জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সাবেক খতিব ও গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া থানায় অবস্থিত গওহারডাঙ্গা মাদরাসার মুহতামিম মুফতী রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে পৈতৃক সম্পত্তি দখলের মামলায় নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রেখেছেন পারিবারিক আপিল আদালত।
বুধবার (১৯ আগস্ট) গোপালগঞ্জ জেলার পারিবারিক আপিল আদালতের বিচারক শাহনাজ নাসরীন খান মুফতী রুহুল আমিনের করা আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।
মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৯ জানুয়ারি মুফতী রুহুল আমিনের ভাই ‘বড় পীর’ নামে পরিচিত মৃত হাফেজ মাওলানা ওমরের স্ত্রী ফাতেমা বেগম টুঙ্গিপাড়া থানা আমলি আদালত, গোপালগঞ্জে মুফতি রুহুল আমিনকে আসামি করে একটি নালিশি আবেদন করেন। আবেদনে ২০২৩ সালের ভূমি অপরাধ ও প্রতিকার দমন আইনের ৪ (১) (ক) ধারায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
মামলায় বাদী উল্লেখ করেন, টুঙ্গিপাড়া থানার ২৩ নম্বর শ্রীরামকান্দি মৌজার ২৮৬২ নম্বর খতিয়ানের বিআরএস ৪৯৭৯ নম্বর দাগে তার স্বামীর ১৭ শতাংশ এবং আসামির ১৭ শতাংশ জমি রয়েছে। কিন্তু মুফতী রুহুল আমিন পুরো জমি জোরপূর্বক দখলে নিয়ে সেখানে ইট, বালু ও সিমেন্ট দিয়ে দেয়াল নির্মাণ করেন। এতে বাধা দিতে গেলে তাদের ভয়ভীতি দেখানো এবং বাদীকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ করা হয়।
এই মামলায় ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মাদ আলী তালহা মুফতী রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে তাকে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও এক মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
রায়ের বিরুদ্ধে মুফতী রুহুল আমিন পারিবারিক আপিল আদালতে আপিল করেন। অন্যদিকে, মামলার বাদীও আসামির সাজা বাড়ানোর আবেদন করে আপিল করেন।
শুনানি শেষে বুধবার পারিবারিক আপিল আদালত উভয় পক্ষের আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বহাল রাখেন। একই সঙ্গে মুফতী রুহুল আমিনকে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মামলার বিষয়ে বাদীর ছোট জামাতা মুফতী ইসমাইল বলেন, ‘মুফতী রুহুল আমিন ধারাবাহিকভাবে ছদর সাহেব হুজুরের (মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.) বড় ছেলে ডা. মাওলানা ওমর আহমদ সাহেবের পরিবারের প্রতি জুলুম করে যাচ্ছেন। এই মামলা ছাড়াও আরও দুটি উচ্ছেদ মামলা তার বিরুদ্ধে চলমান রয়েছে। তার অপরাধের ফিরিস্তি অনেক লম্বা। সেই হিসেবে সাজা খুবই সামান্য।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম তার সাজা আরও বেশি হবে। তবে আদালত যা ভালো মনে করেছেন, আমরা এখন তা বাস্তবায়ন দেখতে চাই। এই জুলুমের প্রতিবাদ করার কারণে মুফতি রুহুল আমিন আমার প্রতি অনেক অবিচার করেছেন।’
মুফতী রুহুল আমিনের ভাগ্নে মোর্তাজা হাসান বলেন, ‘ওই জমিতে আমাদেরও অংশ রয়েছে। কিন্তু মামা জোর করে পুরোটাই নিজ দখলে নিয়েছেন।’
মুকসুদপুর থানার মাওলানা জাহিদ আল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছিলাম রুহুল আমিন সাহেব তার বড় ভাই পীর সাহেব হুজুরের এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের হক নষ্ট করছেন। আজ আদালতের রায়ে তা প্রমাণিত হলো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানি তিনি ও তার ছেলে ওসামা আমিন মিলে শুধু পারিবারিক খেয়ানত নয়, বরং গওহারডাঙ্গা মাদরাসা এবং গওহারডাঙ্গা শিক্ষা বোর্ডে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে যাচ্ছেন এবং ইচ্ছেমতো খেয়ানত করে যাচ্ছেন। এর একটা বিহিত হওয়া প্রয়োজন।’
প্রসঙ্গত, মুফতী রুহুল আমিন শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ আখ্যা দেওয়ায় আলেম-ওলামাদের একাংশের মধ্যে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের টিকিটে নড়াইল থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচন করতে চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনার সরকারের সময় তিনি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব পদে নিযুক্ত হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে বায়তুল মোকাররমে উপস্থিত হয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলাও চলমান রয়েছে।










