লেবাননের সংকট অত্যন্ত জটিল পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শার’আ আল জুলানী। পরিস্থিতি সমাধানে সিরিয়া একটি নতুন পদ্ধতি সামনে এনেছে বলে জানান তিনি। এই পদ্ধতিতে তাৎক্ষণিকভাবে সংঘাত বন্ধ করা এবং একটি বিস্তৃত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রক্রিয়া শুরু করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশটিতে রাজনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে আছে। একই সঙ্গে মানবিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকটও দিন দিন আরও ভয়াবহ হচ্ছে।
রোববার (২১ জুন) আল মাশহাদ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
আল-শার’আ বলেন, আমেরিকা ও কয়েকটি আন্তর্জাতিক পক্ষের সঙ্গে আলোচনার সময় সিরিয়ার এই প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে। এতে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করা, লেবানন ও সিরিয়া উভয় দেশের ওপর যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলা করা এবং প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে সমাধানের পথ খোঁজার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, প্রচলিত কাঠামো বাস্তব ফলাফল আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, লেবানন এখন বিস্তৃত এক যুদ্ধের মুখোমুখি। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চলছে। অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে।
আল-শার’আ জানান, এই পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব সিরিয়ার ওপর পড়ছে। বিশেষ করে সীমান্ত নিরাপত্তা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বেকা উপত্যকায় সিরিয়া-লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহ-সংশ্লিষ্ট বাহিনীর উপস্থিতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
তিনি বলেন, লেবাননের সংকট ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয় থেকে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে লেবানন একসময় যে উন্নয়নমূলক পথের ওপর নির্ভর করত, সেদিকে আন্তর্জাতিক মনোযোগ কমে যাওয়ার পর এই সংকট আরও জটিল হয়েছে।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, লেবাননের সমাধান সামরিক বা আংশিক হতে পারে না। সমাধান আসতে হবে একটি সমন্বিত প্যাকেজের মাধ্যমে। এতে যুদ্ধ বন্ধ করা, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক পথ সক্রিয় করা এবং সংকট কমিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সিরিয়া ও লেবাননের মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ পুনরুদ্ধার করতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো সমাধানের সঙ্গে পারস্পরিক নিশ্চয়তা থাকতে হবে। এতে দুই দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে, নিরাপত্তা উদ্বেগের সমাধান হবে এবং আঞ্চলিক সংবেদনশীলতাও বিবেচনায় থাকবে। তার ভাষায়, আংশিক সমাধান বারবার ব্যর্থ হয়েছে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য সম্পর্কে আল-শার’আ বলেন, কিছু সংবাদমাধ্যম তার বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করেছে। আমেরিকান আলোচনায় মূলত লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করা এবং সমঝোতার জন্য শান্তিপূর্ণ চ্যানেল তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সিরিয়ার গঠনমূলক ভূমিকার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে এর অর্থ কোনো সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা নয়।
তিনি আবারও বলেন, সিরিয়া তার সীমান্তের বাইরে কোনো সামরিক বিকল্প গ্রহণ করে না। সিরিয়ার ভূমিকা হলো সরকারি পথের মাধ্যমে স্থিতিশীলতাকে সমর্থন করা, লেবাননের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আরও উত্তেজনা ঠেকাতে লেবাননের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সংলাপ সহজ করা।
আল-শার’আ বলেন, সিরিয়া সব আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতার জন্য উন্মুক্ত। সাম্প্রতিক সিরীয় অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, জটিল সংকট মোকাবিলায় কোনো একটি রাষ্ট্র বা অক্ষের ওপর নির্ভর না করে বিস্তৃত সম্পৃক্ততা জরুরি।
সিরিয়ার ভবিষ্যৎ পথ সম্পর্কে তিনি বলেন, দেশটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, পুনর্গঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারকে কেন্দ্র করে একটি স্পষ্ট কৌশলগত পথে এগোচ্ছে। সিরিয়া একটি কঠিন পর্যায় অতিক্রম করেছে। এখন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ও সেবা অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং একটি সমন্বিত উন্নয়ন মডেল প্রতিষ্ঠার দিকে এগোচ্ছে।
তিনি জানান, সিরিয়ার পুনরুদ্ধার মডেল এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে এটি ইতিবাচক সূচক অনুযায়ী এগোচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, ব্যাংকিং, কৃষি ও শিল্প খাতে সংস্কারের কাজ চলছে। এসব উদ্যোগ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়াবে এবং একটি সমন্বিত উন্নয়ন পর্যায় প্রতিষ্ঠা করবে। তার মতে, আগামী পর্যায় হবে কাজ ও নির্মাণের, সংঘাতের নয়।
সিরিয়া-লেবানন সম্পর্ক নিয়ে আল-শার’আ বলেন, সিরিয়া লেবাননকে স্বাভাবিক অংশীদার হিসেবে দেখে। দুই দেশের সম্পর্ক মতভেদের জায়গা থেকে নয়, বরং মিলের জায়গাগুলোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা উচিত।
তিনি বলেন, দুই দেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতার কারণে বাণিজ্য, জ্বালানি, পরিবহন ও সেবা খাতে অর্থনৈতিক একীভূত হওয়ার বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
আল-শার’আ বলেন, দুই দেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাস স্বাভাবিক এক ধরনের একীভূত হওয়ার বাস্তবতা তৈরি করেছে। বৈরুত দামেস্কের সমুদ্রপ্রান্ত এবং ত্রিপোলি হোমসের সমুদ্রপ্রান্ত হিসেবে বিবেচিত। এ কারণে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় সক্রিয় করা একটি কৌশলগত বিকল্প, যা দুই জনগণের স্বার্থে কাজ করবে।
তিনি বলেন, “আজ সিরিয়া পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে একটি কৌশলগত সংযোগ তৈরি করছে। ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে এর ভৌগোলিক অবস্থান আন্তর্জাতিক সরবরাহ ও বাণিজ্য শৃঙ্খলে সিরিয়ার গুরুত্ব বাড়িয়ে দিচ্ছে। যৌথ সহযোগিতা সক্রিয় হলে এর ইতিবাচক প্রভাব লেবাননের ওপরও পড়তে পারে।”
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বলেন, সামরিক সমাধান থেকে অর্থনৈতিক সমাধানের দিকে যাওয়া এখন বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠেছে। অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, সশস্ত্র সংঘাত কোনো পক্ষের জন্য স্থিতিশীলতা আনেনি। অথচ অর্থনৈতিক একীভূত হওয়া উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
সিরিয়া ও লেবাননের সীমান্ত নির্ধারণ প্রসঙ্গে আল-শার’আ বলেন, বিষয়টি বর্তমান পরিস্থিতির জটিলতার সঙ্গে যুক্ত। এই পর্যায়ে অগ্রাধিকার হলো পরিস্থিতি শান্ত করা এবং উত্তেজনা বন্ধ করা। এরপর বিস্তৃত ঐকমত্য প্রয়োজন এমন কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে এগোনো যেতে পারে।
তিনি বলেন, সম্পর্ক শুরু হওয়া উচিত অভিন্ন বোঝাপড়ার জায়গা থেকে, বিরোধের জায়গা থেকে নয়। কারণ, যুদ্ধের সময় বিতর্কিত বিষয়গুলোর বিস্তারিত আলোচনায় গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। অমীমাংসিত বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে শান্ত আলোচনার কাঠামোর মধ্যে সমাধান করা সম্ভব।
আরেক প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট আল-শার’আ লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, স্থিতিশীল পরিবেশ এবং বাস্তবায়নযোগ্য অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি না করা যেকোনো চুক্তি অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে থাকবে। অঞ্চলটিতে যেকোনো শান্তি প্রক্রিয়া বা উত্তেজনা প্রশমনের জন্য বাস্তব শর্ত তৈরি করা জরুরি।
তিনি বলেন, সংকট মোকাবিলায় সংলাপই প্রধান পথ। এর মধ্যে লেবাননের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সংলাপও রয়েছে। যেকোনো রাজনৈতিক অচলাবস্থা শেষ পর্যন্ত আরও উত্তেজনার দিকে নিয়ে যায়। আর সংলাপের বিকল্প হলো যুদ্ধ, যা সিরিয়া বা লেবানন, কেউই চায় না।
হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা সম্পর্কে আল-শার’আ বলেন, গভীর মতভেদ থাকা পক্ষগুলোর সঙ্গেও সংকট মোকাবিলায় সংলাপই সবচেয়ে ভালো পথ। লক্ষ্য হলো লেবাননের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং দেশটিকে আরও সংঘাতে জড়িয়ে পড়া থেকে বাঁচানো।
তিনি বলেন, সিরিয়ায় হিজবুল্লাহর হস্তক্ষেপ ছিল একটি ভুল। এটি সিরীয় স্মৃতিতে এখনো তাজা থাকা বেদনাদায়ক ক্ষত রেখে গেছে। তবে এর কারণে লেবাননে যুদ্ধ ও সংঘাতের পুনরাবৃত্তি হওয়া উচিত নয়। তিনি সংঘর্ষ বন্ধ করে উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।
আল-শার’আ অতীত অভিজ্ঞতা পুনর্বিবেচনা এবং এমন সমাধান খোঁজার আহ্বান জানান, যা শিয়া সম্প্রদায়সহ লেবাননের সব সম্প্রদায়ের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। তিনি বলেন, লেবাননের যেকোনো সম্প্রদায়কে রক্ষা করা লেবানন ও পুরো অঞ্চলের স্বার্থে। যুদ্ধ বন্ধ করা এবং দেশের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক ও জাতীয় ঐকমত্য শক্তিশালী করার সুযোগ এখনো রয়েছে।
তিনি বলেন, লেবাননের প্রতি সিরিয়ার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই। সিরিয়ার ভূমিকা স্থিতিশীলতা, শান্তি ও উন্নয়নকে সমর্থন করার ওপর ভিত্তি করে। আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে সিরিয়ার যেকোনো পদক্ষেপ জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। বিশেষ করে সিরীয় ও লেবাননি জনগণের স্বার্থের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকবে। এর মাধ্যমে যুদ্ধাবস্থা শেষ করে পুনর্গঠন ও স্থায়ী স্থিতিশীলতার পর্যায়ে এগোনো সম্ভব হবে।
ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধ প্রসঙ্গে প্রেসিডেন্ট আল-শার’আ বলেন, সামরিক সংঘাত কোনো বাস্তব ফলাফল আনে না। এ ধরনের যুদ্ধে উভয় পক্ষই সাধারণত ক্ষতির মুখে পড়ে। তাই উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনায় ফিরে যাওয়া জরুরি।
শেষে প্রেসিডেন্ট আল-শার’আ বলেন, “আমাদের যদি কোনো সংঘাত বা যুদ্ধে জড়ানোর ইচ্ছা থাকত, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা করার সাহস আমাদের আছে। লেবাননে আমাদের জনগণের জন্য আমরা কল্যাণ ছাড়া আর কিছুই চাই না। আমরা তাদের জন্য সুখী জীবন ছাড়া আর কিছুই কামনা করি না। সিরিয়ার ভূমিকা সম্পূর্ণ ইতিবাচক এবং এটি লেবানন ও সিরিয়া, উভয় দেশের স্বার্থের ভিত্তিতে নির্ধারিত।”
সূত্র: আল মাশহাদ টিভি, সানা নিউজ











