জানুয়ারি ১৭, ২০১৭

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আলেমদের ভূমিকা রাখার সুযোগ দিতে হবে: আল্লামা শফী

ইনসাফ টোয়েন্টিফোর ডটকম |

শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (1)বিদেশী, অমুসলিম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের টার্গেট করে দেশে সম্প্রতি ইসলামের নাম ব্যবহার করে গুলশান, শোলাকিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা ও নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনাকে দেশ এবং মুসলিম জাতিসত্তার জন্যে ভয়াবহ অশনি সংকেত উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার মহাপরিচালক দেশের শীর্ষ আলেম হেফাজত আমীর শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী।

তিনি বলেন, বেছে বেছে বিদেশি, অমুসলিম ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের হত্যা করা, হত্যার হুমকি দেওয়া, মসজিদ, মন্দির ও গীর্জায় হামলা প্রচেষ্টা চরম উদ্বেগজনক। সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের পেছনে ইন্ধনদাতাদেরকে চিহ্নিত করা বা খুঁজে বের করা সবচেয়ে জরুরী।

তিনি বলেন, শক্তিশালী কোন পক্ষের ইন্ধন ছাড়া বিচ্ছিন্ন ঘুটিকয়েক অপরাধীর পক্ষে এমন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা অসম্ভব।

বৃহস্পতিবার সংবাদপত্রে প্রেরিত হেফাজত আমীরের প্রেসসচিব মাওলানা মুনির আহমদ স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে আল্লামা শাহ আহমদ শফী উপরোক্ত উদ্বেগের কথা জানান।

বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও জাতীয় ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত ও ধ্বংস করার জন্যে বিভিন্ন অপশক্তি গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা এদেশ থেকে ইসলামকে উচ্ছেদ করে আধিপত্য ও শোষণের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই কাজে তারা কলেজ-ইউনিভার্সিটির উচ্চ শিক্ষিত ছাত্রসহ সরলমনা কিছু মুসলিম যুবককে আদর্শিকভাবে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যায় প্রভাবিত করে ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। দেশ ও মুসলিম জাতিসত্ত্বা বিরোধী এই ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি এ ব্যাপারে দেশের আলেম সমাজ, ইসলামী নেতৃবৃন্দ, মসজিদের ইমাম ও খতীবকে ইসলামের সঠিক জ্ঞান ও শিক্ষার প্রচার-প্রসারে আরো জোরালো ভূমিকা রাখার আহবান জানান। তিনি বলেন, কোন মদ্যপানকারী আল্লাহু আকবার বলে মদ পান করলে যেমন কেউ সেটাকে ইসলামী মদ বলবে না, তেমনি কোন সন্ত্রাসী আল্লাহু আকবার বা ইসলামের নাম নিয়ে মানুষ হত্যার মতো জঘন্য কাজ করলে সেটাকে ইসলামের জিহাদ ভাবার অবকাশ নেই।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন, সৎ ও সরল চিন্তার প্রতিটি মানুষই কোন না কোনভাবে ধর্মের প্রতি দুর্বল থাকে। কারণ, ধর্ম মানুষকে সৎ ও আদর্শবান হতে সাহায্য করে। আর দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ধর্মীয় শিক্ষার অনুপস্থিতির কারণে সাধারণ শিক্ষিত বিশাল ছাত্রসমাজ পরিপূর্ণ সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান থেকে দূরে থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের শত্রুরা এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে। তারা সাধারণ শিক্ষিত তরুণদেরকে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্ত ও বিপথগামি করতে এ কারণে সক্ষম হচ্ছে। তিনি বলেন, ধর্মহীন শিক্ষানীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নামে নাস্তিক্যবাদ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা জাতির জন্যে সন্ত্রাস ও কথিত জঙ্গীবাদের বিপর্যয় ডেকে আনছে।

উলামায়ে কেরাম, ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও মসজিদের ইমাম-খতীবগণকে উদ্দেশ্য করে হেফাজত আমীর বলেন, দেশকে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যে আপনাদেরকে আরো বেশী ভূমিকা পালন করতে হবে। মানুষের দ্বারে দ্বারে শান্তির ধর্ম ইসলামের সঠিক শিক্ষা পৌঁছে দিতে হবে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও ইউনিভর্সিটি ক্যাম্পাসসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সভা-সেমিনার করা যেতে পারে। এসব সভা-সেমিনারে ইসলামের সার্বিক বিধি-বিধান তুলে ধরতে হবে। সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, কাউকে বিনা কারণে হত্যা ও সমাজে ভীতি তৈরীর নাম কখনোই জিহাদ নয়, বরং ইসলামের জিহাদ হচ্ছে অন্যায় আগ্রাসন ও সন্ত্রাস-নৈরাজ্য দমনের জন্যে। জিহাদের এই প্রকৃত ব্যাখ্যা তাদের সামনে সুন্দরভাবে তুলে ধরতে হবে। এ পর্যায়ে হেফাজত আমীর সরকার ও প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দেশ থেকে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকে নির্মূল করতে আপনারা যদি প্রকতৃই আন্তরিক হন, তবে মসজিদের ইমাম-খতীব ও মাহফিলসমূহ নজরদারি করার কথা বলে ভীতি তৈরী ও ধর্মীয় কর্মকান্ড সংকোচিত করার পরিবর্তে বরং আলেমদেরকে স্বাচ্ছন্দে কাজ করতে সহযোগিতা করুন। কারণ, সমাজের মানুষের মধ্যে সৎভাবে জীবন যাপনের যে মানসিকতা ভেতর থেকে কাজ করে, সেটা এই ইমাম ও খতীবরাই তৈরী করে থাকেন, আপনাদের বাহিনী ও আইন নয়।

তিনি বলেন, মসজিদে খতীবগণকে নজরদারির কথা বলার মানেই হচ্ছে, সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ডের দায় ইসলামের উপর চাপানোর চেষ্টা। বাংলাদেশের উপর এখন সারা বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ। খতীব নজরদারির সংবাদে বিশ্ববাসীর কাছে এমন বার্তা যাবে যে, বাংলাদেশের লাখ লাখ মসজিদের খতীব জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণের কাজে জড়িত। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ধরা পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর নজরদারির কথা বলা হচ্ছে মসজিদের খতীব ও ওয়াজ মাহফিল। প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে সন্ত্রাস দমনে সরকারের প্রকৃত সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

হেফাজত আমীর বলেন, মাদ্রাসাসমূহে শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের শিক্ষা দেওয়া হয় না। বরং খোদাভীতি ও পরকালীন কঠোর শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন, দেশপ্রেম এবং আদর্শ ও নৈতিকতার প্রতি উদ্বুদ্ধকরণের শিক্ষা দেওয়া হয়। যে কারণে বিগত কয়েক শত বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, কোন ক্বওমি মাদ্রাসায় ছাত্র সংঘর্ষ, খুন-খারাবি ও ছাত্র-শিক্ষককে নিয়ে কোন বিশৃঙ্খলা বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা ঘটে না। দেশে সংঘটিত অপরাধসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, উলামা-মাশায়েখ ও মাদ্রাসা ছাত্রদের মধ্যে চুরি-ডাকাতি, খুন-খারাবিসহ অপরাধের মাত্রা দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া প্রায় নেই বললেই চলে। দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে যে মাত্রার অপরাধের ঘটনা প্রত্যক্ষ করা যায়, তা মাদ্রাসায় সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

তিনি বলেন, এই যে সম্প্রতি ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে বেশ কিছু বিদেশী অমুসলিম ব্যক্তিত্বকে হত্যার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হলো, ইসলামে এর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী এসেছে। যেমন, অমুসলিমদের অধিকার ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আমরা মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে পড়িয়ে থাকি, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “মনে রেখ, যদি কোনো মুসলমান কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর আদালতে তার বিরুদ্ধে অমুসলিম নাগরিকের পক্ষে মামলা দায়ের করব”। (আবু দাউদ শরিফ, হাদিস নং- ৩০৫২)।
হেফাজত আমীর সন্ত্রাস, নৈরাজ্য ও কথিত জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে উলামায়ে কেরামকে আরো বেশী ভূমিকা রাখতে সহযোগিতা করার জন্যে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, উলামায়ে কেরামকে হুমকি-ধমকি ও হয়রানি করা বন্ধ করে বরং তাঁদেরকে উদ্বুদ্ধ করুন। স্কুল, কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করুন। তাহলে ষড়যন্ত্রকারীরা এসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদেরকে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা শিখিয়ে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। কথায় কথায় উলামা-মাশায়েখ ও তৌহিদী জনতাকে কটাক্ষ ও হেয় করা, তাদের কাজে অন্যায় বাধা তৈরী করা, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ এবং আল্লাহ-রাসূল ও ইসলামের বিরুদ্ধে কটূক্তির চর্চা কঠোরভাবে বন্ধ করুন। কারণ, এতে মানুষের ভেতরে ক্রোধ তৈরী করে। আর এ ধরণের ক্রোধকে আগ্রাসী শক্তি ও আধিপত্যবাদি দেশবিরোধীরা ব্যবহার করতে চাইতে পারে। সর্বোপরি দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন, মানুষের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিন এবং শুধু বিত্তশালী ও প্রভাশালী নয়, বরং দেশের গণমানুষের উন্নয়নের জন্যে কাজ করুন। আর যে কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও হুমকির ঘটনায় তদন্তের আগেই দোষারোপের রাজনীতি বন্ধ করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী ও মদদদাতাদের চিহ্নিত ও পাকড়াও করে বিচার আওতায় আনতে সাহায্য করুন। একলা চলো নীতি পরিহার করে দ্রুত সংলাপ শুরুর মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনুন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, রাজনৈতিক বিবাদ ও অসন্তোষ জিইয়ে রেখে দেশে স্থিতিশীলতা কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে? ক্ষমতাসীন দলেরই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যে উদ্যোগ নেওয়ার দায়-দায়িত্ব সর্বাধিক।