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ও স্থায়ী সমাপ্তি ঘোষণা করবে। উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো শত্রুতামূলক পদক্ষেপ নেবে না। শক্তি প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেওয়া থেকেও বিরত থাকবে।
২. ইরান ও আমেরিকা একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানাবে। একই সঙ্গে পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে।
৩. উভয় দেশ সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা চালিয়ে যাবে। পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এই সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।
৪. সমঝোতা স্মারকে সইয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে সব ধরনের বাধা ও হস্তক্ষেপ বন্ধ করবে। সর্বোচ্চ ৩০ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে। চূড়ান্ত চুক্তির ৩০ দিনের মধ্যে আশপাশের এলাকা থেকে নিজেদের বাহিনী প্রত্যাহার করবে আমেরিকা।
৫. সমঝোতা স্মারকে সইয়ের পরপরই পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে পদক্ষেপ নেবে ইরান। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং মাইন অপসারণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
৬. আমেরিকা ও তার আঞ্চলিক অংশীদাররা ইরানের পুনর্বাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়নে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পদ্ধতি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে।
৭. চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ইরানের ওপর আরোপিত বর্তমান সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে আমেরিকা। এর মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাব এবং আমেরিকার একতরফা প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৮. ইরান পুনর্ব্যক্ত করেছে, তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত অন্যান্য বিষয় চূড়ান্ত চুক্তিতে সমাধান করা হবে।
৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত উভয় পক্ষ বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে বর্তমান অবস্থা বজায় রাখবে। অন্যদিকে আমেরিকা নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না এবং অঞ্চলে সামরিক শক্তিও বৃদ্ধি করবে না।
১০. সমঝোতা স্মারকে সইয়ের পরপরই এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার পর্যন্ত আমেরিকার অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা রপ্তানির অনুমোদন দেবে। এর মধ্যে ব্যাংকিং, বীমা ও পরিবহন খাতও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
১১. আলোচনায় অগ্রগতির ভিত্তিতে ইরানের স্থগিত বা সীমাবদ্ধ তহবিল ও সম্পদ মুক্ত করে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত যেকোনো চূড়ান্ত অর্থ পরিশোধে এসব অর্থ ব্যবহার করতে পারবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন ও লাইসেন্স দেবে আমেরিকা।
১২. চূড়ান্ত চুক্তির সফল বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি তদারকির জন্য একটি বাস্তবায়ন কাঠামো গঠন করা হবে।
১৩. সমঝোতা স্মারকে সই এবং ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর ধারার বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়ার পর উভয় দেশ বাকি ধারাগুলো নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে।
১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে।
সূত্র: সিএনএন।











