ভারতের উত্তর প্রদেশে বাড়ি বা ব্যক্তিগত জায়গায় শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ আদায়ের ঘটনাকেও আইনশৃঙ্খলার ইস্যু বানিয়ে মুসলিমদের আটক ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সর্বশেষ উত্তর প্রদেশের বেরেলি জেলায় একটি খালি বাড়ির ভেতরে জুমার নামাজ আদায়ের ঘটনায় অন্তত ১২ জন মুসলিমকে পুলিশ আটক করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর প্রদেশের বেরেলি জেলার একটি গ্রামে একটি খালি বাড়িতে জুমার নামাজ আদায় করা হয়। এর ভিডিও গোপনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর স্থানীয় আপত্তি ও অভিযোগের কারণ দখিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১২ জনকে আটক করে।
পুলিশ যুক্তি দেখিয়ে জানায়, প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়া ওই বাড়িতে নিয়মিতভাবে সমবেত হয়ে নামাজ পড়া হচ্ছিল, তাই শান্তি রক্ষায় ”প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা” নেওয়া হয়েছে। বাড়িটির মালিকের অনুমতি নিয়েই সেখানে নামাজ আদায় হচ্ছিল এবং এলাকায় বিকল্প জায়গা সংকট থাকায় মানুষ সেখানে জড়ো হয়েছিল।
এই ঘটনায় পুলিশ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ধারা ১৭০ প্রয়োগ করেছে, যেখানে গুরুতর অপরাধের পরিকল্পনার সন্দেহ হলে বিনা পরোয়ানায় আটকের সুযোগ আছে। তবে এমন আটক ২৪ ঘণ্টার বেশি রাখা যায় না। পুলিশ নামাজকে “অবৈধ” আখ্যা দিয়ে আটককে “সতর্কতামূলক ব্যবস্থা” হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে বলেন, আইনে এমন কিছু নেই যা “নামাজ বা কোনো ধরনের প্রার্থনাকে অপরাধ” হিসেবে গণ্য করে। তিনি বলেন, ধরুন বাড়ির মালিক কোনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন, এর পরিণতি সর্বোচ্চ বেসামরিক হতে পারে, যেমন জরিমানা। কিন্তু নামাজ আদায়কারীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি শাস্তি বা কারাবাসের যুক্তি দাঁড়ায় না।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বৃন্দা গ্রোভার বলেছেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫ অনুযায়ী ধর্ম পালন মৌলিক অধিকার, আর মুসলিমদের জন্য নামাজ সেই অধিকারচর্চার অন্যতম মূল অনুষঙ্গ। তাই নিশ্চিন্ত ধর্মীয় অধিকার পালনের ঘটনাকে কীভাবে অপরাধ হিসেবে দেখা যায়, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। আরেক আইনজীবী আনাস তানভীর বলেন, ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে এমন সমাবেশ নিষিদ্ধ বা আটক করতে হলে রাষ্ট্রকে আগে স্পষ্ট আইনগত ভিত্তি দেখাতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বেরেলির ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। উত্তর প্রদেশে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা জনপরিসরে নামাজের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মুসলিমদের বিরুদ্ধে মামলা, আটক বা তদন্তের নজির রয়েছে। আইনজীবীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এসব ঘটনায় মুসলিম সমাজের ওপর ভয় ও চাপ তৈরি হয়, যেখানে “প্রক্রিয়াই শাস্তি” হয়ে ওঠে; গ্রেপ্তার, জামিন, আইনজীবী খরচ এবং সামাজিক হয়রানি মিলিয়ে মানুষের ধর্মীয় অধিকারচর্চা নিরুৎসাহিত হয়।
সূত্র : বিবিসি, স্ক্রল, এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য ওয়্যার, হিন্দুস্তান টাইমস











