আজ ১৪ আগস্ট। আমাদের ইতিহাসের প্রথম স্বাধীনতা দিবস। ১৯৪৭ সালের এই দিনে দীর্ঘ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের মুসলমানরা নিজেদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র লাভ করেন। জন্ম নেয় পাকিস্তান। বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ড তখন পূর্ববঙ্গ নামে নতুন রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল হিসেবে যুক্ত হয়। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে এটিই ছিল এই ভূখণ্ডের মুসলমানদের প্রথম স্বাধীনতা।
১৪ আগস্ট তাই শুধু একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্মদিন নয়। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, মুসলমানদের স্বতন্ত্র অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কয়েক দশকের আন্দোলন এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি। পাকিস্তান আন্দোলন ছিল সেই স্বাধীনতা অর্জনের রাজনৈতিক পথ।
এই পথের পটভূমি তৈরি হয়েছিল আরও আগে।
১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। সৈনিক, সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় শাসকদের পাশাপাশি আলেম সমাজের একটি অংশও এতে সরাসরি অংশ নেন। শামলি ও থানাভবন এলাকায় হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কীর নেতৃত্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতভী ও মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহীসহ প্রভাবশালী আলেমরাও এই লড়াইয়ে অংশ নেন। ইতিহাসে এই সংঘর্ষ শামলির যুদ্ধ নামে পরিচিত।
১৮৫৭-এর বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর মুসলমানদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে পড়তে থাকেন। এই পরিস্থিতিতে মুসলিম সমাজের শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংগঠনকে ঘিরে নতুন উদ্যোগ শুরু হয়।
বাংলায় ১৮৬৩ সালে নবাব আবদুল লতিফ প্রতিষ্ঠা করেন মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি। ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। অন্যদিকে স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় এগিয়ে নিতে গড়ে তোলেন আলিগড় আন্দোলন। ১৮৭৭ সালে সৈয়দ আমীর আলী প্রতিষ্ঠা করেন ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন। শিক্ষা, আত্মপরিচয়, সামাজিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরিতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৮৮৫ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নতুনভাবে সামনে আসে। মুসলিম নেতৃত্বের একটি অংশ শুরু থেকেই কংগ্রেসের রাজনীতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতিতে মুসলমানদের স্বতন্ত্র অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেই প্রশ্নও ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই রাজনৈতিক যাত্রায় বাংলা দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। ঢাকা হয় এর রাজধানী। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষা, চাকরি, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়।
১৯০৬ সালে মুসলিম নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল শিমলায় ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানায়। একই বছরের ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্সে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম নেতারা সমবেত হন। ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে ৩০ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ।
চার দশক পর যে দল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবে, তার জন্ম হয়েছিল এই বাংলার মাটিতেই।
১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কারে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যবস্থা স্বীকৃতি পায়। কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়।
এদিকে মুসলমানদের ব্রিটিশবিরোধী তৎপরতা শুধু সাংবিধানিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। আলেমদের একটি ধারা সরাসরি ব্রিটিশ শাসন উৎখাতের চেষ্টায়ও সক্রিয় ছিলেন। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রেশমি রুমাল আন্দোলন।
শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে এবং মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধীসহ তার সহযোগীদের অংশগ্রহণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সংগঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। আফগানিস্তান, উসমানীয় খেলাফত ও জার্মানির সহযোগিতা পাওয়ার চেষ্টাও ছিল সেই পরিকল্পনার অংশ। গোপন যোগাযোগে রেশমি কাপড়ে লেখা চিঠি ব্যবহারের কারণে এটি রেশমি রুমাল আন্দোলন নামে পরিচিত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯১৫ সালে আফগানিস্তানের কাবুলে ভারতের একটি অস্থায়ী প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়। রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ ছিলেন এর প্রেসিডেন্ট, মাওলানা বরকতুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী এবং মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী ছিলেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন। ব্রিটিশ শাসনের বাইরে দাঁড়িয়ে স্বাধীন ভারতের একটি বিকল্প রাজনৈতিক কর্তৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল এটি।
পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার পর শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীসহ কয়েকজন আলেম হিজাজে আটক হন। পরে তাদের মাল্টায় বন্দি রাখা হয়। দীর্ঘ বন্দিত্বের পর ১৯২০ সালে তারা মুক্তি পান।
এর মধ্যেই ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তিতে কংগ্রেস মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনী প্রতিনিধিত্বের নীতি মেনে নেয়। সে সময় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হিন্দু-মুসলিম সাংবিধানিক সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রবক্তা ছিলেন।
১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন ও অসহযোগ কর্মসূচিতে সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
একই সময়ে ভারতবর্ষের মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক গণজাগরণ তৈরি করে খেলাফত আন্দোলন। এর মূল লক্ষ্য ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় খেলাফত রক্ষা করা। মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর ও তার বড় ভাই মাওলানা শওকত আলী, যারা ‘আলী ব্রাদার্স’ নামে পরিচিত ছিলেন, ছিলেন আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্বে। বাংলায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আকরম খান ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীসহ অনেকে এই আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
খেলাফত আন্দোলন সরাসরি ভারত স্বাধীন করার দাবিতে শুরু হয়নি। তবে ব্রিটিশ নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। মুসলমানদের বড় পরিসরে রাজনৈতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল।
এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার মধ্যেই একটি প্রশ্ন ক্রমে বড় হয়ে ওঠে: ব্রিটিশরা চলে গেলে ভারতবর্ষের মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে?
কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ শুরু থেকেই ভারত ভাগের রাজনীতি করেননি। তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে হিন্দু-মুসলিম সাংবিধানিক সমঝোতার পথ খুঁজতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়।
১৯২৮ সালের নেহরু রিপোর্টে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে মুসলিম নেতৃত্ব আপত্তি জানায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯২৯ সালে জিন্নাহ তার বিখ্যাত চৌদ্দ দফা সামনে আনেন। এতে ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, মুসলমানদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি ছিল।
১৯৩০ সালে মুসলিম লীগের এলাহাবাদ অধিবেশনে আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে একটি সমন্বিত মুসলিম রাজনৈতিক ইউনিট হিসেবে দেখার ধারণা তুলে ধরেন। এটি ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের হুবহু নকশা ছিল না এবং এতে বাংলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চলা আলোচনায় ইকবালের চিন্তা বড় প্রভাব ফেলে।
১৯৩৩ সালে চৌধুরী রহমত আলী তার ‘Now or Never’ পুস্তিকায় ‘Pakistan’ নামটি ব্যবহার করেন। পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণা এর মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে ১৯৩৭ সালে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সর্বভারতীয় পর্যায়ে মুসলিম লীগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। এরপর জিন্নাহ দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করার কাজে মনোযোগ দেন। সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে দলের ভিত্তি বাড়ানো এবং বিভিন্ন প্রদেশের মুসলিম নেতৃত্বকে এক জায়গায় আনার উদ্যোগ নেন তিনি। লিয়াকত আলী খানও এ সময় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাতেও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলে। পরে মুসলিম লীগের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সমঝোতা নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে।
এরপর আসে ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে এটি ছিল অন্যতম বড় রাজনৈতিক বাঁক।
২৩ মার্চ মুসলিম লীগের সেই ঐতিহাসিক অধিবেশনে প্রস্তাব উত্থাপন করেন বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ গঠনের কথা বলা হয়। সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম রাখার কথাও এতে উল্লেখ ছিল।
মূল প্রস্তাবে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি ছিল না। পরে এটিই পাকিস্তান প্রস্তাব নামে পরিচিত হয় এবং মুসলিম লীগের রাজনৈতিক লক্ষ্যের ভিত্তিতে পরিণত হয়।
লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক ছিল সরাসরি। এতে উত্তর-পশ্চিম ভারতের পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ডের কথাও ছিল। সেই ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন বাংলারই একজন নেতা।
এরপর বাংলায় পাকিস্তানের দাবি দ্রুত শক্তিশালী হতে থাকে। ১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বে বাংলার মুসলিম লীগ শক্তিশালী গণসংগঠনে পরিণত হয়। দল ছড়িয়ে পড়ে জেলা ও গ্রাম পর্যায়ে। মাওলানা আকরম খানও জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কৃষক, মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত তরুণসহ মুসলিম সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পাকিস্তানের দাবির সঙ্গে যুক্ত হন।
তাদের কাছে পাকিস্তানের আবেদন শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণ, শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কৃষক-জমিদার সম্পর্কের মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নও এই রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল।
পাকিস্তান আন্দোলনে আলেম সমাজের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
উপমহাদেশের সব আলেম পাকিস্তান প্রশ্নে এক অবস্থানে ছিলেন না। তবে আলেম সমাজের একটি বড় ও প্রভাবশালী অংশ পাকিস্তানের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর ধারার আলেমদের মধ্যে শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী, মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী, মুফতী মুহাম্মদ শফিসহ অনেকে পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।
তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী। তার রাজনৈতিক চিন্তায় পাকিস্তান শুধু নতুন একটি ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল না। তিনি এমন একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলেন, যেখানে মুসলমানরা নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক আদর্শের আলোকে রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন।
১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনের সময় তিনি মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচারণা চালান। বহু আলেম পাকিস্তানের দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তানপন্থী আলেমদের এই ধারা পরে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ব্যানারে সংগঠিত হয়।
অন্যদিকে শাইখুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বড় অংশ পাকিস্তান দাবির বিরোধিতা করেন। তারা যৌথ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পক্ষে ছিলেন। মুসলমানদের ভবিষ্যৎ কোন রাজনৈতিক কাঠামোয় নিরাপদ হবে, এ প্রশ্নে আলেমদের মধ্যেও বড় মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।
তবে সেই মতপার্থক্য পাকিস্তান আন্দোলনে আলেম সমাজের একটি বড় ও প্রভাবশালী অংশের সক্রিয় ভূমিকার গুরুত্ব কমায় না।
১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচন পাকিস্তান দাবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটিতে পরিণত হয়। বাংলায় মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭টি আসনের মধ্যে ১১০টিই জয় করে মুসলিম লীগ। এই ফল পাকিস্তানের দাবির পক্ষে বাংলার মুসলমানদের শক্তিশালী রাজনৈতিক রায় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে কায়েদে আজম জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ভারতীয় মুসলমানদের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আরও দৃঢ় অবস্থান তৈরি করে।
১৯৪৬ সালের এপ্রিলে দিল্লিতে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচিত সদস্যদের সম্মেলনে পাকিস্তানের দাবিকে আরও নির্দিষ্ট করা হয়। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ বলা হলেও দিল্লির সম্মেলনে একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণা সামনে আসে। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন বাংলার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আবুল হাশিম এই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন।
তবে তখনও ভারত ভাগই একমাত্র পথ হয়ে ওঠেনি। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের ক্যাবিনেট মিশন একটি শিথিল ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে ভারতকে অখণ্ড রাখার চেষ্টা করে। মুসলিম লীগ প্রথমে পরিকল্পনাটি গ্রহণ করেছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, প্রদেশগুলোর গ্রুপিং এবং ভবিষ্যৎ সংবিধান নিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বিরোধে সেই সমঝোতা শেষ পর্যন্ত টেকেনি।
এরপর ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবিতে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষণা করে। কলকাতার কর্মসূচি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নেয়। পরে নোয়াখালী, বিহার ও পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি রক্তপাত ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে এসে উপমহাদেশ গভীর রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংকটে পড়ে।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত হয়ে এলে বাংলা ভাগ ঠেকাতে স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ সামনে আসে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও শরৎচন্দ্র বসুসহ কয়েকজন নেতা এই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেন।
কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেন এবং স্বাধীন অখণ্ড বাংলার পরিকল্পনার প্রতি ইতিবাচক অবস্থান নেন। কিন্তু বাংলা ভাগের পক্ষে সবচেয়ে জোরালো রাজনৈতিক চাপ আসে হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতৃত্বের কাছ থেকে। বিশেষ করে হিন্দু মহাসভা বঙ্গভাগের দাবিতে ব্যাপক প্রচার চালায়। কংগ্রেস নেতৃত্বও স্বাধীন অখণ্ড বাংলার পরিকল্পনার বিরোধিতা করে। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের দেশভাগ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে বাংলা দুই ভাগে বিভক্ত হয়।
এদিকে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হয়।
একই সময়ে সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ববঙ্গে যোগ দেওয়ার পক্ষে পড়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ ভোট। আসামের সঙ্গে থাকার পক্ষে পড়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১ ভোট। এর ফলে সিলেটের অধিকাংশ এলাকা পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়।
অবশেষে আসে সেই দিন।
১৪ আগস্ট ১৯৪৭।
দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। ভারতবর্ষের মুসলমানরা নিজেদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র লাভ করেন। জন্ম নেয় পাকিস্তান।
কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হন নতুন রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল। লিয়াকত আলী খান হন প্রথম প্রধানমন্ত্রী। পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল হিসেবে যুক্ত হয়। বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ড প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বাইরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ হয়।
আইনগতভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের Indian Independence Act 1947-এ দুটি নতুন ডোমিনিয়ন কার্যকর হওয়ার তারিখ ১৫ আগস্ট নির্ধারিত ছিল। তবে পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা ১৪ আগস্ট সম্পন্ন হয় এবং দিনটিই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্বাধীনতার সেই মুহূর্তে আলেম সমাজের ভূমিকাও দৃশ্যমান ছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তানের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আলেম নেতা শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী। ঢাকায় পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেন মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী।
করাচি ও ঢাকায় এই দুই বরেণ্য আলেমের হাতে পতাকা উত্তোলনের ঘটনা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আলেম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হয়ে আছে।
তবে স্বাধীনতার আনন্দের পাশাপাশি দেশভাগ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ও বয়ে আনে। নতুন সীমান্তের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি হারান। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অসংখ্য মানুষের প্রাণ যায়। বহু মানুষ শরণার্থী হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন। ১৯৪৭-এর ইতিহাসে তাই স্বাধীনতার অর্জনের পাশাপাশি দেশভাগের গভীর বেদনাও রয়েছে।
কিন্তু ১৪ আগস্টের স্বাধীনতার মধ্য দিয়েই ইতিহাস শেষ হয়নি।
যে আশা নিয়ে বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, পরবর্তী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই রাজনৈতিক অংশীদারত্ব ও অধিকারের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভাষা, অর্থনীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সঙ্গে বৈষম্য বাড়তে থাকে।
১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান পূর্ববঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয় পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক অসন্তোষকে আরও স্পষ্ট করে। ১৯৫৬ সালে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সমাধান হয়নি।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করেন আইয়ুব খান। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবি আরও শক্তিশালী হয়। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, আগরতলা মামলা এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থনের মধ্য দিয়ে কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন নতুন পর্যায়ে পৌঁছায়।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে এবং জাতীয় পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কিন্তু নির্বাচনের রায় অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়নি।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলে পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল হয়ে ওঠে। শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। মার্চজুড়ে রাজনৈতিক আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানী এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও দমন অভিযান চালানো হয়।
২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আসে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়।
১৯৪৭ ও ১৯৭১ ইতিহাসের দুটি আলাদা অধ্যায়। কিন্তু পরের অধ্যায় প্রথমটির ইতিহাস মুছে দেয় না।
১৯৪৭ সালে বাংলার মুসলমানরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ হয়েছিলেন। পরবর্তী পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্য, রাজনৈতিক অধিকারহরণ ও দমন-পীড়ন সেই স্বাধীনতার প্রত্যাশাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তারই পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতিতে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
এই ইতিহাসের কেন্দ্রে বাংলার উপস্থিতি শুরু থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্ম, ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪৬ সালে বাংলার মুসলমানদের শক্তিশালী নির্বাচনী রায়, ১৯৪৭ সালে সিলেটের গণভোট এবং শেষ পর্যন্ত ১৪ আগস্টের স্বাধীনতা, প্রতিটি বড় বাঁকেই বাংলার ভূমিকা ছিল স্পষ্ট।
১৪ আগস্ট ১৯৪৭ তাই আমাদের ইতিহাসের প্রথম স্বাধীনতা দিবস। পাকিস্তান আন্দোলন ছিল সেই স্বাধীনতা অর্জনের রাজনৈতিক পথ। আর ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।











