spot_img
spot_img

পাকিস্তানি হামলায় বিপর্যস্ত আফগানিস্তান

গত দুই বছরে আফগানিস্তানের কয়েকটি প্রদেশে পাকিস্তানি সামরিক শাসনের চালানো বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। সর্বশেষ মানবাধিকার প্রতিবেদনগুলোতে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এ বিপর্যয়ের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

হাজারও মানুষ হতাহত এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। পাশাপাশি ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হয়েছে ঘরবাড়ি ও বেসামরিক স্থাপনা। এই মানবিক বিপর্যয়ের ভারী ছায়া এখনো হাজারো আফগান পরিবারের জীবনের ওপর পড়ে আছে।

মানবাধিকার সংস্থা রাওয়াদার’ তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত খোস্ত, পাকতিয়া, পাকতিকা, নানগারহার, কুনার, কাবুল, নুরিস্তান, কান্দাহার ও হেলমান্দ প্রদেশে চালানো হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১ হাজার ১৮৭ বেসামরিক মানুষ আহত ও নিহত হয়েছেন।

ভুক্তভোগী, বেঁচে যাওয়া আফগান নাগরিক, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বোমাবর্ষণ থেকে বাঁচতে ২৯ হাজারের বেশি পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি ও এলাকা ছেড়ে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলগুলোতে এই সময়ের মধ্যে এটি ছিল সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতির ঘটনাগুলোর একটি।

হামলার ক্ষয়ক্ষতি শুধু প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বেসামরিক অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শত শত বাড়িঘর, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মসজিদ ও জনসাধারণের ব্যবহারের স্থাপনা সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে।

এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। মৌলিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর একটি ছিল রাজধানী কাবুলের মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে চালানো হামলা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত ৩০০ রোগী ও কর্মী শহীদ হয়েছেন।

রাওয়াদারি এ হামলাকে একটি নৃশংস যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছে। চিকিৎসাসেবা দেওয়া একটি বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলার প্রভাব প্রাণহানি ও বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। হামলাগুলো আফগান সমাজে গভীর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষত সৃষ্টি করেছে।

এর ফলে মানুষের মধ্যে ভয় ছড়িয়ে পড়েছে। বাস্তুচ্যুতির কারণে বহু পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, হাজারো শিশুর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হয়েছে এবং দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। হামলা বন্ধ হওয়ার দীর্ঘ সময় পরও এসব পরিণতির প্রভাব অব্যাহত থাকবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অধিকাংশ হামলা রাতের বেলায় চালানো হয়েছে। এসব হামলার সময় সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করার নীতি অনুসরণ করা হয়নি এবং বেসামরিক জনগণকে রক্ষায় প্রয়োজনীয় সতর্কতাও গ্রহণ করা হয়নি।

এর ফলে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা হামলার শিকার হয়েছে এবং বেসামরিক মানুষের মধ্যে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনের শেষে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে রাওয়াদারি। একই সঙ্গে এসব লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।

সংঘাতের সময় বেসামরিক জনগণকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আফগানিস্তানের বেসামরিক জনগণকে যে ভয়াবহ মূল্য দিতে হচ্ছে, প্রতিবেদনে তারই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, হাজারো পরিবার নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শিশু ও নারীরা সবার সামনে রয়েছেন।

হতাহতের পরিসংখ্যান ও ধ্বংসযজ্ঞের চিত্রের মধ্য দিয়ে বেসামরিক জনগণকে রক্ষা এবং দীর্ঘ কয়েক দশকের যুদ্ধ ও সংঘাতে বিপর্যস্ত আফগান জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেওয়া হামলাগুলো বন্ধ করার জরুরি প্রয়োজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ বা টিটিপির বিরুদ্ধে লড়াই এবং সংগঠনটির আফগান ভূখণ্ড ব্যবহারের অভিযোগ তুলে পাকিস্তানি বাহিনী কিছুদিন ধরে আফগান জনগণের বিরুদ্ধে একটি নৃশংস যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ বা বাস্তব তথ্য নেই। আফগান সরকারও অভিযোগগুলো সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

সূত্র: হুরিয়াত রেডিও

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ