spot_img

রাষ্ট্র সংস্কারে ১৯ দফা ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন

রাষ্ট্র সংস্কারে ১৯ দফা  ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। আজ সোমবার (২ জানুয়ারি) রাজধানীর সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে দলটির জাতীয় সম্মেলন থেকে ১৯ দফা ঘোষণা করা হয়।

ঘোষিত ১৯ দফা-

১ :জনমতের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্রের সংস্কার- বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র তথা সংবিধানকে যথেচ্ছা সংশোধন করে জনঅধিকার খর্ব করার ঢাল বানানো হয়েছে। বর্তমান সংবিধান নিয়ে দেশের কোন পক্ষই সন্তুষ্ট নয়। বিরোধীরা এটাকে সংস্কার করতে চাইছে। সরকার পক্ষও বাহাত্তুরের সংবিধানে ফেরত যাওয়ার কথা বলে বর্তমান সংবিধানের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে। সবচেয়ে দু:খজনক বাস্তবতা হলো, এই সংবিধান রচনায় জনমতের তোয়াক্কা করা হয় নাই। পাকিস্তান আমলের “পার্লামেন্ট মেম্বার” দের দিয়ে এই সংবিধান পাশ করানো হয়েছে। এই সংবিধান প্রণয়নে গণভোটও হয়নি। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও চলমান গণঅসন্তোষ বিবেচনায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এ ভূখণ্ডের মানুষের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য বোধ, বিশ্বাস ও মনস্তত্ত্ব আমলে নিয়ে এবং গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সমর্থনের ভিত্তিতে সংবিধানের সামগ্রিক সংশোধনের প্রস্তাব করছে। প্রস্তাব

২ :জনপ্রশাসনের সংস্কার- বাংলাদেশ স্বাধীন হল ৫২ বছর হতে যাচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হল, আমাদের জনপ্রশাসন আজও উপনিবেশিক কাঠামো, চরিত্র ও কর্মধারার উত্তরাধিকার বহন করে চলছে। প্রশাসনকে দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে “জনতার সেবক দর্শন” এ খোলাফায়ে রাশেদার আদর্শে গড়ে তোলা হবে। প্রস্তাব

৩ : রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পাওয়াকে ক্ষমতায় যাওয়া বলে জ্ঞান করাটাই একটি দর্শনগত অন্যায়। ইসলামের নির্দেশনা অনুসারে দেশ পরিচালনার সুযোগকে আমরা Power Relation এ ব্যাখ্যা না করে তত্বাবধান ও খেদমত এর ধারণায় ব্যাখ্যা করি। যেখানে ক্ষমতার চর্চা নয় বরং প্রতিপালনের নীতিতে দেশ পরিচালিত হয়। সেজন্য বিদ্যমান ক্ষমতার চর্চা ও ধারণাকে ভাঙতে Separation Of Power নীতির প্রয়োগ করে শাসন বিভাগ, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও ন্যায়পাল বিভাগকে পরস্পর থেকে স্বাধীন ও স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা হবে।

৪ : অর্থখাত, অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কৃষি ও জ্বালানি খাতে বিদ্যমান সকল দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করতে, খাতগুলোকে শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক করতে এবং স্বনির্ভর এনার্জি সেক্টর নির্মাণে জাতীয় কাউন্সিল গঠন করা হবে।

৫ : উৎপাদক কৃষক ও ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনা তথা পণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণসহ পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনে এনে নিত্যপণ্যের মূল্য স্থিতিশীল করা হবে।

৬ : আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা। বহিঃ বাণিজ্য ও দেশীয় সংস্কৃতির প্রসার ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ রক্ষায় বৈদেশিক মিশনগুলোকে আরো শক্তিশালী করা হবে। দেশের মাটি ব্যবহার করে কারো কোনো ক্ষতি করতে দেওয়া হবে না।

৭ : দেশের শিল্পখাত ও মজুরিখাতকে বিশ্লেষণ করে এবং চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে সামনে রেখে সর্বাধুনিকশিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হবে। এবং নৈতিকতা ও সততা নিশ্চিতকরণে শিক্ষার সর্বস্তরে ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হবে।

৮ : দেশের স্বাস্থ্য খাত ভঙ্গুর ও দুর্নীতিগ্রস্ত। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে উন্নত স্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তোলা, জেলা স্তরে আধুনিক চিকিৎসা উপকরণসহ উন্নত হাসপাতাল নির্মাণ, সকলের জন্য সুলভে চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা, রোগের উৎস নিয়ন্ত্রণ, রোগ গবেষণাসহ সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অধীনে আনা হবে।

৯ : নারী নির্যাতন, ধর্ষন বন্ধ এবং নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারীর স্বাধীনতা রক্ষায় ইসলামের সুমহান আদর্শের আলোকে বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য উদ্ভুত নীতির অধীনে নারীর অবস্থান ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করা হবে।

১০ : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কার্যকর সংসদ, ৭০ অনুচ্ছেদ এর সংশোধন, নির্বাহী ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার সকল পদক্ষেপ গ্রহন করবে এবং এধরণের সকল উদ্যোগে সমর্থন করে।

১১ : Proportional Representation Electoral  তথা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি রাষ্ট্র পরিচালনায় জনমতের শতভাগ প্রতিফলিত করার একটি চমৎকার পদ্ধতি। বিদ্যমান পদ্ধতিতে কোন কোন ক্ষেত্রে ৬০-৭০% ভোটারের মতামতও উপেক্ষিত হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ চৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হধষ জবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ ঊষবপঃড়ৎধষ ঝুংঃবসএর প্রস্তাব করেছে। যার মাধ্যমে ১ শতাংশ মানুষের মতামতও রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিফলিত হবে।

১২ : ক্ষমতার পালাবদলের সময় দেশে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়। ক্ষমতাসীন দল ক্ষমতায় থাকার জন্য আর বিরোধীদল যে কোন মূল্যে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য হেন কোন কাজ নাই যা করে না। মানুষ হত্যা, বিদেশিদের কাছে ধর্ণা দেয়া, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে ভোট ডাকাতির মতো ঘৃণ্য কাজও তারা করে। ফলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনে করে কোন দলীয় সরকারের অধিনে সুষ্ঠু নির্বাচন বর্তমান বাস্তবতায় সম্ভব নয়। সেজন্য ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নির্বাচনকালীন জাতীয় সরকারের প্রস্তাব করছে ।

১৩ : বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অতিমাত্রায় প্রতিহিংসাপরায়ন ও পরস্পর যুদ্ধাংদেহি। এই অসুস্থ্য সংস্কৃতির কারণে দেশের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, স্বার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমরা সকল দলের সমন্বয়ে একটি জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব করছি।

১৪ : বেকারত্ব দেশের জন্য অভিশাপ হয়ে দাড়িয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে পরিকল্পনাহীনতা ও শিল্পখাতের সাথে সমন্বয়হীনতার কারণে যে যত শিক্ষিত হচ্ছে তার বেকার থাকার সম্ভবনা তত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থার দীর্ঘ মেয়াদী সমাধানকল্পে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করা হবে। এবং আশু সমাধানকল্পে বেকারভাতা প্রদান, বিমামূল্যে জব রিলেটেড ট্রেইনিং এর আয়োজন করা হবে।

১৫ : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ; বাংলাদেশে সকল নাগরিকের অধিকার সমানভাবে সংরক্ষণ করার অঙ্গিকার পূনর্ব্যক্ত করছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু হোক বা নৃগোষ্ঠিগত সংখ্যালঘু হোক; প্রত্যেকের ধর্মীয়, নাগরিক, ভাষাগত অধিকার রক্ষা করা হবে। বিশেষত নৃগোষ্ঠিগত সংখ্যালঘুরা যাতে তাদের নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা হবে।

১৬ : দেশে প্রতি বছর কোটিপতির সংখ্যা বাড়ছে আবার একই সাথে খাবারের জন্য টিসিবির ট্রাকের পেছনে ব্যাকুল হয়ে দৌড়ানো ক্ষুধাতুর মানুষের সংখ্যাও হুহু করে বাড়ছে। বৈষম্য কত প্রকট হচ্ছে তা বুঝতে আর কোন পরিসংখ্যানের প্রয়োজন হয় না। চোখখুলে তাকালেই দেখা যায়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সকল বৈষম্য অবসানের প্রতিজ্ঞা করছে। জাতীয় আয়ের সুষম বন্টন নিশ্চিত করতে জাকাত আদায় বাধ্যতামূলক করা, কর ব্যবস্থার সংস্কার ও আর্থিকখাতের দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। এবং প্রমানিত দুর্নীতিবাজদের নির্বাচনসহ রাষ্ট্রের যে কোন দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে।

১৭ : মানুষের তীব্র দরিদ্র্যতা নিরসনে ও প্রান্তিক অভাবী জনতার কষ্ট নিবারণে সামজিক নিরাপত্তাবলয়ের পরিধি বৃদ্ধি করা হবে। এইখাতে বিদ্যমান দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। সকল মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে গ্রহণ করতে হবে।

১৮ : বিচার বিভাগের সংস্কার অতিব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। দেশের কারাগারগুলোতে হাজারো মানুষ বছরের পর বছর বিনা বিচারে হাজত খাটছে। এটা কোন সভ্যসমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। সেজন্য বিনাবিচারে আটক নাগরিকদের মুক্তির লক্ষে এবং বিচার বিভাগের সামগ্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে একটি কমিশন গঠন করা হবে।

১৯ : বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে প্রবাসীদের আয় গুরুত্বপূর্ণ। অথচ প্রবাসীদের সন্মান ও স্বার্থ রক্ষায় এক ধরণের উদাসিনতা লক্ষণীয়। প্রবাসীদের মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষায় শক্তিশালী ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ