আজ ১৪ আগস্ট। ভারতবর্ষের মুসলমানদের প্রথম স্বাধীনতা দিবস। ১৯৪৭ সালের এই দিনে দীর্ঘ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের মুসলমানরা নিজেদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র লাভ করেন। জন্ম নেয় পাকিস্তান। বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ড তখন পূর্ববঙ্গ নামে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল হিসেবে যুক্ত হয়। ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে এটিই ছিল প্রথম স্বাধীনতা।
এই স্বাধীনতা হঠাৎ আসেনি। এর পেছনে ছিল দীর্ঘ ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম, রাজনৈতিক আন্দোলন, সাংগঠনিক তৎপরতা, নির্বাচন এবং বহু বছরের দরকষাকষি। মুসলমানদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার যে সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান আন্দোলনে রূপ নেয়, সেটিই ছিল আমাদের প্রথম স্বাধীনতার আন্দোলন।
এই ইতিহাসের শেকড় আরও গভীরে। পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৮৫৭ সালের ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহে।
১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে ভারতবর্ষের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। সৈনিক, সাধারণ মানুষ, স্থানীয় শাসক এবং আলেম সমাজের একটি অংশ এতে সরাসরি অংশ নেন। উত্তর ভারতের শামলি ও থানাভবন এলাকায় হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মক্কীর নেতৃত্বে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতভী, মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহীসহ প্রভাবশালী আলেমরাও এই লড়াইয়ে অংশ নেন। ইতিহাসে এই সংঘর্ষ শামলির যুদ্ধ নামে পরিচিত।
বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। মুসলমানদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। শিক্ষা, চাকরি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে পড়তে থাকেন। এই সংকটের মধ্যেই মুসলিম সমাজে শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংস্কার ও রাজনৈতিক সংগঠনের বিভিন্ন উদ্যোগ শুরু হয়।
বাংলায় ১৮৬৩ সালে নবাব আবদুল লতিফ কলকাতায় মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় এগিয়ে নেওয়া এবং শিক্ষিত মুসলিম সমাজের মধ্যে নতুন চিন্তা ও সাংগঠনিক চেতনা তৈরিতে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এর তিন বছর পর, ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দারুল উলুম দেওবন্দ। ১৮৫৭-পরবর্তী মুসলিম সমাজে ধর্মীয় শিক্ষা, আত্মপরিচয় ও সামাজিক পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয় প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তী সময়ে এই শিক্ষাধারা থেকেই শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী, শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানীসহ বহু প্রভাবশালী আলেম উঠে আসেন।
অন্যদিকে স্যার সৈয়দ আহমদ খান মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষায় এগিয়ে নিতে আলিগড় আন্দোলন গড়ে তোলেন। তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের দাবি তোলেননি। তবে মুসলমানদের শিক্ষা, সামাজিক উন্নয়ন এবং স্বতন্ত্র রাজনৈতিক স্বার্থের প্রশ্ন সামনে এনে পরবর্তী মুসলিম রাজনীতির বিকাশে বড় ভূমিকা রাখেন।
বাংলার মুসলমানদের রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে। ১৮৭৭ সালে সৈয়দ আমীর আলী ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন। পরে এটি সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন নামে পরিচিত হয়। মুসলমানদের রাজনৈতিক দাবি ও স্বার্থ সংগঠিতভাবে সামনে আনার ক্ষেত্রে মুসলিম লীগের আগের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগগুলোর একটি ছিল এটি।
১৮৮৫ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন নতুনভাবে সামনে আসে। মুসলিম নেতৃত্বের একটি অংশ শুরু থেকেই কংগ্রেসের রাজনীতি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতিতে মুসলমানদের স্বতন্ত্র অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেই প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এই রাজনৈতিক যাত্রার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে বাংলা।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। ঢাকা হয় নতুন প্রদেশের রাজধানী। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষা, চাকরি, প্রশাসন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন। অন্যদিকে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়।
এর মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল শিমলায় ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মুসলমানদের পৃথক রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানায়। ইতিহাসে এটি শিমলা ডেপুটেশন নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে মুসলমানদের স্বতন্ত্র নির্বাচনী ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে।
একই বছরের ডিসেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্সে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম নেতারা সমবেত হন। ঢাকার নবাব খাজা সলিমুল্লাহর গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে ৩০ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ।
চার দশক পর যে দল পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবে, তার জন্ম হয়েছিল এই বাংলার মাটিতেই।
১৯০৯ সালের মর্লে-মিন্টো সংস্কারে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যবস্থা স্বীকৃতি পায়। কিন্তু ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি হয়। নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষায় শক্তিশালী সংগঠনের প্রয়োজনও আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে মুসলমানদের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম শুধু সাংবিধানিক রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্রিটিশ শাসন উৎখাতের লক্ষ্যেও আলেমদের একটি শক্তিশালী ধারা সক্রিয় ছিল। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রেশমি রুমাল আন্দোলন।
শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে এবং মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধীসহ তার সহযোগীদের অংশগ্রহণে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বড় একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল বিদেশি সহযোগিতা নিয়ে ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহ সংগঠিত করা। এ জন্য আফগানিস্তান, উসমানীয় খেলাফত ও জার্মানির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। গোপন যোগাযোগে রেশমি কাপড়ে লেখা চিঠি ব্যবহারের কারণে এই তৎপরতা রেশমি রুমাল আন্দোলন নামে পরিচিতি পায়।
এই তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে ১৯১৫ সালের ১ ডিসেম্বর। আফগানিস্তানের কাবুলে গঠন করা হয় ভারতের একটি অস্থায়ী প্রবাসী সরকার। রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ ছিলেন এর প্রেসিডেন্ট, মাওলানা বরকতুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী এবং মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী ছিলেন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন। ব্রিটিশ শাসনের বাইরে দাঁড়িয়ে স্বাধীন ভারতের বিকল্প রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি বড় প্রচেষ্টা ছিল এটি।
এদিকে ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তিতে কংগ্রেস মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনী প্রতিনিধিত্বের নীতি মেনে নেয়। সে সময় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হিন্দু-মুসলিম রাজনৈতিক সমঝোতার গুরুত্বপূর্ণ একজন প্রবক্তা ছিলেন।
রেশমি রুমাল আন্দোলনের পরিকল্পনা একপর্যায়ে ব্রিটিশদের নজরে পড়ে। শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান ও মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানীসহ তার কয়েকজন সহযোগী হিজাজে আটক হন। পরে তাদের ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেওয়া হয় এবং মাল্টায় বন্দি রাখা হয়। প্রায় তিন বছর বন্দিত্বের পর তারা মুক্তি পান।
আলেমদের ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা এর মধ্যেই আরও সংগঠিত হতে থাকে। ১৯১৯ সালের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠিত হয় জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, খেলাফত রক্ষা ও অসহযোগ আন্দোলনে সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা নেয়। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান প্রশ্নে এই ধারার আলেমদের মধ্যেই বড় রাজনৈতিক মতপার্থক্য দেখা দেয়।
একই সময়ে ভারতবর্ষের মুসলমানদের রাজনীতিতে ব্যাপক গণজাগরণ সৃষ্টি করে খেলাফত আন্দোলন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয় খেলাফতের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংকট দেখা দিলে ভারতবর্ষের মুসলমানরা খেলাফত রক্ষার দাবিতে আন্দোলনে নামেন।
মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর ও তার বড় ভাই মাওলানা শওকত আলী ছিলেন এই আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্বে। দুই ভাই ‘আলী ব্রাদার্স’ নামে পরিচিত ছিলেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদসহ আরও বহু মুসলিম নেতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।
বাংলাও খেলাফত আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯১৯ সালের প্রথম অল ইন্ডিয়া খেলাফত সম্মেলনে সভাপতিত্বও করেন তিনি। মাওলানা আকরম খান ও মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বাংলার বিভিন্ন এলাকায় খেলাফত আন্দোলন সংগঠিত করেন। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে সভা, সম্মেলন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের মাধ্যমে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে।
খেলাফত আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। কিন্তু ভারতবর্ষের মুসলমানদের ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা এবং ব্রিটিশবিরোধী চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এর বড় প্রভাব ছিল।
১৮৫৭-এর বিদ্রোহ, রেশমি রুমাল আন্দোলন, কাবুলের প্রবাসী সরকার, মাল্টার বন্দিত্ব, জমিয়তের রাজনৈতিক তৎপরতা এবং খেলাফত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের দীর্ঘ একটি ধারা তৈরি হয়েছিল। এর পাশাপাশি ক্রমেই বড় হয়ে উঠছিল আরেকটি প্রশ্ন: ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারতবর্ষের মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী হবে?
কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ শুরু থেকেই ভারত ভাগের রাজনীতি করেননি। তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কেটেছে হিন্দু-মুসলিম সাংবিধানিক সমঝোতার পথ খুঁজতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে থাকে।
১৯২৮ সালের নেহরু রিপোর্টে মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনী ব্যবস্থাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে মুসলিম নেতৃত্ব আপত্তি জানায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯২৯ সালে জিন্নাহ তার বিখ্যাত চৌদ্দ দফা সামনে আনেন। এতে ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, মুসলমানদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব এবং সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি তুলে ধরা হয়।
১৯৩০ সালে মুসলিম লীগের এলাহাবাদ অধিবেশনে আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল উত্তর-পশ্চিম ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে একটি সমন্বিত মুসলিম রাজনৈতিক ইউনিট হিসেবে দেখার ধারণা তুলে ধরেন। এটি ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের হুবহু নকশা ছিল না। এতে বাংলাও অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে মুসলমানদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চলা আলোচনায় ইকবালের চিন্তা বড় প্রভাব ফেলে।
১৯৩৩ সালে চৌধুরী রহমত আলী তার ‘Now or Never’ পুস্তিকায় ‘Pakistan’ নামটি ব্যবহার করেন। এর মধ্য দিয়ে পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণা আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে।
১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের নতুন কাঠামো তৈরি করে। এর অধীনে ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে সর্বভারতীয় পর্যায়ে মুসলিম লীগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।
এরপর জিন্নাহ দলকে নতুনভাবে সংগঠিত করার কাজে মনোযোগ দেন। প্রাদেশিক মুসলিম নেতৃত্বকে এক জায়গায় আনা, সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে দলের ভিত্তি বাড়ানো এবং মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে সর্বভারতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসার কাজ শুরু করেন তিনি। লিয়াকত আলী খানও এ সময় জিন্নাহর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
বাংলাতেও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তোলে। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের পর বাংলার রাজনীতিতে তার প্রভাব আরও বাড়ে। পরে মুসলিম লীগের সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে।
এরপর আসে প্রথম স্বাধীনতার আন্দোলনের অন্যতম বড় বাঁক, ১৯৪০ সালের লাহোর অধিবেশন।
২৩ মার্চ মুসলিম লীগের সেই ঐতিহাসিক অধিবেশনে প্রস্তাব উত্থাপন করেন বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ গঠনের কথা বলা হয়। সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম রাখার কথাও এতে উল্লেখ ছিল।
মূল প্রস্তাবে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি ছিল না। পরে এটিই পাকিস্তান প্রস্তাব নামে পরিচিত হয় এবং মুসলিম লীগের রাজনৈতিক লক্ষ্যের ভিত্তিতে পরিণত হয়।
লাহোর প্রস্তাবের সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক ছিল সরাসরি। এতে উত্তর-পশ্চিম ভারতের পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখণ্ডের কথাও ছিল। আর সেই ঐতিহাসিক প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন বাংলারই একজন নেতা। এরপর বাংলার মুসলিম রাজনীতিতে পাকিস্তানের দাবি দ্রুত শক্তিশালী হতে থাকে।
১৯৪০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বে বাংলার মুসলিম লীগ শক্তিশালী গণসংগঠনে পরিণত হয়। সংগঠন ছড়িয়ে পড়ে জেলা ও গ্রাম পর্যায়ে। মাওলানা আকরম খানও জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কৃষক, মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিত তরুণসহ মুসলিম সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।
তাদের কাছে পাকিস্তানের আবেদন শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশগ্রহণ, শিক্ষা ও চাকরির সুযোগ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং কৃষক-জমিদার সম্পর্কের মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রশ্নও এই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
পাকিস্তান আন্দোলনে আলেম সমাজের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
উপমহাদেশের সব আলেম পাকিস্তান প্রশ্নে এক অবস্থানে ছিলেন না। তবে আলেম সমাজের একটি বড় ও প্রভাবশালী অংশ পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।
হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভীর ধারার আলেমদের মধ্যে শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী, মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী, মুফতী মুহাম্মদ শফিসহ অনেকে পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন।
তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী। তার রাজনৈতিক চিন্তায় পাকিস্তান শুধু নতুন একটি ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল না। তিনি এমন একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন, যেখানে মুসলমানরা নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক আদর্শের আলোকে রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তোলার সুযোগ পাবেন।
১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনের সময় তিনি মুসলিম লীগের পক্ষে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচারণা চালান। তার নেতৃত্বে বহু আলেম পাকিস্তানের দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয় আলেমদের এই ধারা পরে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ব্যানারে সংগঠিত হয়।
অন্যদিকে শাইখুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বড় অংশ পাকিস্তান দাবির বিরোধিতা করেন। তারা যৌথ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পক্ষে ছিলেন। মুসলমানদের ভবিষ্যৎ কোন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিরাপদ হবে, এ প্রশ্নে আলেমদের মধ্যেও বড় মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল।
সেই মতপার্থক্য আড়াল না করেই বলা যায়, পাকিস্তান আন্দোলনে আলেম সমাজের একটি বড় অংশের সক্রিয় অংশগ্রহণ আন্দোলনকে শক্তিশালী করেছিল।
১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচন পাকিস্তান আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষাগুলোর একটিতে পরিণত হয়। বাংলায় মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ১১৭টি আসনের মধ্যে ১১০টিই জয় করে মুসলিম লীগ। এই ফল পাকিস্তানের দাবির পক্ষে বাংলার মুসলমানদের শক্তিশালী রাজনৈতিক রায় হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে কায়েদে আজম জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ ভারতীয় মুসলমানদের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আরও দৃঢ় অবস্থান তৈরি করে।
১৯৪৬ সালের এপ্রিলে দিল্লিতে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচিত সদস্যদের সম্মেলনে পাকিস্তানের দাবিকে আরও নির্দিষ্ট করা হয়। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ বলা হলেও দিল্লির সম্মেলনে একটি সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্রের ধারণা সামনে আসে। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন বাংলার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আবুল হাশিম এই পরিবর্তন নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন।
তবে তখনও ভারত ভাগই একমাত্র পথ হয়ে ওঠেনি। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের ক্যাবিনেট মিশন ভারতকে একটি শিথিল ফেডারেল কাঠামোর মধ্যে রেখে সমঝোতার চেষ্টা করে। মুসলিম লীগ প্রথমে সেই পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু কেন্দ্রীয় ক্ষমতা, প্রদেশগুলোর গ্রুপিং এবং ভবিষ্যৎ সংবিধান নিয়ে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বিরোধে শেষ পর্যন্ত সেই সমঝোতা টেকেনি।
এরপর ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগ পাকিস্তানের দাবিতে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষণা করে। কলকাতার কর্মসূচি ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রূপ নেয়। পরে নোয়াখালী, বিহার, পাঞ্জাবসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি রক্তপাত ছড়িয়ে পড়ে। স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে এসে উপমহাদেশ গভীর রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক সংকটের মুখোমুখি হয়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত হয়ে এলে বাংলা ভাগ ঠেকাতে স্বাধীন ও অখণ্ড বাংলা রাষ্ট্র গঠনের উদ্যোগ সামনে আসে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম ও শরৎচন্দ্র বসুসহ কয়েকজন নেতা এই পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করেন।
কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেন এবং স্বাধীন অখণ্ড বাংলার ধারণায় আপত্তি জানাননি। কিন্তু কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা বাংলা ভাগের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়। বিশেষ করে হিন্দু মহাসভা বঙ্গভাগের দাবিতে জোর প্রচার চালায়। কংগ্রেস নেতৃত্বও বাংলা ভাগের পক্ষে অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত তাদের এই অবস্থান এবং ব্রিটিশদের দেশভাগ পরিকল্পনার মধ্য দিয়েই বাংলা দুই ভাগে বিভক্ত হয়।
এদিকে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনার ভিত্তিতে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের প্রক্রিয়া শুরু হয়। পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হয়।
একই সময়ে সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ববঙ্গে যোগ দেওয়ার পক্ষে পড়ে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ ভোট। আসামের সঙ্গে থাকার পক্ষে পড়ে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১ ভোট। এর ফলে সিলেটের অধিকাংশ এলাকা পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়।
অবশেষে আসে ১৪ আগস্ট ১৯৪৭।
আমাদের প্রথম স্বাধীনতা দিবস।
দীর্ঘ পাকিস্তান আন্দোলনের পর ভারতবর্ষের মুসলমানরা নিজেদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র লাভ করেন। কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ হন পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল। লিয়াকত আলী খান হন প্রথম প্রধানমন্ত্রী। পূর্ববঙ্গ নতুন রাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চল হিসেবে যুক্ত হয়।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের Indian Independence Act 1947-এ ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন ডোমিনিয়ন প্রতিষ্ঠার তারিখ ১৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পাকিস্তানে ক্ষমতা হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা ১৪ আগস্ট সম্পন্ন হয় এবং দিনটিই পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
পাকিস্তান আন্দোলনে আলেম সমাজের যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, স্বাধীনতার মুহূর্তেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচিতে পাকিস্তানের প্রথম পতাকা উত্তোলন করেন পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আলেম নেতা শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী। আর ঢাকায় পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেন মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী।
করাচি ও ঢাকায় এই দুই বরেণ্য আলেমের হাতে পতাকা উত্তোলনের ঘটনা পাকিস্তান আন্দোলনে আলেম সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য।
তবে স্বাধীনতার আনন্দের পাশাপাশি ১৯৪৭-এর দেশভাগ ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ও বয়ে আনে। নতুন সীমান্তের দুই পাশে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঘরবাড়ি হারান। সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অসংখ্য মানুষের প্রাণ যায়। বিপুল মানুষ শরণার্থী হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেন। প্রথম স্বাধীনতার ইতিহাসে তাই অর্জনের পাশাপাশি দেশভাগের গভীর বেদনাও রয়েছে।
এরপরের ইতিহাসও এই ভূখণ্ডেরই ইতিহাস।
যে আশা নিয়ে বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, পরবর্তী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সেই ঐতিহাসিক অংশীদারত্বের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি। রাষ্ট্রের শুরু থেকেই ভাষা, অর্থনীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নে পূর্বাঞ্চলের মানুষের সঙ্গে কেন্দ্রের বিরোধ বাড়তে থাকে।
১৯৪৮ সালেই রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে সেই বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার অবস্থান পূর্ববঙ্গে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শুরু হয় বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সেই আন্দোলন রক্তাক্ত পরিণতি পায়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। ভাষা আন্দোলন পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক চেতনায় নতুন অধ্যায় তৈরি করে।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট বিপুল বিজয় অর্জন করে। ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট পায় ২১৫টি, মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি। এই নির্বাচনী রায়ে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন, বাংলা ভাষার অধিকার এবং পূর্ববঙ্গের প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট সরকার বেশিদিন টিকতে পারেনি। অল্প সময়ের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার তা ভেঙে দেয়।
১৯৫৬ সালের পাকিস্তান সংবিধানে বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। ভাষার প্রশ্নে একটি বড় দাবি পূরণ হলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের সমস্যার সমাধান হয়নি।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হয়। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। গণতান্ত্রিক রাজনীতির পরিসর সংকুচিত হয় এবং কেন্দ্রীয় শাসন আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকে।
১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলন সেই ক্ষোভকে নতুন গতি দেয়। এরপর ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দাবি সামনে আসে। পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের দাবি ছিল এই কর্মসূচির কেন্দ্রে। আইয়ুব সরকার ছয় দফাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরে এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন বাড়ায়।
এর ধারাবাহিকতায় আগরতলা মামলা করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানসহ সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। এই মামলাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
১৯৬৯ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। আন্দোলনের মুখে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করা হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ অভিযুক্তরা মুক্তি পান। আইয়ুব খানের শাসনেরও অবসান ঘটে।
এরপর ক্ষমতায় আসেন ইয়াহিয়া খান। ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরাসরি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে নভেম্বরে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল প্রাণহানি ঘটে। দুর্যোগ মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।
৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ১৬২টি সাধারণ আসনের মধ্যে ১৬০টিতে জয়লাভ করে। এর ফলে দলটি সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয় পায়।
কিন্তু নির্বাচনের রায় অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে সংকট তৈরি হয়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করা হলে পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল হয়ে ওঠে। শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। মার্চজুড়ে রাজনৈতিক আলোচনা চললেও শেষ পর্যন্ত সমঝোতা হয়নি।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানী এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও দমন অভিযান চালানো হয়।
২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা আসে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানি বাহিনীর সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। পরে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার।
নয় মাস ধরে চলে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ।
অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়।
১৯৪৭ ও ১৯৭১ ইতিহাসের দুটি আলাদা অধ্যায়। কিন্তু একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির রাজনৈতিক পটভূমি পুরোপুরি বোঝা যায় না।
বাংলার মুসলমানরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি, রাজনৈতিক অধিকার এবং মুসলমানদের স্বতন্ত্র ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট আসে প্রথম স্বাধীনতা।
কিন্তু পরবর্তী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে থাকা সেই রাজনৈতিক অংশীদারত্ব ও অধিকারবোধের মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি। ভাষা, অর্থনীতি, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের সঙ্গে বৈষম্য বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী রায়ও কার্যকর হয়নি। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন, দমন-পীড়ন এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
এই দীর্ঘ ইতিহাসে রয়েছে ১৮৫৭-এর ব্রিটিশবিরোধী বিদ্রোহ ও শামলির যুদ্ধ, দেওবন্দ ও আলিগড়ের পুনর্জাগরণ, বাংলার মুসলিম সাংগঠনিক তৎপরতা, বঙ্গভঙ্গ, মুসলিম লীগের জন্ম, রেশমি রুমাল আন্দোলন, কাবুলের প্রবাসী সরকার, মাল্টার বন্দিত্ব, জমিয়ত ও খেলাফত আন্দোলন, কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্ব, আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের রাজনৈতিক চিন্তা, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাব, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের সাংগঠনিক ভূমিকা এবং শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানীসহ আলেম সমাজের একটি বড় ও প্রভাবশালী অংশের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
এই ইতিহাসের কেন্দ্রে বাংলার উপস্থিতি বারবার ফিরে এসেছে। ১৮৬৩ সালে বাংলার মুসলমানদের প্রাথমিক সাংগঠনিক জাগরণ, ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের জন্ম, ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের উত্থাপিত লাহোর প্রস্তাব, ১৯৪৬ সালে বাংলার মুসলমানদের শক্তিশালী নির্বাচনী রায়, ১৯৪৭ সালে সিলেটের গণভোট এবং শেষ পর্যন্ত ১৪ আগস্টের প্রথম স্বাধীনতা।
তারপর ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম, গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচনী রায় এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আসে স্বাধীন বাংলাদেশ।
পাকিস্তান আন্দোলনই ছিল আমাদের প্রথম স্বাধীনতার আন্দোলন। ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ ছিল সেই দীর্ঘ আন্দোলনের বিজয়ের দিন, আমাদের প্রথম স্বাধীনতা দিবস। আর ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়ে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।










