spot_img
spot_img

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে চায় তুরস্ক

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধান নিশ্চিত করতে প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে তুরস্ক। একই সঙ্গে সংকটটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এজেন্ডায় ধরে রাখতেও জোরালো চেষ্টা চালাচ্ছে দেশটি।

শুক্রবার (৫ জুন) ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান।

তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা ইস্যুর স্থায়ী ও ন্যায়সঙ্গত সমাধানের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিবেশী দেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সংহতি ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করছি। তুরস্কও এই সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এজেন্ডায় ধরে রাখতে জোরালো প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।”

নির্যাতিত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসা করেন ফিদান। বাংলাদেশের এই ভূমিকাকে তিনি গোটা মানবতার পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক মানবিক ত্যাগ হিসেবে বর্ণনা করেন।

ফিদান বলেন, “রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে ট্র্যাজেডি নেমে এসেছে, তা দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও অব্যাহত রয়েছে। আমি আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে গোটা মানবতার পক্ষ থেকে এক ঐতিহাসিক ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।”

তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তিনি কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করবেন। একই সঙ্গে তুর্কি প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালিত মানবিক কার্যক্রমও পর্যালোচনা করবেন। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা, টিকা; দুর্যোগ ও জরুরি ব্যবস্থাপনা প্রেসিডেন্সি, আফাদ; তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট এবং দেশটির ধর্মবিষয়ক অধিদপ্তরের অধীন তুর্কি দিয়ানেত ফাউন্ডেশন।

তিনি আরও জানান, ওই অঞ্চলে একটি তুর্কি ফিল্ড হাসপাতাল পরিদর্শনেরও পরিকল্পনা রয়েছে তার।

ফিদান বলেন, “রোহিঙ্গাদের অবস্থার উন্নয়নে আমাদের মানবিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবর্তনেও আমরা সহায়তা অব্যাহত রাখব।”

এ বক্তব্যে তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের কথা উল্লেখ করেন। ২০১৭ সাল থেকে নির্যাতন ও সহিংসতার মুখে সেখান থেকে রোহিঙ্গারা পালিয়ে আসতে শুরু করে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান ফিদান। রহমানের নির্বাচন এবং জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিজয়কে তিনি দেশটির ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক মর্যাদার প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, এই ফলাফল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি থাকা সম্মানকেই প্রমাণ করে।

ফিদান বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশ নতুন এক যুগে প্রবেশ করেছে। তুরস্ক এই প্রক্রিয়ার দৃঢ় সমর্থক ছিল বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে নিবিড় কূটনৈতিক যোগাযোগ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গভীর করছে এবং সহযোগিতার নতুন নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে সহায়তা করছে।

ফিদান বলেন, “আমরা বিস্তৃত পরিসরে আমাদের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব আরও গভীর করা এবং দৃঢ় ভিত্তির ওপর এটিকে আরও শক্তিশালী ও দূরদর্শী পর্যায়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।”

দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার বিষয়েও আলোচনা করেন। ফিদান জানান, সাংস্কৃতিক সম্পদ সুরক্ষায় সহযোগিতা বিষয়ে বাংলাদেশের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে তিনি একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন।

তিনি বলেন, “মানবতার অভিন্ন ঐতিহ্য রক্ষায় আমাদের অঙ্গীকারের প্রতিফলন ঘটানো এই নথি আমাদের দেশগুলোর জন্য কল্যাণকর হবে বলে আমি আশা করি।”

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়েও কথা বলেন তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মৌলিক অগ্রাধিকার। আঞ্চলিক সংঘাতগুলো ক্রমেই বৈশ্বিক গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করছে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার প্রসঙ্গে ফিদান বলেন, ইরানের ওপর আমেরিকা-ইসরাইলের হামলা শুধু অঞ্চল নয়, বৃহত্তর বিশ্বকেও প্রভাবিত করেছে।

তিনি বলেন, “ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার আলোচনায় যে অগ্রগতি হয়েছে, আমরা তাকে স্বাগত জানাই। আমরা আশা করি, এসব আলোচনা বাস্তব ফল দেবে এবং স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করবে।”

ফিদান জোর দিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং পরিস্থিতিকে যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী করতে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেন তিনি। ফিদান বলেন, তুরস্ক এসব উদ্যোগে সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

কূটনৈতিক যোগাযোগে অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করলেও মাঝেমধ্যে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন ফিদান।

তিনি বলেন, “পক্ষগুলোকে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে হবে, যা কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে বিপন্ন করতে পারে। যুদ্ধ শেষ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও অভিন্ন ইচ্ছাশক্তি দেখাতে হবে। বিশেষ করে যুদ্ধবিরতি নস্যাৎ করতে ইসরাইলের প্রচেষ্টা ঠেকাতে হবে।”

ফিলিস্তিনে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে বাধা দেওয়া এবং পুরো অঞ্চলে সংঘাত বাড়ানোর জন্য ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারকে অভিযুক্ত করেন ফিদান।

তিনি বলেন, “ইসরাইল গাজায় তার গণহত্যা অব্যাহত রেখেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে লক্ষ্য করে প্রতিদিন নতুন নতুন বেআইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ইসরাইলের আগ্রাসন বন্ধ করা এবং অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা দূর করা।”

লেবাননে ইসরাইলের দখলদারিত্ব ও হামলা বন্ধের আহ্বানও জানান ফিদান। পাশাপাশি শান্ত পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার গুরুত্বের ওপর জোর দেন তিনি।

ফিদান বলেন, তুরস্ক ও বাংলাদেশ নতুন নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করতে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা, শান্তি ও সমৃদ্ধি আরও মজবুত করতে কাজ করবে।

অন্যদিকে খলিলুর রহমান তুরস্ককে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের সফল প্রার্থিতায় আঙ্কারার সমর্থনের জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান। ঢাকা এই সমর্থন ভুলবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রহমান বলেন, ফিদানের সঙ্গে তার আলোচনা দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের প্রতিফলন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে এই আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, দুই পক্ষই একাধিক খাতে সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব আরও সম্প্রসারণ করতে চায়। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে থাকা সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগাতে তুর্কি বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বহুপাক্ষিক সহযোগিতার গুরুত্বের ওপর জোর দেন রহমান। বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর জন্যও তুরস্ককে ধন্যবাদ জানান তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে রহমান বলেন, এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দেওয়া ভাষণে তিনি রোহিঙ্গাদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে বিষয়টি আন্তর্জাতিক নজরে রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছেন।

সংকট মোকাবিলায় তুরস্কের দীর্ঘদিনের ভূমিকার প্রশংসা করেন রহমান। তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুতির জরুরি পরিস্থিতি শুরুর পর থেকেই আঙ্কারা মানবিক সহায়তা ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাংলাদেশকে সহায়তা করে আসছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তুরস্ক পরিচালিত হাসপাতালের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে সংকটের সমাধান খুঁজে বের করার লক্ষ্যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় তুরস্কের অব্যাহত সম্পৃক্ততাকে স্বাগত জানান রহমান।

সূত্র: আনাদোলু

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ