spot_img
spot_img

পূর্ব-পশ্চিমের কোনো পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই তুরস্কের: এরদোগান

পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই তুরস্কের বলে মন্তব্য করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান। তিনি জানিয়েছেন, আঙ্কারা বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে। এর আওতায় ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক ও প্রতিশ্রুতি আরও গভীর করার পাশাপাশি চীন ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব বাড়ানো হবে।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) প্রকাশিত ‘নিউজউইক’-কে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে এরদোগান বৈশ্বিক শক্তির পরিবর্তনশীল ভারসাম্য নিয়ে তুরস্কের অবস্থান তুলে ধরেন। এতে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, ইরান ও ইসরাইলকে ঘিরে উত্তেজনা, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং সিরিয়ার পরিস্থিতি নিয়েও তিনি কথা বলেন।

এরদোগান বলেন, তুরস্কের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে একাধিক জোট ও অংশীদারত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “আমরা মনে করি না যে তুরস্ককে পশ্চিম অথবা পূর্বের মধ্যে যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বলা সঠিক।”

তিনি জানান, আঙ্কারা একই সঙ্গে ন্যাটোর ভেতরে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে এবং তুর্কি রাষ্ট্রগুলোর সংস্থা, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা আরও গভীর করছে। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় তুরস্কের সংলাপ অংশীদারের মর্যাদা রয়েছে।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ানোর আগ্রহও প্রকাশ করেন এরদোগান। ট্রান্স-ক্যাস্পিয়ান ইস্ট-ওয়েস্ট-মিডল করিডোরের মাধ্যমে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদীয়মান শক্তিগুলো বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও বেশি প্রতিনিধিত্বের দাবি জানাচ্ছে।

তিনি বলেন, “বিশ্বের মাধ্যাকর্ষণের কেন্দ্র পরিবর্তিত হচ্ছে।” নতুন বাস্তবতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা খাপ খাওয়ানোর জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সংস্কার এনে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার আহ্বান জানান তিনি।

মক্কা চুক্তি কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে নয়

আগস্টে তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি প্রসঙ্গে এরদোগান এই চুক্তিকে ইরান বা ইসরাইলবিরোধী জোট হিসেবে দেখার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি বলেন, “মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ইরান, ইসরাইল বা অন্য কোনো তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত জোট হিসেবে দেখা সঠিক হবে না।” বরং তিনি এই চুক্তিকে আরও নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অভিন্ন দায়িত্ববোধের প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন।

এই চুক্তির ভিত্তি জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ। এতে আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো স্বাক্ষরকারী দেশের ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সব পক্ষের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

এরদোগান স্পষ্ট করে বলেন, কোনো হামলার ক্ষেত্রে কী ধরনের জবাব দেওয়া হবে, তা আক্রান্ত পক্ষের নির্দিষ্ট অনুরোধ ও প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করবে। এর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সহায়তা থেকে শুরু করে গোলাবারুদ সরবরাহও থাকতে পারে। তবে ইরাক, ইয়েমেন বা অন্য কোথাও সম্ভাব্য কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এমন ধারণা করা থেকে সতর্ক করেন তিনি।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ

আমেরিকা, ইসরাইল ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত প্রসঙ্গে এরদোগান দুই পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রে আঙ্কারার অবস্থান তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, “ন্যাটোর মধ্যে আমেরিকা আমাদের মিত্র। ইরান আমাদের প্রতিবেশী।” তিনি জানান, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকে তিনি কূটনীতির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে উত্তেজনা কমাতে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগের পথ খোলা রেখেছে তুরস্ক।

তিনি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের জন্য হুমকি তৈরি করছে। তাই সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রসঙ্গে এরদোগান বলেন, সরাসরি যোগাযোগ মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের সুযোগ তৈরি করে। তবে আঙ্কারা জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জোটগত প্রতিশ্রুতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবে বলেও জানান তিনি।

ইসরাইলি কর্মকর্তারা ইরানের পর তুরস্ককে “পরবর্তী” হুমকি হিসেবে তুলে ধরার বিষয়ে এরদোগান বলেন, কোনো তৃতীয় দেশের মাধ্যমে আঙ্কারা ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

তিনি বলেন, “আমি কোনো তৃতীয় দেশের মাধ্যমে তুরস্ক-আমেরিকা সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করি না। ওয়াশিংটনে আমাদের প্রতিপক্ষ হলো আমেরিকার সরকার। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করার মতো কোনো বিষয় থাকলে আমরা সরাসরি তাঁর সঙ্গেই কথা বলি।”

এ ধরনের বক্তব্যকে ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সিরিয়ায় একীভূতকরণ ও ইউক্রেন শান্তি উদ্যোগ

সিরিয়া প্রসঙ্গে এরদোগান বলেন, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় ঐক্য রক্ষায় সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমান নাগরিকত্বের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সঙ্গে একীভূত করতে হবে।

তিনি বলেন, ইরানের পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে পিকেকে/পিজেএকে কোনো ধরনের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে কি না, তা তুরস্ক পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে বাইরের কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেন তিনি।

এরদোগান বলেন, “তুরস্কের মানদণ্ড জাতিগত পরিচয় নয়, বরং সন্ত্রাসবাদ, সহিংসতা এবং আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।”

তিনি পিকেকের বিলুপ্তির সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এর পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলে জানান।

ইউক্রেন প্রসঙ্গে এরদোগান রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে নতুন করে শান্তি আলোচনা আয়োজনের ক্ষেত্রে তুরস্কের প্রস্তুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। এ ক্ষেত্রে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত আগের আলোচনা এবং কৃষ্ণসাগর শস্য উদ্যোগসহ অতীতের সফল উদ্যোগগুলোর কথা উল্লেখ করেন তিনি।

এরদোগান বলেন, “প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রকাশ করা হলে তুরস্ক পক্ষগুলোকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে এবং শান্তির পথ তৈরি করতে অবদান রাখার জন্য প্রস্তুত।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, সংঘাত যাতে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষ্ণসাগরে বাণিজ্যিক নৌ চলাচল, বাণিজ্যপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে সংঘাতের প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

সূত্র : ইয়েনি শাফাক

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ