খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো একে একে বিদ্রোহ করে বেরিয়ে আসছে বিশ্বের অন্যতম ক্রুসেডশক্তি ফ্রান্সের উপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও তাদের কপালে জুটেছে খাদ্যাভাব, দারিদ্রতা ও অসচ্ছলতা।
বিশ্বকে বাকস্বাধীনতা, সমঅধিকার, মানবাধিকারের সবক শেখানো অন্যতম এ দেশটি ও তাদের সমর্থিত সরকারেরা প্রাকৃতিক প্রাচুর্যে ভরপুর আফ্রিকাতে সীমাহীন শোষণ ও দুর্নীতিতে মত্ত ছিলো।
যে দেশগুলো ইসলামী খেলাফতের আমলে ছিলো উন্নয়নে ভরপুর, সেগুলোই পরবর্তীতে ক্ষুধা ও দারিদ্র সীমার নিম্নবর্তী দেশে পরিণত হয়। তাই গণবিস্ফোরণ বা বিদ্রোহ অবশ্যম্ভাবী ছিলো। বিদ্রোহ সেনাবাহিনী মারফত হলেও তাই প্রতিটি বিদ্রোহে দেখা যাচ্ছে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন। দেখা যায়, রাস্তায় নেমে উল্লাসে মেতে উঠতে।
এরই ধারাবাহিকতায় পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম তেল ও প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ সম্পন্ন দেশ গ্যাবনেও অভ্যুত্থান ঘটে। যেখানে রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যাংগানিজ পদার্থের মজুদ।
বুধবার (৩০ আগস্ট) দেশটির সেনাবাহিনী রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ ও প্রেসিডেন্ট আলি বঙ্গো অন্দিম্বাকে অবরুদ্ধ করে শাসন ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নেয়।
অভ্যুত্থানের কারণ:
আফ্রিকার দেশ গ্যাবনের সাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট আলি বঙ্গো অন্দিম্বাকে পুনরায় জয়ী ঘোষণার করা হলে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি আলি বঙ্গোকেও অবরুদ্ধ করে তারা। ঘোষণা দেওয়া হয় শাসন ক্ষমতা পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার।
কারণ স্বরূপ সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, ৫৬ বছর যাবত আলি বঙ্গোর পরিবার দেশের শাসন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছে। এই নির্বাচনের ফলাফল আমরা মানি না।
যার নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের মুখোমুখি হলো গ্যাবন:
গ্যাবনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক আলি বঙ্গো অন্দিম্বাকে ৩য় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে জয়ী ঘোষণার পরপরই বিদ্রোহ ঘোষণা করে দেশটির সেনাবাহিনী। এতে নেতৃত্বে দেন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ইউনিট গ্যাবানিজ রিপাবলিক গার্ডের প্রধান ব্রাইস ওলিগুই এনগুয়েমা। তার নেতৃত্বেই দেশটির ক্ষমতা দখল করে গ্যাবনের সেনাবাহিনী।
সম্মিলিত নাকি একক নেতৃত্বের সরকার?
গ্যাবন সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা ক্ষমতা দখলের ঘোষণার পর ফ্রান্সের সংবাদমাধ্যম ‘লা মন্ডের’ মুখোমুখি হোন। আলি বঙ্গো ও তার পরিবারকে যেহেতু তারা ক্ষমতায় দেখতে চান না তবে ‘কে হবেন দেশের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট’ এবং ‘তাদের পরিকল্পনাই বা কি’ এমন প্রশ্নের জবাবে অভ্যুত্থানের নেতারা জানান, এবিষয়ে শীঘ্রই আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন তারা। আলোচনা শেষে জানিয়ে দেওয়া হবে কে হবেন গ্যাবনের নতুন প্রেসিডেন্ট।
এসময় অভ্যুত্থান নেতা এনগুয়েমা প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন কি না এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবী করতে অস্বীকার করেন। সম্মিলিত সরকারের বিষয়টিও নাকচ করে দেন। বলেন, সকল জেনারেলদের আলোচনায় অংশগ্রহণের আহবান জানানো হয়েছে। আলোচনায় প্রত্যেকেই তাদের মতামত তুলে ধরবেন যে সম্মিলিত নাকি একক কোনটি পদ্ধতি উত্তম হতে পারে। একক হলে কার কাঁধে তুলে দেওয়া হবে দেশের শাসন ক্ষমতা।
আলি বঙ্গের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত:
আলি বঙ্গোর ব্যাপারে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে, গ্যাবানিজ রিপাবলিক গার্ডের প্রধান এনগুয়েমা লা মন্ডে পত্রিকাকে জানান, তিনি এখন দেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট। অন্যান্যদের মতো তিনিও একজন সাধারণ পশ্চিম আফ্রিকান গ্যাবানিজ। তবে তাকে তার ঘরে নজরবন্দী করে রাখা হবে। সাধারণ নাগরিক হিসেবে তার যেসব অধিকার প্রাপ্য সে সব অধিকার ও সব রকমের সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন তিনি।
আলি বঙ্গোর ক্ষমতাচ্যুতিতে রাস্তায় নেমে উচ্ছাস:
আল জাজিরার প্রতিনিধি ক্যাথরিন সোই নাইরোবি থেকে জানান যে, আলি বঙ্গোকে অবরুদ্ধ করে দেশের শাসন ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ায় জনগণ রাস্তায় নেমে উচ্ছাস প্রকাশ করছেন। রাজধানী লিব্রেভিলা সহ অন্যান্য জায়গাতেও রাস্তায় নেমে উচ্ছাস প্রকাশ করছে জনগণ।
স্থানীয় কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা মনে করেন, গ্যাবনের অসচ্ছলতা ও অর্থনৈতিক দূরাবস্থার জন্য ফ্রান্স প্রীতি ও আলি বঙ্গোর পরিবারের দুর্নীতিই একমাত্র দায়ী। তাই আলি বঙ্গোর ক্ষমতাচ্যুতিতে তারা আনন্দিত।
ফ্রেঞ্চ অয়েল ও মাইনিং জায়ান্ট:
গ্যাবনের সর্বোচ্চ তেল উত্তোলক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রেঞ্চ অয়েল জায়ান্ট টোটাল এনার্জিরস জানিয়েছে এখন পর্যন্ত তাদের কেন্দ্রগুলোতে কোনো ধরণের হামলা হয়নি। ৩৫০ জন কর্মীর মাধ্যমে ৪৫ টি কেন্দ্র থেকে তেল সরবরাহ করে থাকে গ্যাবনের শীর্ষ স্তরের এই কোম্পানিটি। কর্মী ও কেন্দ্রগুলো রক্ষায় উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানায় তারা।
গ্যাবন ত্যাগ করতে হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তারা তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর দিতে রাজি হয়নি।
অপরদিকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যাংগানিজ পদার্থের খনি যা গ্যাবনে অবস্থিত তা থেকে খনি উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান এরামেট জানায়, তারা সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলের সাথে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। কর্মকর্তা- কর্মচারীদের যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে। তেল ও প্রাকৃতিক খনি সমৃদ্ধ দেশটিতে তাদের ৮ হাজার কর্মী রয়েছে। লোহা ও ব্যাটারি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ম্যাংগানিজের সবচেয়ে বড় যোগান এই খনি থেকেই আসে।
ফ্রান্সের নিন্দা:
নির্বাচিত সরকারকে অবরুদ্ধ করে ক্ষমতা দখল করায় ফ্রান্স সর্বপ্রথম প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফ্রান্সের মুখপাত্র অলিভিয়ের ভারান ফ্রেঞ্চ সরকারের পক্ষ থেকে নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেন, সকলকে অবশ্যই নির্বাচনের ফলাফলের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। একে মেনে নিতে হবে।
ফ্রেঞ্চ প্রধানমন্ত্রী এলিজাবেথ বর্ন বলেন, গ্যাবন পরিস্থিতি খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ফ্রান্স।
এছাড়া পূর্বের রীতি অনুযায়ী রাজধানী লিব্রেভিলাতে এখনো ৩৭০ জন সেনা মোতায়েন রয়েছে বলেও জানানো হয়।
চীনের উদ্বেগ প্রকাশ:
গ্যাবনে অভ্যুত্থানের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মুখপাত্র ওয়াং ওয়েনবিন এক বিবৃতিতে বলেন, আমরা গ্যাবনের সব পক্ষকে দেশ ও জনগণের মৌলিক স্বার্থকে সবকিছুর উর্ধ্বে রেখে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মতপার্থক্য নিরসনের এবং যতদ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছি।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন :
আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ দল আফ্রিপলিটিকার বিশেষজ্ঞ ওভিগওয়ে এগুয়েগু বলেন, গ্যাবনে অভ্যুত্থানের ঘটনাটি আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোর অভ্যুত্থানের ন্যায় নয়। গ্যাবনে অভ্যুত্থান আকস্মিক ছিলো না। বরং অনেকটা অনুমেয়ই ছিলো। পেছনের ঘটনাগুলো তাই বলে। ২০১৬ সালের নির্বাচনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে আলি বঙ্গো তখনও কারচুপির মাধ্যমে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন, যা দেশটির জনগণ প্রত্যাখ্যান করেছিলো। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় বিক্ষোভ করেছিলো। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টার ঘটনা ঘটেছিলো। কারণ দেশটির সেনারা এ জন্য নির্বাচনে দুর্নীতি ও অনিয়মকে সামনে নিয়ে এসেছিলো। বলেছিলো, জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন স্বরূপ প্রতিনিধি হোননি আলি বঙ্গো।
আজ যা ঘটেছে ভালোভাবে লক্ষ্য করলে তাতে একই প্যাটার্ন দেখা যাবে। তাই বলা যায়, পশ্চিম আফ্রিকার অন্যান্য দেশগুলোর অভ্যুত্থানে যতটা না নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ইস্যু জড়িত গ্যাবনে নির্বাচনী প্রক্রিয়া তার চেয়ে আরো বেশি জড়িত।
এছাড়া আফ্রিকার ঝুঁকি ও পরিত্রাণ বিষয়ক পরামর্শদাতা সংস্থার নির্বাহী পরিচালিকা তারা ও’কনরও প্রায় একই কথা বলেন। তার বক্তব্য মতে, বংশগত ও রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ক্ষমতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে চায়ছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো। গ্যাবন এর সর্বশেষ উদাহরণ। দেশটি আগে আলি বঙ্গোর বাবার শাসনাধীন ছিলো। এখন তারা গণতন্ত্রের দিকে ঝুঁকছে।
অপরদিকে ফ্রান্স পূর্বেকার সময়গুলোতে আফ্রিকায় সেনা প্রেরণের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করলেও সম্প্রতি উপনিবেশিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন এনেছে। আফ্রিকার সম্মিলিত জোট আফ্রিকা ইউনিয়ন ও প্রভাবশালী অর্থনৈতিক সংগঠন ইকোওয়াস কিংবা স্থানীয় কোনো দলের আহবানেই শুধু আফ্রিকায় সেনা হস্তক্ষেপ করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তাই বলা যায় বুরকিনা ফাসো, নাইজার, মালি ও গ্যাবনের মতো দেশগুলোর সাথে ফ্রান্সের দেখার মতো কিছু হতে যাচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা











