ভারতে মুসলিমদের “অবনতিশীল পরিস্থিতি” নিয়ে শিগগিরই একটি সমন্বিত নথি প্রকাশ করবে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড। একই সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি।
সোমবার (২২ জুন) বোর্ডের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এর আগের দিন রোববার (২১ জুন) সংগঠনের নির্বাহী কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত ও আলোচনার বিষয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন এআইএমপিএলবি মুখপাত্র এস.কিউ.আর. ইলিয়াস। তিনি বলেন, বোর্ড দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সামনে থাকা সংকটগুলো বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছে। পাশাপাশি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, এসব সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে উন্মত্ত জনতার সহিংসতা ও গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা বৃদ্ধি, মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও এলাকা, মসজিদ ও মাদরাসাকে লক্ষ্য করে ভাঙচুর ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযান, বুলডোজার সন্ত্রাস, সরকারি অনুষ্ঠান ও স্কুলে বন্দে মাতরম বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা, সরকারি সহায়তাপ্রাপ্ত মাদরাসাগুলোতে অভিন্ন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন এবং মধ্যপ্রদেশের কমল মাওলা মসজিদ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক রায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত।
এস.কিউ.আর. ইলিয়াস বলেন, নির্বাহী কমিটি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলো, দেশ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের দ্রুত অবনতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
কমিটি বলেছে, মুসলিমদের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও মর্যাদা, মসজিদ, মাদরাসা, কবরস্থান, মুসলিম পার্সোনাল ল’, মৌলিক অধিকার, এমনকি তাদের ঈমান ও বিশ্বাসের ওপরও ধারাবাহিক হামলা চলছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর কথিত মন্তব্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে এস.কিউ.আর. ইলিয়াস বলেন, “আমরা কংগ্রেসসহ সব দলের ওপরই অসন্তুষ্ট। তাদের কেউই মুসলিমদের ইস্যুগুলো জোরালোভাবে তুলে ধরে না।”
রাহুল গান্ধীর ওই কথিত মন্তব্যে বলা হয়েছিল, কোনো ইস্যু যদি মুসলিমদের বিষয়ে হয়, তাহলে সেখানে সংখ্যালঘুদের সাধারণ উল্লেখ না করে মুসলিম সম্প্রদায়ের নাম নির্দিষ্টভাবে বলা উচিত।
এস.কিউ.আর. ইলিয়াস বলেন, নির্বাহী কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের অবনতিশীল অবস্থা, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন নিয়ে একটি সমন্বিত নথি প্রস্তুত ও প্রকাশ করা হবে, যাতে মানুষের বিবেক জাগ্রত করা যায়।
কমল মাওলা মসজিদ মামলার বিষয়ে নির্বাহী কমিটি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের রায় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কমিটি বলেছে, এ বিষয়ে ঐতিহাসিক প্রমাণ, রাজস্ব নথি এবং ঔপনিবেশিক আমলের সরকারি দলিলপত্র রয়েছে। রায়টি ওই স্থানে মুসলিমদের শতাব্দীপ্রাচীন ইবাদতের ঐতিহ্যের পরিপন্থী। একই সঙ্গে এটি ১৯৯১ সালের প্লেসেস অব ওয়ারশিপ অ্যাক্টের চেতনার সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এস.কিউ.আর. ইলিয়াস বলেন, নির্বাহী কমিটি কমল মাওলা মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে রায়ের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানানোর পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে কমিটির আইনি লড়াইয়ে এআইএমপিএলবি সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা দেবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করেছে, বন্দে মাতরম বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
মাদরাসায় বন্দে মাতরম গাওয়া বাধ্যতামূলক করে সরকারের নির্দেশনার ওপর কলকাতা হাইকোর্ট যে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছে, বোর্ড সেটিকে স্বাগত জানিয়েছে।
এস.কিউ.আর. ইলিয়াস বলেন, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসির নামে চলমান আইন প্রণয়নের প্রচেষ্টা নিয়েও নির্বাহী কমিটি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বৈঠকে উল্লেখ করা হয়, উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের পর এখন আসাম, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রেও ইউসিসি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে।
বোর্ড স্পষ্ট করেছে, ইউনিফর্ম সিভিল কোড এমন কোনো বাধ্যতামূলক সাংবিধানিক নির্দেশনা নয়, যা বাস্তবায়নে আদালত বাধ্য। বরং এটি রাষ্ট্র পরিচালনার নির্দেশমূলক নীতির অন্তর্ভুক্ত বাধ্যতামূলক নয় এমন একটি দিকনির্দেশনা।
এস.কিউ.আর. ইলিয়াস বলেন, মুসলিমদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণ, সাংবিধানিক নীতিমালা লঙ্ঘন, ঘৃণা ও বৈরিতা ছড়ানো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা, মুসলিমদের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও মর্যাদার ওপর হামলা এবং মসজিদ-মাদরাসা গুঁড়িয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে বোর্ড দেশব্যাপী আন্দোলন শুরু করবে।
তিনি বলেন, ন্যায়প্রেমী, গণতন্ত্রপ্রেমী ও শান্তিপ্রেমী সমাজের অংশগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এ আন্দোলন পরিচালনা করা হবে। এ উদ্দেশ্যে একটি অ্যাকশন কমিটি গঠন করা হচ্ছে। জুলাইয়ের শেষ নাগাদ আন্দোলন শুরু হতে পারে বলেও জানান তিনি।
রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাহী কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন এআইএমপিএলবি সভাপতি মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ রহমানী। বৈঠকের কার্যক্রম পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা ফজলুর রহিম মুজাদ্দিদী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নির্বাহী কমিটির সদস্যরা বৈঠকে অংশ নেন।
সূত্র: দ্য হিন্দু











