স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটটি সাংবিধানিক ছিল না। বরং রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই একটি অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে জনগণের ওপর ছলচাতুরির গণভোট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
রোববার (১৯ জুলাই) বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে গণঅধিকার পরিষদ আয়োজিত ‘রক্তস্নাত জুলাই: প্রেক্ষাপট, রক্তের ঋণ এবং কোন পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরের সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসান এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক নাসির উদ্দিন প্রমুখ।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটটি সাংবিধানিক ছিল না। এটি একটি অবৈধ আদেশের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়াই হঠাৎ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর অধীনে একটি ছলচাতুরির গণভোট চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে চারটি প্রশ্নের বিপরীতে কেবল একটি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ উত্তরের বিধান রাখা হয়।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর পক্ষে জনগণ আছে কি না, সে বিষয়ে কেবল একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নে গণভোট হওয়া উচিত ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত কয়েকটি কমিশনের সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এমন কিছু অধ্যাদেশ দেখা গেছে, যেখানে সুনির্দিষ্ট কোনো কাজ ছাড়াই শুধু কয়েকজন ব্যক্তির কর্মসংস্থানের জন্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল। গুমের শিকার ব্যক্তি কিংবা তাদের পরিবার কোথায় প্রতিকার পাবে, সেটিও স্পষ্ট ছিল না।
আগামী সংসদ অধিবেশনে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ আনার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও দেশীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে আইনটি প্রণয়ন করা হবে। এতে গুমের বিভিন্ন স্তর, সাজা এবং বিচারিক এখতিয়ার সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের আইন যুগোপযোগী করা হবে বলে জানান তিনি। তবে মানবাধিকার আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় সংহতির বিষয়টি কঠোরভাবে বিবেচনা করা হবে। যাতে এলজিবিটিকিউয়ের মতো সমাজে স্বীকৃত নয়, এমন বিষয় দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়।
বক্তব্যের শুরুতে মব জাস্টিসের সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “মব কোনোদিন জাস্টিস হতে পারে না। এটি একটি অপসংস্কৃতি। আইনের শাসন কার্যকরভাবে প্রয়োগ না হওয়ায় এই মব কালচারের সৃষ্টি হয়েছিল।”
প্রশাসন ও বিচার বিভাগের মাধ্যমেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের উচ্চ ও নিম্ন আদালতের অনেকেই এখনো রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব পালন করছেন। এর ফলে সমাজে ইনজাস্টিস বা অবিচারের সৃষ্টি হচ্ছে।
বিগত প্রহসনের নির্বাচন এবং ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতনে বিচার বিভাগের একাংশের সহযোগিতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আইনের শাসন বাস্তবায়নে একটি সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। রাষ্ট্রকাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে তাদের ৩১ দফার প্রথম দফায় সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা প্রায় ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অল্প কয়েকটি ছাড়া বাকি সব বর্তমান সরকার আইনে পরিণত করেছে। তবে স্থায়ী রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন।
সংবিধানকে একটি পরিবর্তনশীল দলিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটের বিধান ফিরে এসেছে। সংবিধানের প্রস্তাবনা কিংবা মৌলিক কোনো অনুচ্ছেদ পরিবর্তন করতে হলে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে গণভোটের আয়োজন করতে হবে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটটি সেই গণভোট নয়।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছেন। আবু সাঈদসহ অসংখ্য শহীদের রক্তের বিনিময়ে ৫ আগস্টের বিজয় এসেছে।
১৯ জুলাই সবচেয়ে বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, যারা শুধু মন্ত্রী ও উপদেষ্টা হওয়ার জন্য জুলাইয়ের চেতনাকে ব্যবহার করছেন, তাদের পুরোনো বন্দোবস্তের আদলে আওয়ামী বন্ধু কিংবা যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করতে হবে।
‘দায় ও দরদের রাজনীতি’ কিংবা ‘নতুন বন্দোবস্ত’-এর মতো ভারী শব্দ ব্যবহারকারী বুদ্ধিজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এত বাক্যবিশারদ হওয়া ভালো নয়। আপনাদের নতুন বন্দোবস্ত আসলে কী, তা দয়া করে জনগণের সামনে পরিষ্কার করুন।”
বিরোধী দলগুলোর উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, নিজেদের হীন স্বার্থে কখনো ‘৪৭-কে ব্যবহার করা, আবার ‘৭১-কে অস্বীকার করে ‘২৪-কে ব্যবহারের রাজনীতি আর চলবে না। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকানো এবং স্বৈরাচারের ফেরার পথ বন্ধ করতে দেশের গণতান্ত্রিক ও সংসদীয় রাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।










