সন্ত্রাস দমনের নামে ইসলামপন্থীদের টার্গেট করার যে রাষ্ট্রীয় কৌশল হাসিনার আমলে ভয় হয়ে নেমে এসেছিল, তার এক নির্মম নমুনা সামনে এনেছে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা কেজ ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি জানিয়েছে, গাজীপুরের মাদরাসা-সংশ্লিষ্ট আলেম মাওলানা আবুল হোসাইন আল-আমিনকে রাতের আঁধারে একটি এতিমখানা থেকে তুলে নেওয়ার পর আজও কোনো মামলা, কোনো নথি, কোনো অবস্থান জানায়নি কর্তৃপক্ষ, আর পরিবার ন্যায়বিচারের পথে গিয়ে বারবার আটকে গেছে আইনি বাধায়।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল তাদের আউট অব দ্য শ্যাডো অব হাসিনা শীর্ষক রিপোর্টে বলেছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে সন্ত্রাস দমনের অজুহাতে ইসলামপন্থী আলেম, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজে প্রভাবশালী দ্বিনি নেতৃত্বকে পরিকল্পিতভাবে নিশানা করা হয়েছে। রিপোর্টের প্রথম কেস স্টাডিতেই মাওলানা আবুল হোসাইন আল-আমিনের ঘটনাকে দমননীতির প্রতীকী উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কেজের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখানো হয়নি, অভিযোগ জানানো হয়নি, এবং পরে কোনো মামলা বা আটক-সংক্রান্ত নথিও সামনে আনা হয়নি। উল্টো পরিবারকে আইনি পথে এগোতে বারবার বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, সোমবার (৩০ জানুয়ারি ২০২৩) রাত ১০টা ১৫ মিনিটে গাজীপুরের চৌরাস্তা বাজার এলাকার মাদরাসা ইবন মাসউদ এতিমখানায় চার থেকে পাঁচজন ব্যক্তি সাদা পোশাকে প্রবেশ করে। তারা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেয় এবং কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট ও ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের পরিচয় ব্যবহার করে। কেজের ভাষ্য, তারা কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দেখায়নি, কেন নেওয়া হচ্ছে তা বলেনি। শুধু বলা হয়, কয়েকটি প্রশ্ন আছে, সকালে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
কেজ বলেছে, এই কয়েকটি প্রশ্ন কথাটাই ছিল ফাঁদ। কারণ কথা অনুযায়ী ভোরে ফেরত তো আসেননি, বরং ওই রাতের পর থেকে মাওলানা আবুল হোসাইন আল-আমিনকে আর কেউ দেখেনি। কেজের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি স্বাভাবিক গ্রেপ্তার নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে মানুষকে অদৃশ্য করে দেওয়ার কৌশল, যাতে কোনো কাগজপত্র না থাকায় পরিবার প্রমাণ সংকটে পড়ে এবং রাষ্ট্র সহজেই অস্বীকার করতে পারে।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, পরিবার প্রথম থেকেই আল-আমিনের খোঁজে থানায় যায়। তারা জয়দেবপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করে, নম্বর ৫৫০। কিন্তু কেজ বলেছে, এই সাধারণ ডায়েরি করতেও পরিবারকে বহু চেষ্টায় যেতে হয়েছে। পরিবার মামলা করতে চাইলেও মামলা নেওয়া হয়নি, বারবার নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং খোঁজখবর না বাড়াতে চাপের মুখে পড়তে হয়েছে।
কেজের ভাষ্য অনুযায়ী, এখানেই হাসিনার আমলের দমননীতির আরেকটি স্তর স্পষ্ট হয়। তুলে নেওয়ার পর রাষ্ট্র অস্বীকার করে, মামলা গ্রহণ আটকে দেয়, তদন্ত শুরু হতে দেয় না। ফলে পরিবার আইনগতভাবে অসহায় হয়ে পড়ে। কেজ বলেছে, এই অসহায়ত্বই ধীরে ধীরে একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, কারণ আইনি পথ বন্ধ থাকলে তথ্য বের করা, দায় নির্ধারণ বা বিচার দাবি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টে একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ওই প্রত্যক্ষদর্শী একই সন্ত্রাস দমন হেফাজতে আটক ছিলেন এবং তিনি আল-আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছেন। কেজের রিপোর্টে ওই প্রত্যক্ষদর্শীর নাম ফাকরুল ইসলাম হিসেবে এসেছে। কেজ বলেছে, নির্যাতনে এক পর্যায়ে আল-আমিন জ্ঞান হারান, এরপর নিরাপত্তা সদস্যরা তাকে টেনে নিয়ে যায়। তারপর তাকে আর দেখা যায়নি।
কেজ বলেছে, এই সাক্ষ্য ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে। কারণ এখানে শুধু তুলে নেওয়া নয়, গোপন হেফাজতে নির্যাতনের ইঙ্গিতও স্পষ্ট। পরিবার যখন রাষ্ট্রের কাছে তথ্য চায়, তখন রাষ্ট্র নীরব থাকে। আর গোপন হেফাজতে একজন মানুষ অদৃশ্য হয়ে যায়। কেজের মতে, হাসিনার শাসনে এই নীরবতাই ছিল দমননীতির সবচেয়ে ভয়াবহ অস্ত্র, যা ভুক্তভোগীকে যেমন নিশ্চিহ্ন করে, তেমনি সমাজকে ভীত করে তোলে।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, আল-আমিনের স্ত্রী এখন দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে একা। পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ায় তাদের ওপর নেমে এসেছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। সংসার চালানো, শিশুদের প্রয়োজন, চিকিৎসা, ঘরভাড়া, সবকিছুই অনিশ্চয়তায় পড়ে। কেজ বলেছে, গুম কেবল একজন মানুষকে সরিয়ে দেয় না, একটি পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করে, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে এবং মানসিকভাবে স্থায়ী অনিশ্চয়তায় আটকে রাখে।
কেজের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবার শুধু প্রিয়জনকে খুঁজছে না, তারা প্রতিদিন লড়ছে বেঁচে থাকার জন্যও। কোনো তথ্য নেই, কোনো মামলা নেই, কোনো রেকর্ড নেই। ফলে পরিবার জানে না কোথায় যাবে, কার কাছে বিচার চাইবে, কীভাবে সত্য বের করবে। এই অনিশ্চয়তাই এক ধরনের দৈনিক শাস্তি হয়ে দাঁড়ায় বলে সংস্থাটি মনে করে।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এই ঘটনাটি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক টার্গেটিংয়ের উদাহরণ। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রভাবের কেন্দ্র ধরে নজরদারি করা, তারপর কম আলোচনায় সাদা পোশাকে তুলে নেওয়া, কোনো কাগজ না দেখিয়ে অস্বীকার করা, এই পদ্ধতি দেখায় কীভাবে হাসিনার শাসন ইসলামি পরিমণ্ডলের ওপর দমননীতি চালিয়েছে।
কেজ বলেছে, এই ধরনের অপারেশনের লক্ষ্য কেবল একজন ব্যক্তিকে সরানো নয়। লক্ষ্য হলো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, পরিচালনা বা নেতৃত্বের ভেতরে ভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। এতে অন্যরাও চুপ হয়ে যায়, মানুষ কথা বলার আগে ভয় পায়, আর পুরো সমাজে নীরবতার দেয়াল শক্ত হয়।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল মনে করে, আল-আমিনের ঘটনায় মামলার দরজা বন্ধ রাখা ছিল দমননীতির কৌশলগত অংশ। মামলা না নিলে তদন্তের বাধ্যবাধকতা থাকে না, তদন্ত না থাকলে জবাবদিহি আসে না, জবাবদিহি না এলে গুমের সংস্কৃতি টিকে থাকে। কেজ বলেছে, এই চক্র ভাঙতে না পারলে গুমকে থামানো যায় না, কারণ অপরাধীরা জানে তাদের কিছু হবে না।
কেজ আরও বলেছে, হাসিনার শাসনে যে পরিবারগুলো গুমের শিকার হয়েছে, তাদের বড় অংশই থানায় গিয়ে একই অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছে। ফলে গুমের বিরুদ্ধে কথা বলাও অনেক সময় ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় ভয় ও রাষ্ট্রীয় নীরবতা একসাথেই কাজ করেছে, এমন অবস্থান কেজের।
কেজ ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সময়কালের গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাগুলো সত্য উদ্ঘাটন এবং জবাবদিহির মাধ্যমে সামনে না আনলে একই ধরনের দমননীতি আবার ফিরে আসতে পারে। সংস্থাটি জাতীয় সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন গঠন, গুমের প্রতিটি ঘটনার পূর্ণ তদন্ত, দায়ীদের বিচার, সাক্ষী সুরক্ষা, ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন এবং নিরাপত্তা খাতে মৌলিক সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে। কেজের অবস্থান, গুমের নীরবতা ভাঙা এবং প্রতিটি ঘটনার দায় নির্ধারণই ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রথম শর্ত।
সূত্র : কেজ ইন্টারন্যাশনাল











