কয়েক দশক ধরে যুদ্ধ আফগানিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে এসেছে। তবে এখন দেশটির সামনে আরেকটি লড়াই ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে। সেটি হলো রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং স্থিতিশীলতাকে জনসেবা, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নে রূপান্তরের লড়াই।
গত এক বছরে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ে আফগান সরকার যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তা আফগানিস্তানকে ঘিরে বিশ্বের দীর্ঘদিনের পরিচিত চিত্রের চেয়ে ভিন্ন একটি ছবি তুলে ধরছে। এই ছবিতে যুদ্ধ ও অস্থিরতার কথা নয়; বরং কর্মসংস্থান, লাইসেন্স, অবকাঠামো, ডিজিটাল পরিচয়, টেলিযোগাযোগ ও পৌরসেবার কথা উঠে এসেছে।
ইমারাতে ইসলামিয়ার মুখপাত্র মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ ‘গণমাধ্যমের আয়নায় সরকার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, গত এক বছরে দেশটির বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ৩ লাখের বেশি মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
সংখ্যাটি সরকারি প্রতিবেদনের নিছক একটি পরিসংখ্যান বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা একটি দেশে এর তাৎপর্য সংখ্যার চেয়েও অনেক বেশি। কারণ একটি চাকরি শুধু বেতন নয়; এটি একটি পরিবারের আয়ের উৎস, বাজারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নত ভবিষ্যতের আশা।
প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য তথ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে, অর্থনীতি মন্ত্রণালয় ৮৬টি স্থানীয় ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ভূমিকা রেখেছে।
এখানেই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরকার একা লাখ লাখ নাগরিককে চাকরি দিতে পারে না। তবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানিগুলো কাজ করতে এবং নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে পারে। এর মাধ্যমে পুঁজি কারখানা, প্রকল্প, সেবা ও কর্মসংস্থানে রূপান্তরিত হতে পারে।
একই ধারায় শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৬২ হাজারের বেশি কাজের অনুমতিপত্র বা ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৪৫ হাজারের বেশি মানুষকে কারিগরি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক শ্রমবাজারে শুধু বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থী প্রয়োজন হয় না; বরং প্রয়োজন এমন দক্ষ জনশক্তি, যাদের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা রয়েছে।
পেশাগত প্রশিক্ষণ একজন তরুণকে চাকরিপ্রার্থী থেকে এমন একজন ব্যক্তিতে পরিণত করতে পারে, যিনি নিজের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম। এ কারণেই দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে সক্ষম বিনিয়োগগুলোর একটি।
সরকারি কার্যক্রমের সূচকগুলো শুধু অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় পরিসংখ্যান ও তথ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৪৪৭ হিজরি বছরে ২০ লাখের বেশি ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্র বিতরণ করা হয়েছে। এটি ডিজিটাল পরিচয়-সংশ্লিষ্ট সেবার ধারাবাহিক সম্প্রসারণের প্রতিফলন।
একই সময়ে ৬ লাখ ৫০ হাজারের বেশি সাধারণ পাসপোর্ট এবং ৫১২টি শিক্ষার্থী পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অন্তত ১৬ হাজার বিদেশির ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।
এসব পরিসংখ্যান রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ার আরেকটি দিক তুলে ধরে। আধুনিক রাষ্ট্রকে শুধু তার প্রতিষ্ঠানগুলোর আকার দিয়ে পরিমাপ করা হয় না; বরং নাগরিকদের প্রয়োজনীয় কাজ কত দ্রুত ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন করা যায়, তাদের সরকারি নথিপত্র সরবরাহ করা যায় এবং দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের চলাচল কতটা সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়, সেটিও রাষ্ট্রের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড।
আগামী বছরগুলোতে আফগান অর্থনীতির চেহারা বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে টেলিযোগাযোগ খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত ৩৫০টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ৮৫১ কিলোমিটারের বেশি অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়েছে।
এগুলো শুধু প্রযুক্তিগত পরিসংখ্যান নয়। অপটিক্যাল ফাইবারের প্রতিটি নতুন কিলোমিটার ইন্টারনেটে আরও ভালো প্রবেশাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। আর প্রতিটি নতুন টাওয়ার যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতা আরও বিস্তৃত করে। যোগাযোগের বিস্তার শিক্ষা, বাণিজ্য, গণমাধ্যম, সেবা ও দূরবর্তী কর্মসংস্থানে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে ১ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এভাবেই টেলিযোগাযোগ খাত শুধু প্রযুক্তিগত সেবায় সীমাবদ্ধ না থেকে আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে।
রাজধানী কাবুলে সরকারি কর্মকাণ্ডের অর্জনগুলো ভিন্ন রূপ নিয়েছে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে আরও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হয়েছে। কাবুল পৌরসভা ১৪ হাজার বাণিজ্যিক ইউনিটকে লাইসেন্স দিয়েছে, ৫ লাখ ৩১ হাজার চারা ও ফুলের গাছ রোপণ করেছে এবং ৬ লাখ ২০ হাজার টনের বেশি কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি নালা-নর্দমা পরিষ্কারের কাজও করা হয়েছে।
বড় অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর তুলনায় এসব কাজ হয়তো খুব বড় মনে হবে না। কিন্তু ঘনবসতিপূর্ণ একটি শহরের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিচ্ছন্ন ও সুশৃঙ্খল শহর শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি বাসিন্দাদের জন্য উন্নত পরিবেশ তৈরি করে, ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের জন্য আরও উপযোগী পরিস্থিতি সৃষ্টি করে এবং জনসংখ্যা ও নগরায়ণের প্রবৃদ্ধি ধারণ করার সক্ষমতা বাড়ায়।
তবে এসব পরিসংখ্যানকে ইতিবাচকভাবে দেখার অর্থ এই নয় যে, এতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। প্রকৃত সরকারি সাফল্য শুধু কতটি লাইসেন্স, টাওয়ার, পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং মানুষের জীবনে এসব উদ্যোগের ধারাবাহিক প্রভাব কতটা পড়ছে, সেটিই মূল বিষয়।
পেশাগত প্রশিক্ষণ কি সত্যিই পরিবারগুলোর আয় বাড়াচ্ছে? টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক কি আরও সক্রিয় ডিজিটাল অর্থনীতিতে রূপ নিচ্ছে? সরকারি সেবা কি বছর বছর আরও দ্রুত ও দক্ষ হয়ে উঠছে? এসব প্রশ্নের উত্তরই প্রকাশিত পরিসংখ্যানগুলোর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করবে।
দীর্ঘ বহু বছর ধরে আফগানিস্তানের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল নিরাপত্তা। এখন দেশটির সামনে ভিন্ন একটি চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে। সেটি হলো, কীভাবে স্থিতিশীলতাকে উৎপাদনশীল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জনসেবা এবং ভবিষ্যৎকে সহায়তা করতে সক্ষম অবকাঠামোয় রূপান্তর করা যায়।
সরকারের প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এ পথে অগ্রগতির কিছু সূচক দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ৩ লাখের বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ, লাখ লাখ ইলেকট্রনিক পরিচয়পত্র, কয়েক লাখ পাসপোর্ট, শত শত টেলিযোগাযোগ টাওয়ার, ৮৫১ কিলোমিটারের বেশি অপটিক্যাল ফাইবার এবং প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ইউনিটের জন্য হাজার হাজার লাইসেন্স।
তবে সামনে এখনো দীর্ঘ পথ রয়েছে। প্রকৃত সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলার মধ্যে নিহিত, যা ধারাবাহিকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে; এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মধ্যে, যা দক্ষতার সঙ্গে সেবা দিতে পারে; এবং এমন অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে, যা বিনিয়োগ ও উৎপাদনের সামনে নতুন নতুন দুয়ার খুলে দেয়। বর্তমান আফগান সরকার এ দিকেই গুরুতর পদক্ষেপ নিয়েছে।
নিঃসন্দেহে, আজ আফগানিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হয়তো শুধু দীর্ঘ যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে ওঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্থিতিশীলতাকে উন্নয়নে, উন্নয়নকে সুযোগে এবং সুযোগকে ভবিষ্যতে রূপান্তর করা সম্ভব, সেটি প্রমাণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ।
ঠিক এখান থেকেই শুরু হয় প্রকৃত পরীক্ষা। প্রশ্ন শুধু এক বছরে কী অর্জিত হয়েছে, তা নয়; বরং আগামী বছরগুলোতে আফগানিস্তান কী গড়ে তুলতে পারবে?
সূত্র: হুরিয়াত রেডিও










