spot_img

চীন-পাকিস্তানকে ঠেকাতে প্রতি দেড় মাসে ১টি করে যুদ্ধজাহাজ বানাচ্ছে ভারত

চীন তার বিশাল নৌবহর আরও সম্প্রসারিত করছে। অন্যদিকে পাকিস্তান চীনের তৈরি আধুনিক হামলাকারী সাবমেরিন নৌবাহিনীতে যুক্ত করছে। এতে ভারত মহাসাগরে নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ বেড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে আগামী এক দশকের মধ্যে নৌবহরে জাহাজের সংখ্যা ২০০টির বেশি করার লক্ষ্য নিয়েছে ভারত। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেশটি বর্তমানে প্রায় প্রতি দেড় মাসে একটি নতুন যুদ্ধজাহাজ নৌবাহিনীতে যুক্ত করছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চলতি মাসে স্টেলথ ফ্রিগেট আইএনএস মহেন্দ্রগিরি ও সাবমেরিন হান্টার জাহাজ আইএনএস মালভানের কমিশনিং ভারতের এ প্রচেষ্টার প্রতীক। দেশে নির্মিত এ দুটি যুদ্ধজাহাজকে নয়াদিল্লির নৌবহর সম্প্রসারণ এবং বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা কমানোর সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

ভারতের নৌবাহিনীতে বর্তমানে প্রায় ১৫০টি জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ১৩৫টিকে ফ্রিগেট, ডেস্ট্রয়ার ও সাবমেরিনের মতো সম্মুখসারির যুদ্ধজাহাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আরও প্রায় ৫০টি জাহাজ বর্তমানে নির্মাণাধীন।

সাবেক রিয়ার অ্যাডমিরাল ও বর্তমান প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক সঞ্জয় মিশ্র বলেন, ‘নৌবহরের বড় অংশই দেশীয় সহায়তায় নির্মিত জাহাজ হওয়ায় ২০৩৫ সালের মধ্যে ২০০টি জাহাজের নৌবহর গড়ে তোলার লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জনযোগ্য। প্রয়োজনীয় গতি পেলে আমরা এই সংখ্যাও ছাড়িয়ে যেতে পারি।’

মিশ্র মনে করেন, বর্তমান কৌশলগত পরিস্থিতিতে ভারতের স্থায়ীভাবে প্রস্তুত অবস্থায় অন্তত দুটি অত্যন্ত গতিশীল ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নৌবহর প্রয়োজন। এমন অবস্থান বজায় রাখতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ ও সহায়ক জাহাজ দরকার হবে।

এ লক্ষ্যে ভারতীয় নৌবাহিনী নতুন জাহাজ অন্তর্ভুক্তির গতি বাড়িয়েছে। বর্তমানে প্রায় প্রতি ছয় সপ্তাহে একটি নতুন যুদ্ধজাহাজ নৌবাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে। শুধু গত দেড় মাসেই দেশে নির্মিত পাঁচটি জাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

২০৪৭ সালের মধ্যে জাহাজ নির্মাণ এবং জাহাজের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরিতে সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরতা অর্জন করাই ভারতের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।

তবে সমালোচকেরা এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু বাধার কথা উল্লেখ করেছেন। বিশেষায়িত ইস্পাত ও অন্যান্য উপকরণের জন্য ভারতকে এখনো ব্যাপকভাবে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এ ছাড়া দেশটির অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন এবং জাহাজ নির্মাণ কারখানার অবকাঠামোও পুরোনো, যা অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

মিশ্র এ ক্ষেত্রে দুটি প্রধান দুর্বলতার কথা উল্লেখ করেন। সেগুলো হলো অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং সেন্সর, অস্ত্রব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা।

তিনি বলেন, ‘তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছি। খুব দূরের নয় এমন ভবিষ্যতে এসব বিশেষায়িত প্রযুক্তির অনেকগুলোই দেশে তৈরি হবে বলে আমরা নিশ্চিত।’

জাপানের একটি প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করেন মিশ্র। ওই প্রস্তাবে ভারতের জাহাজ নির্মাণ কারখানায় পূর্ব এশিয়ার দেশটির মোগামি শ্রেণির ফ্রিগেট যৌথভাবে নির্মাণের কথা বলা হয়েছে।

চলতি মাসের শুরুতে ভারত ও জাপান যৌথভাবে ‘ইউনিকর্ন’ স্টেলথ মাস্ট তৈরির একটি চুক্তি করেছে। এ ব্যবস্থা ভারতীয় যুদ্ধজাহাজকে শত্রুপক্ষের রাডারে শনাক্ত করা আরও কঠিন করে তুলবে।

গত বছর ভারত সরকার ৮৪০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি সামুদ্রিক খাত পুনরুজ্জীবন কর্মসূচি চালু করে। ২০৪৭ সালে স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্তির মধ্যে ভারতকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি জাহাজ নির্মাণকারী দেশের একটিতে পরিণত করাই এ কর্মসূচির লক্ষ্য।

দিল্লিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিক রিসার্চার্স ফোরামের কৌশলগত সম্পৃক্ততা ও অংশীদারত্ববিষয়ক পরিচালক শ্রীনিবাসন বালাকৃষ্ণন ২০০টি জাহাজের নৌবহর গঠনের লক্ষ্যকে উচ্চাভিলাষী হলেও অর্জনযোগ্য বলে মনে করেন।

তিনি ২০২২ সালে সরবরাহ করা বিমানবাহী রণতরি আইএনএস বিক্রান্ত, দেশীয়ভাবে নির্মিত কালভারি শ্রেণির সাবমেরিন এবং দেশে তৈরি ১০টি ডেস্ট্রয়ারের মতো সাম্প্রতিক সাফল্যের কথা তুলে ধরেন।

বালাকৃষ্ণন বলেন, দেশীয় উৎপাদনের পরিকল্পনা এখন করভেট, ফ্রিগেট ও টহলজাহাজ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধার কারণে দেশীয় উৎপাদন এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রপালশন বা চালিকাশক্তি, সেন্সর ও অস্ত্রব্যবস্থা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ভারতের সম্ভবত ফ্রান্স, রাশিয়া, ইসরাইল ও আমেরিকার মতো বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে বাছাইভিত্তিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রয়োজন হবে।

বালাকৃষ্ণন আরও বলেন, আত্মনির্ভরতা ও সময়মতো জাহাজ সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে জাহাজের মূল কাঠামো নির্মাণ এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার সমন্বয়ের বড় অংশই দেশে সম্পন্ন করা সম্ভব।

আগামী দিনে শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করেন তিনি। এর মাধ্যমে দেশটি সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত, বাণিজ্য সুরক্ষা এবং কার্যকর প্রতিরোধ সক্ষমতা বজায় রাখতে পারবে।

বালাকৃষ্ণন বলেন, লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ ও বাস্তবসম্মত অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভারত এ লক্ষ্য অর্জন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা জোরদার করার জন্য ভালো অবস্থানে রয়েছে।

আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চীনের নৌবাহিনীতে বর্তমানে ৩৭০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে আধুনিক বিমানবাহী রণতরি, ডেস্ট্রয়ার ও সাবমেরিনও রয়েছে।

বালাকৃষ্ণন বলেন, বেইজিংয়ের নৌবহর এখনো সম্প্রসারিত হচ্ছে। চীন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে এবং ভারত মহাসাগরে ভারতের স্বার্থের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।

তিনি বলেন, পাকিস্তান সম্প্রতি চীনের তৈরি অত্যাধুনিক হ্যাঙ্গর শ্রেণির আক্রমণাত্মক সাবমেরিন কেনায় ভারতের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। সর্বোচ্চ ৫০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি চুক্তির আওতায় পাকিস্তানকে এ ধরনের আটটি সাবমেরিন সরবরাহ করার কথা রয়েছে।

সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ