দখলকৃত ফিলিস্তিনের জেনিনে ইসরাইলী বিমান হামলায় নিহত শহীদদের জানাযায় গুলি চালালো আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত পশ্চিম তীরের মাহমুদ আব্বাস সরকারের প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (২১ মার্চ) এই ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনা ঘটে।
সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, জেনিনে আজ ইসরাইলী হামলায় শহীদদের জানাযাকে কেন্দ্র করে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের সাথে ফিলিস্তিন নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জানাযার জনসমাগমকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে ৪জন গুরুতর ভাবে আহত হোন। তন্মধ্যে ১জন মাথায় গুলিবিদ্ধ হোন। তার অবস্থা বর্তমানে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
ইসরাইলী সেনাবাহিনী ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেটের এক যৌথ বিবৃতিতে জানা যায়, জেনিনে তাদের আজকের বিমান হামলায় ফিলিস্তিন ইসলামিক জিহাদের অন্যতম শীর্ষ ২ সামরিক গোয়েন্দা আহমদ বারাকাত ও মুহাম্মদ শাওয়াখিন সহ সংগঠনটির মোট ৪ সদস্য নিহত হয়।
অপরদিকে ফিলিস্তিন স্বাধীনতাকামী ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের সশস্ত্র সংগঠন কাসসাম বিগ্রেড এক বিবৃতিতে জানায় যে, আজ জেনিনে ইসরাইলের এক হামলায় তাদের জেনিন শাখার ৩ সদস্য নিহত হয়েছে। তবে নিহতদের পরিচয় প্রকাশ করেনি এখনো স্বাধীনতাকামীদের সশস্ত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া দলটি।
উল্লেখ্য, ফিলিস্তিন ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস ও ফাতাহ আন্দোলনের মধ্যকার বিবাদ ও বিভেদ দীর্ঘদিনের। এটি নিছক কোনো বিবাদ ও বিভেদ নয় বরং এই বিবাদ ও বিভেদ আদর্শের এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের।
প্রথম ইন্তিফাদা পরবর্তী সময়ে মিশরের ইখওয়ানুল মুসলিমীনের সহায়তায় সমমনা বিভিন্ন গোষ্ঠীদের নিয়ে ১৯৮৭ সালে গঠিত হয় হামাস। ইসরাইলী কারাগার থেকে বন্দী বিনিময় চুক্তির আওতায় মুক্তি পাওয়া বিপ্লবী ফিলিস্তিনি নেতা শায়েখ ইয়াসিন দলটি প্রতিষ্ঠা করেন।
শায়েখ ইয়াসিনের প্রতিষ্ঠিত দল ও এর সমর্থকেরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জায়োনিস্ট বিরোধী লড়াই চালিয়ে যাওয়ায় বিশ্বাসী ছিলো পক্ষান্তরে ফাতাহ ও সমমনা দলগুলো সমাজবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ছিলো। কিন্তু উভয় দলের মাঝে চূড়ান্ত বিভেদ তৈরি হয় যখন বিশ্ব নন্দিত ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত ১৯৯৩ সালে তৎকালীন ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী আইজাক রবিনের সঙ্গে ‘অসলো চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যদিয়ে বিজয়ের অনেকটা দারপ্রান্তে থাকা ইসরাইল বিরোধী সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামেও ভাটা পড়ে।
কেননা পুরো ফিলিস্তিনের হয়ে ইয়াসির আরাফাতের সাক্ষরিত এই চুক্তির মধ্য দিয়ে ফাতাহ জায়োনিস্ট ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ইসরাইলও এই চুক্তির আওতায় ফিলিস্তিনের বৈধ ও একমাত্র কর্তা হিসেবে ফাতাহকে স্বীকৃতি প্রদান করে। পক্ষান্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনায় অন্যতম শক্তিশালী গোষ্ঠী হামাসকে অবহেলা করা হয়।
এই চুক্তির মাধ্যমে ইয়াসির আরাফাত মূলত ইসরাইলের বিরুদ্ধে বৃহৎ অর্থে সশস্ত্র সংগ্রামের ইতি টেনেছিলেন। বিশ্ব নন্দিত ফিলিস্তিনি নেতার এমন কাণ্ডে এডওয়ার্ড সাইদ থেকে শুরু করে উপনিবেশবাদবিরোধী সব চিন্তক ও বিল্পবীরাও হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এডওয়ার্ড সাইদ আরাফাতের এই চুক্তিকে শান্তি প্রতিষ্ঠা নয় বরং নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ ও ফিলিস্তিনিদের সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
বিশ্ব নন্দিত ফিলিস্তিনি বিপ্লবী ইয়াসির আরাফাতের এমন কাণ্ডে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের মাঝেও ইসলাম পন্থা ও সমাজবাদীতার মিশ্রণে গড়ে উঠা ফাতাহর প্রতি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। পশ্চিমা উপনিবেশ ও ইসরাইল প্রশ্নে আপোষহীন থাকায় ও ইসলাম পন্থায় অটল থাকায় ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে হামাসের জনপ্রিয়তা।
২০০০ সালের দ্বিতীয় ইন্তিফাদার সময় যা আরো বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে হামাস ২০০৬ সালের নির্বাচনে ইয়াসির আরাফাতের ফাতাহকে হারিয়ে দেয়। নির্বাচনে ১৩২ আসনের মধ্যে হামাস ৭৬টি এবং ফাতাহ ৪৩টি আসন পায়। নির্বাচনে ফাতাহর পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল, পশ্চিমাদের প্ররোচনায় ইসরাইলের সঙ্গে আপোষ এবং ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামকে বিকিয়ে দেওয়া।
নির্বাচনে জিতে হামাস ফিলিস্তিনে সরকার গঠন করলে এক বছরের মাথায় তাদের সরকারকে বরখাস্ত করেন ফাতাহর হয়ে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন থাকা মাহমুদ আব্বাস। এর অন্যতম কারণ ছিলো মুসলিম ব্রাদারহুডের আদর্শ ও ইসলাম পন্থায় উজ্জীবিত দল হওয়ায় আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো হামাসের সরকার গঠনের পর ফিলিস্তিনে সহযোগিতা প্রেরণ বন্ধ করে দেওয়া। আর একে জাতীয় সংকট হিসেবে চিহ্নিত করে মাহমুদ আব্বাসকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন সন্ত্রাসবাদ দমনের অজুহাতে মধ্যপ্রাচ্য তছনছ করে দেওয়ার প্রধান কারিগর আমেরিকার কন্ডোলিৎসা রাইস।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ফাতাহ সমর্থিত বাহিনী ও ইসরাইলী সেনাদের পরাজিত করে হামাস গাজ্জা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে। এই ঘটনায় বিশ্ব মানবতার শত্রু ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলও নড়েচড়ে বসে এবং উপত্যকাটিকে সর্বাত্মক অবরোধের আওতায় নিয়ে আসে। সেই থেকে পুরো ফিলিস্তিনি কার্যত ২ ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পশ্চিম তীর শাসন করতে থাকে ফাতাহর সরকার যারা আন্তর্জাতিক ভাবে ফিলিস্তিনের একমাত্র বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃত ও গাজ্জা শাসন করতে থাকে ফিলিস্তিন ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস যাদের এখনো পশ্চিমারা সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকে শুধুমাত্র মুসলিম ব্রাদারহুড ও ইসলাম পন্থায় বিশ্বাসী হওয়ায়।
পশ্চিমাদের অনুরোধে ফাতাহর পক্ষে কোনো সময় মিশর, কোনো তুরস্ক আবার কোনো সময় উভয় রাষ্ট্র একত্রে ২০০৭ থেকে ২০২৩ অবধি উভয় দলের মাঝে সমঝোতার বহু চেষ্টা চালিয়েছে। এক্ষেত্রে ইসরাইলের পক্ষ থেকেও দাবী উত্থাপন করা হয়েছে, যা মেনে নিলে তারা হামাসকে স্বীকৃতি দিবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু হামাসকে আজও তাদের আদর্শে বিন্দু পরিমাণ ছাড় দিতে দেখা যায়নি। তারা আজও সম্পূর্ণ স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। আর এতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে চলেছে তাদের সামরিক শাখা কাসসাম বিগ্রেড। যা বিলুপ্ত করার বিনিময়ে স্বীকৃতির প্রস্তাব প্রতিটি আলোচনার টেবিলে রাখা হচ্ছে তাদের সামনে।
সূত্র: আল জাজিরা











