ভবিষ্যতে পাকিস্তানকে আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা করা থেকে বিরত রাখাই এখন ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদ। রাশিয়ার রাজধানী মস্কো সফর শেষে দেশে ফিরে তিনি এ কথা বলেন।
মস্কো থেকে ফেরার পর কাবুল বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মাওলানা ইয়াকুব বলেন, “আপনারা দেখেছেন, কয়েক মাস আগে তারা অর্থাৎ পাকিস্তান আফগানিস্তানের যেকোনো অংশে বোমা হামলা করার সাহস রাখত। আমরা চেষ্টা করছি, যাতে অদূর ভবিষ্যতে তারা আবার এমন করার সাহস না করে।”
চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরামে অংশ নিতে মস্কো পৌঁছান মাওলানা ইয়াকুব। ওই ফোরামে প্রায় ১০০ দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন।
মাওলানা ইয়াকুবের সফর ঘিরে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, তিনি রাশিয়াকে এ ব্যাপারে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তারা ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানকে আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করবে।
সূত্রটির তথ্য অনুযায়ী, বিষয়টি আগেই মস্কোর সঙ্গে আলোচনায় ছিল। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের সময় রাশিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া আশ্বাসের ভিত্তিতে এ বিষয়ে বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে।
সূত্রটি আরও জানায়, দুই দেশের মধ্যে এমন একটি চুক্তি হয়েছে, যাতে আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের পাশাপাশি স্থলবাহিনীর সামরিক সরঞ্জাম এবং ইমারাতে ইসলামিয়ার বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে আফগানিস্তানে ফিরে রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন মাওলানা ইয়াকুব। তিনি বলেন, এটি মূলত আফগানিস্তানের হাতে থাকা রুশ সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত চুক্তি।
মাওলানা ইয়াকুব বলেন, “এটি সামরিক-প্রযুক্তিগত চুক্তি। এসব বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা এর অর্থ বোঝেন। এটি কোনো প্রতিরক্ষা বা নিরাপত্তা চুক্তি নয়, যা নিয়ে কারও উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা। এটি শুধু এবং শুধু আফগানিস্তানের স্বার্থেই হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সামরিক খাতে বেশির ভাগই রুশ প্রযুক্তি। হেলিকপ্টার, সরঞ্জাম ও অস্ত্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেরামত ও উন্নয়নের প্রয়োজন আছে। আমরা এ খাতে সেসব দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য, যাদের নিজস্ব উৎপাদনসুবিধা রয়েছে। একই সঙ্গে আমরা রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করেছি, যাতে এখানে থাকা অস্ত্রগুলো আরও ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারি।”
আফগানিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে পরে আলোচনা হবে যে, আমাদের কী ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকা উচিত এবং তা কোন কোন দেশ থেকে আমদানি করা উচিত। সম্ভবত এ নিয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন হবে।”
আফগানিস্তানে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ইমারাতে ইসলামিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ সময় একাধিক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল রাশিয়া সফর করেছে।
মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ফোরামে অংশ নিতে মাওলানা ইয়াকুব মস্কো পৌঁছানোর সময় ইমারাতে ইসলামিয়ার একটি সূত্র জানায়, এ সফরের প্রস্তুতি আগে থেকেই চলছিল। একটি প্রতিনিধি দল আগেভাগেই মস্কো পাঠানো হয়েছিল।
রুশ নিরাপত্তা পরিষদের উপদেষ্টা সের্গেই শোইগুর সঙ্গে সাক্ষাতে মাওলানা ইয়াকুব বলেন, “রাশিয়া অঞ্চল ও বিশ্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। আমাদের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব রাখে। আমরা চাই, এ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত হোক।”
রাশিয়া সেই অল্প কয়েকটি দেশের একটি, যারা ২০২১ সালে ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান ক্ষমতায় আসা এবং আমেরিকান বাহিনী প্রত্যাহারের পরও কাবুলে নিজেদের দূতাবাস বন্ধ করেনি। এর বাইরে ২০২২ সালে আফগানিস্তানকে তেল, গ্যাস ও গম সরবরাহের জন্য রাশিয়া ইমারাতে ইসলামিয়ার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চুক্তিও করে।
রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো আফগানিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি নিয়ে বহুবার উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে মাওলানা ইয়াকুব এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তার সরকারের পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, তাদের সরকার কাউকেই আফগান ভূখণ্ড অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেবে না। তবে এসব আশ্বাসের পরও সব উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়নি।
রাশিয়া একমাত্র দেশ, যারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
গত বছরের শেষ দিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, আফগানিস্তানের পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইমারাতে ইসলামিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা জরুরি। বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া আফগানিস্তানে কোনো দেশই প্রভাব ফেলতে পারবে না।
রুশ নিরাপত্তা পরিষদের উপদেষ্টা সের্গেই শোইগু বলেছেন, তার দেশ ইমারাতে ইসলামিয়ার সঙ্গে “পূর্ণাঙ্গ অংশীদারত্ব” গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে। একই সঙ্গে অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকেও কাবুলের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে উৎসাহিত করছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর আফগানিস্তানের আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর পরই আঞ্চলিক কোনো দেশের সঙ্গে সামরিক ও কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে এটিই প্রতিরক্ষামন্ত্রী মাওলানা ইয়াকুবের প্রথম চুক্তি।
আফগান তালেবান ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা গত কয়েক মাস ধরেই চলছিল। তবে তা প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নেয় ফেব্রুয়ারিতে ইসলামাবাদের একটি ইমামবারগাহে আত্মঘাতী হামলার পর। ওই হামলায় দুই ডজনের বেশি মানুষ নিহত হয়।
পাকিস্তানের দাবি, নিষিদ্ধ সংগঠন তেহরিকে তালেবান পাকিস্তান দেশটিতে হামলার জন্য আফগান ভূখণ্ড ব্যবহার করছে এবং তারা আফগান তালেবানের সমর্থন পাচ্ছে।
আফগান তালেবান বরাবরই পাকিস্তানের এ দাবি অস্বীকার করে আসছে।
তবে ফেব্রুয়ারিতে ইমামবারগাহে হামলা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর আরও কয়েকটি তৎপরতার পর পাকিস্তান ২৭ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের ২২টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করে।
একই দিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আফগান তালেবানের সঙ্গে সংঘর্ষে নিজেদের ১২ নিরাপত্তা সদস্য নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেন। এরপরের সপ্তাহগুলোতে উভয় পক্ষ একে অপরের ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির দাবি করতে থাকে।
পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানের নাম দেয় ‘গজব লিল হক’। একই সঙ্গে তারা আফগান তালেবানের চৌকি ধ্বংস এবং আফগানিস্তানের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর একাধিক ঘাঁটিতে বিমান হামলার দাবিও করে।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের পক্ষ থেকেও নিয়মিত পাল্টা দাবি সামনে আসে। তালেবান কর্মকর্তারা পাকিস্তানের একাধিক স্থানে ড্রোন হামলা চালানোর দাবিও করতে থাকেন।
মার্চে ঈদুল ফিতরের আগমনের আগে উভয় পক্ষ চলমান অভিযানে “অস্থায়ী বিরতি” ঘোষণা করে। এরপর থেকে বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি।
সূত্র : বিবিসি উর্দু











