স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও দেশের ২০ লক্ষাধিক কওমি মাদরাসা শিক্ষার্থী চরম বাজেট বৈষম্য ও পদ্ধতিগত অবহেলার শিকার হয়ে নিজ দেশেই পরবাসীর মতো জীবনযাপন করছে বলে মন্তব্য করেছেন আলেম, গবেষক ও শিক্ষাবিদরা।
তারা বলেন, শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ থাকলেও ৪০ হাজার মাদরাসার এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ শূন্য।
এই বৈষম্য দূর করে কওমি তরুণদের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে
রোববার (২১ জুন) রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে ‘কওমি তরুণদের বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক এক বিশেষ গোলটেবিল বৈঠকে বক্তরা এসব কথা বলেন।
বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট ইসলামি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক মুফতি আব্দুল্লাহ মাসুম।
বিশিষ্ট গবেষক ও আলেম মাওলানা মুসা আল হাফিজের সভাপতিত্বে গোলটেবিল বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় তরুণ আলেম, গবেষক, লেখক ও শিক্ষাবিদরা উপস্থিত ছিলেন।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৭১ সালের মহান জনযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের চরম অর্থনৈতিক ও বাজেট বৈষম্য। পূর্ব পাকিস্তান মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ হওয়া সত্ত্বেও বাজেটের সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হতো।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে ২০২৬ সালে এসেও স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখের বেশি কওমি জনগোষ্ঠী একই ধরনের কাঠামোগত বাজেট বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছে, যা তাদের মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।
বৈঠকে বক্তারা দেওবন্দি ঘরানার মূলনীতি উসুলে হাশতেগানার ব্যাখ্যা করে বলেন, উসুলে হাশতেগানা প্রণীত হয়েছিল মাদরাসার প্রশাসনিক স্বাধীনতা, পাঠ্যক্রম এবং অভ্যন্তরীণ পরিচালনাকে রাষ্ট্র ও শাসকের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার জন্য।
তারা বলেন, এর অর্থ এই নয় যে, কওমি শিক্ষার্থীরা এ দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক নিরাপত্তা ও দক্ষতা উন্নয়নের অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবে। মাদরাসার স্বকীয়তা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখেই তরুণদের নাগরিক অধিকারের বাজেট নিশ্চিত করা সম্ভব।
বৈঠকে কওমিভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা নিয়েও গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
বক্তারা প্রশ্ন তোলেন, ২০ লক্ষাধিক কওমি শিক্ষার্থীর কণ্ঠ কেন আজ হারিয়ে গেছে? দলগুলো কি কওমি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের রাজনীতি করছে, নাকি কেবল তাদের আবেগ ও ভোট ব্যাংকে রূপান্তর করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করছে?
আলেমরা স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, কওমির নামে রাজনীতি করলে শুধু ভোটের সময় নয়, বাজেটের সময়ও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে উত্থাপিত দাবিগুলো
১. শিক্ষা সহায়তা ও জাতীয় বৃত্তি: কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য মেধাভিত্তিক ও প্রয়োজনভিত্তিক বিশেষ জাতীয় উপবৃত্তি এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য জাতীয় বাজেট থেকে বরাদ্দ রাখা।
২. দক্ষতা উন্নয়ন ও আইটি প্রশিক্ষণ: সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক ভিত্তিতে তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষা শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, কারিগরি ও আধুনিক কৃষি বিষয়ে সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ রাখা।
৩. ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি: কওমি তরুণদের জন্য স্বল্পমূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা এবং বিশ্বমানের অনলাইন শিক্ষা ও ই-লাইব্রেরি রিসোর্সে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।
৪. স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা: শিক্ষার্থীদের জন্য জরুরি চিকিৎসা ও কল্যাণ তহবিল গঠন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মাদ্রাসাসমূহের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন বাজেট বরাদ্দ করা।
৫. পেশাগত ক্যারিয়ার উন্নয়ন: চাকরির বাজারে সক্ষমতা বাড়াতে বিশেষ ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, ইন্টার্নশিপ এবং ইমাম, খতিব ও শিক্ষকদের পেশাগত মান উন্নয়নে বিশেষ সরকারি একাডেমির সংস্থান করা।
সমাপনী বক্তব্যে সাধারণ আলেম সমাজের মুখপাত্র রিদওয়ান হাসান বলেন, শিক্ষার ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু নাগরিক অধিকারে কোনো ভিন্নতা থাকতে পারে না।
তিনি বলেন, গোলটেবিল বৈঠক থেকে গৃহীত সুপারিশমালাকে একটি চূড়ান্ত খসড়া নীতিমালায় রূপান্তর করা হবে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তা অর্থ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে স্মারকলিপি হিসেবে পেশ করা হবে।
রিদওয়ান হাসান আরও জানান, এই দাবির পক্ষে দেশব্যাপী কওমি তরুণদের নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক জনমত গড়ে তোলা হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন গবেষক ও আলেম শরীফ মুহাম্মদ, মুফতী আব্দুল্লাহ মাসুম, সাধারণ আলেম সমাজের সভাপতি মুফতি মাছুম বিল্লাহ মাহমুদী, সাধারণ সম্পাদক আকিফ আব্দুল্লাহ, সাংগঠনিক সম্পাদক ইউসুফ আহমাদ, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলেম ফজলুল করীম মারুফ, আল-মারকাজুল ইসলামির চেয়ারম্যান হামজা শহীদুল ইসলাম, সাধারণ আলেম সমাজের যুগ্ম আহ্বায়ক মানযুর হাসান যুবায়ের, মুফতী মিনহাজ উদ্দীন, মুফতী ইমামুদ্দীন, মাওলানা রেজাউল করীম আবরার, একটিভিস্ট রুহুল আমিন সাদী, আলী হাসান উসামা, এহসানুল হক, আশরাফ উদ্দীন মাহদী, মুহিউদ্দিন কাসেমী, মনযূরুল হক, ইমরান রাইহান, মাহমুদ সিদ্দিকী, খালিদ মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ, সানাউল্লাহ খান, মুনতাছির আহমাদ, রিদওয়ান মাযহারী, হাসান ইনাম, রায়হান আলী, জাওয়াদ আহমাদ, মাবরুরুল হক, মোল্লা খালিদ সাইফুল্লাহ, ইউসুফ আম্মার, আবু বকর সিদ্দিক জাবের প্রমুখ এবং সাধারণ আলেম সমাজের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ববৃন্দ।











