বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, আমরা ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাজিত করতে পেরেছি; কিন্তু তাদের শিকড় এখনো রয়ে গেছে। সেই শিকড় সমূলে উৎপাটন করতে না পারলে আবারও গণতন্ত্র হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। আবারও দেশের মানুষ গুম, খুন ও নিপীড়নের শিকার হতে পারে।
শুক্রবার (১৯ জুন) সন্ধ্যায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘লবেলিয়া’ আয়োজিত সাত দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘অধিকারের সংগ্রাম’ শীর্ষক এই প্রদর্শনীতে ১৯৫২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম ও বিজয়ের ধারাবাহিকতা চিত্রকলার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ‘লবেলিয়া’র কর্ণধার ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক বেনজির আহমেদ টিটো। প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একুশে পদকপ্রাপ্ত চারুকলার শিক্ষক ও চিত্রশিল্পী অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আশফাক আহমেদ, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান খান দিপু ভূইয়া, মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভির আহমেদ রবিন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন কাওছার হোসেন চঞ্চল এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
রুহুল কবির রিজভী বলেন, ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ফ্যাসিবাদী চেতনার শিকড় সমাজ, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রের নানা স্তরে রয়ে গেলে তা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। তাই গণতন্ত্র রক্ষায় রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চাও অব্যাহত রাখতে হবে।
তিনি বলেন, অতীতে রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য নানা ধরনের দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে। আয়নাঘর তৈরি করে মানুষের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার মাধ্যমে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। গণতন্ত্র ফিরে পেতে দেশের মানুষকে দীর্ঘ ১৭ বছর ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তাদের সম্মিলিত শক্তি প্রমাণ করেছে, জনগণের জাগরণ সবচেয়ে বড় শক্তি। গান, কবিতা, দেয়াললিখন, চিত্রকর্ম ও পথনাটকের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছে।
তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় তিনি নিজেও সাংস্কৃতিক কর্মীদের গণতন্ত্রের পক্ষে কাজ করতে দেখেছেন। জেল থেকে বের হয়ে তিনি দেখেন, গণআন্দোলনের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলনও দানা বেঁধেছে। এই চর্চা থেমে গেলে চলবে না। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চা জরুরি।
রিজভী আহমেদ বলেন, “আমি কোনো ব্যক্তি মানুষের কায়িক অস্তিত্ব বিনাশের কথা বলছি না। আমি বলছি, ফ্যাসিবাদী সাংস্কৃতিক চেতনার যে শিকড়, সেটি উপড়ে ফেলতে হবে। তা না হলে তারা নানা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আবারও ফিরে আসার চেষ্টা করবে। কারণ তাদের মদদ দেওয়ার মতো দেশি-বিদেশি শক্তি রয়েছে।”
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে সবার কথা বলার অধিকার থাকা দরকার। কিন্তু যারা গণতন্ত্র হত্যা করে, মানুষের অধিকার কেড়ে নেয় এবং জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালায়, তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। এই পার্থক্য বুঝতে না পারলে দেশ আবারও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
আওয়ামী লীগের সমালোচনা করে রিজভী বলেন, ১৯৭৫ সালের পর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ খুলে দিয়েছিলেন। তার উদারতার কারণেই বাকশালের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ আবার নিজেদের নামে রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু সেই উপলব্ধি আওয়ামী লীগের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের সংস্কৃতি নষ্ট করেছে। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী শক্তির পুনরুত্থান ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এ জন্য শক্তিশালী রাজনৈতিক কর্মীবাহিনীর পাশাপাশি একটি সচেতন সাংস্কৃতিক কর্মীবাহিনীও গড়ে তুলতে হবে।











