spot_img

ইসরাইলিদের বর্বরতার সামনে অকার্যকর আদালতের রায়; ফিলিস্তিনিদের মানবেতর জীবন

নিজেদের রাষ্ট্রের আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও পশ্চিম তীরে একটি ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের বাহিনী। সম্প্রতি পশ্চিম তীরের আইন আল-হিলওয়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

আল জাজিরার তথ্যমতে, ইসরাইলি বাহিনীর এ বর্বরতার শিকার পরিবারের প্রধান আদেল দারাগমেহ।

প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও আদেল ও তার স্ত্রী খাইরিয়্যাহ নিজেদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির ধ্বংসাবশেষের পাশে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। আশ্রয় বলতে তাদের রয়েছে একটি পাতলা গদি ও ত্রিপলের অস্থায়ী ছাউনি। দুপুরের ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা থেকে রক্ষার জন্য যা যথেষ্ট নয়।

তাদের অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইসরাইলি বাহিনী ও অবৈধ বসতিস্থাপনকারীরা তাদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

অসুস্থ ও দুর্বল অবস্থায় মাটিতে শুয়ে থাকা আদেল বলেন, তারা ঠিকমতো ঘুমাতে, পানি পান করতে কিংবা খাবার খেতে পারছেন না। বাড়ি ভেঙে ফেলার সময় ঘরের ভেতরে থাকা তার ওষুধও ধ্বংস হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ঘরের আসবাবপত্র, মোবাইল ফোন ও সৌর প্যানেল—সবকিছুই চলে গেছে। সেখানে এখন বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থাও নেই।

পরিবারটি জানায়, আদেলের বাড়ি ভাঙার কয়েক দিন আগে তার ছেলে হিলালের বাড়িও ধ্বংস করা হয়। এরপর ২৮ জুলাই আদেল ও খাইরিয়্যাহর বাড়িতে বুলডোজার নিয়ে হাজির হয় ইহুদিবাদী ইসরাইলের সেনা, অবৈধ বসতিস্থাপনকারী ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা।

সে সময় আদেল ‘তুবাসে’ ওষুধ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। বাড়িতে ছিলেন তার স্ত্রী খাইরিয়্যাহ ও তাদের মেয়ে হানা। খাইরিয়্যাহ জানান, তিনি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তারা সেখানে হাজির হন।

আদালতের আদেশ দেখিয়েও রক্ষা হয়নি বাড়ি

ইহুদিবাদী ইসরাইলি সেনা, অবৈধ বসতিস্থাপনকারী ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা যখন আদেলদের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিতে আসে, তখন খাইরিয়্যাহ আইনি নথিপত্র নিয়ে তাদের সামনে যান। তার বিশ্বাস ছিল, এসব নথি ও ইসরাইলি আদালতের আদেশ প্রমাণ করবে যে তাদের বাড়ি ভাঙা যাবে না।

মূলত ২০২২ সালে পরিবারটির বিরুদ্ধে জারি হওয়া একটি উচ্ছেদ আদেশ স্থগিত করেছিল ইসরাইলের আদালত।

খাইরিয়্যাহর ভাষ্য অনুযায়ী, সেনারা নথিগুলো নিয়ে পড়ে দেখেন, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন এবং পরে তা তাকে ফিরিয়ে দেন। এরপরই বুলডোজার চালানো শুরু হয়।

খাইরিয়্যাহ জানান, তাকে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে পুরো এলাকা খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তখন তিনি কর্মকর্তাদের বলেন, তিনি একা ও অসুস্থ। এ অবস্থায় এত দ্রুত সবকিছু সরানো তার পক্ষে সম্ভব নয়।

পরিস্থিতির চাপে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তিন ঘণ্টা পর অ্যাম্বুলেন্সে তার জ্ঞান ফেরে। তবে তার জ্ঞান ফেরার আগেই বাড়িটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ঘরের সব জিনিসপত্রও ধ্বংস হয়ে যায়।

মাটিতে শুয়ে থাকা আদেল বলেন, তাদের ওপর বর্বরতা চালানোর ক্ষেত্রে আদালতের আদেশ, আইন ও মানবিকতার কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি।

বৈষম্যমূলক’ আইনি ব্যবস্থার অভিযোগ

দারাগমেহ পরিবারের আইনজীবী তাওফিক জাবারিন বলেন, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ইহুদিবাদী ইসরাইলি সেনা ও অবৈধ বসতিস্থাপনকারীরা বাড়িটি ধ্বংস করেছে।

আদেলের ছেলে হিলালের বাড়ি ২ জুলাই ধ্বংসের ঘটনায় কর্তৃপক্ষ সেটিকে সেনাবাহিনীর ভুল বলে দাবি করেছিল এবং এমন ঘটনা আর ঘটবে না বলে জানিয়েছিল। কিন্তু পরে আদেল ও খাইরিয়্যাহর বাড়িও ধ্বংস করা হয়।

জাবারিনের অভিযোগ, বসতিস্থাপনকারীদের কাছে আইন ও আদালতের রায়ের কোনো মূল্য নেই। তাদের লক্ষ্য হলো বাস্তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যা শেষ পর্যন্ত যেকোনো আইন বা আদালতের সিদ্ধান্তের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

দারাগমেহ পরিবারটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উত্তর জর্ডান উপত্যকার আইন আল-হিলওয়া ঝরনার আশপাশে পশুপালন করে আসছে। আদেল বলেন, তিনি সেখানেই জন্মেছেন এবং তার বাবার জন্মও ওই এলাকায়।

এলাকার কাছেই রয়েছে ইসরাইলি অবৈধ বসতি মাসকিয়ট এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে ওঠা কয়েকটি বসতিস্থাপনকারী ফাঁড়ি। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বসতি ও ফাঁড়ির কারণে তারা ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীদের হামলা, চুরি ও সেনা অভিযানের শিকার হচ্ছেন।

পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’তে নির্মাণের সংকট

পশ্চিম তীরের ‘এরিয়া সি’ ইসরাইলের পূর্ণ সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সেখানে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি পশুপালনকারী সম্প্রদায়গুলো দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণ ও বাড়ি ধ্বংসের আদেশসংক্রান্ত জটিলতার মধ্যে রয়েছে।

দারাগমেহ পরিবার জানায়, আদেলের বাড়িটি এর আগেও একবার ধ্বংস করা হয়েছিল। পরে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সেটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।

তবে এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন বলে মনে করছেন তারা। তাদের ভাষ্য, আগে কোনো বাড়ি ধ্বংসের ক্ষেত্রে সতর্কতা, ধ্বংসের আদেশ এবং আপিলের সুযোগ থাকলেও এখন সেই প্রক্রিয়া কার্যত অনুসরণ করা হচ্ছে না।

আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও হিলাল ও আদেলের বাড়ি ধ্বংসের সময় কোনো ধ্বংসের আদেশ তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়নি।

পরিবার ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত অধিকারকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি ধ্বংসের সময় সেনা, বসতিস্থাপনকারী ও জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা একসঙ্গে উপস্থিত ছিলেন।

‘ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টিয়ামের’ প্রধান আলেগ্রা পাচেকো বলেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য আইনি সুরক্ষার যে সামান্য সুযোগ ছিল, সেটিও ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে।

তার মতে, বিদ্যমান পরিকল্পনা ও জোনিং ব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যেন ফিলিস্তিনিরা আইনগতভাবে নির্মাণের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন অবস্থায় পড়ে। অন্যদিকে ইসরাইলি বসতিগুলো—যেগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত—অনুমোদিত পরিকল্পনার আওতায় নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছে।

হাজারো ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৬ হাজার ২০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩ হাজারের বেশি শিশু রয়েছে।

শুধু ২০২৬ সালের শুরু থেকে ২ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এ বছর দখলকৃত পশ্চিম তীরে ৯০৭টির বেশি ফিলিস্তিনি স্থাপনাও ধ্বংস করা হয়েছে।

আল জাজিরা এসব ঘটনার বিষয়ে ইসরাইল সরকার ও সামরিক বাহিনীর মন্তব্য চেয়েছিল। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাদের কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

ঝরনাটিও এখন আর তাদের নয়

বাড়ি হারানোর পাশাপাশি পরিবারটি এমন একটি ঝরনার ব্যবহার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের পরিবারের জীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

আদেলের ছেলে হিলাল জানান, একসময় তারা ওই ঝরনা থেকে পানি পান করতেন এবং গাধার পিঠে করে সেখান থেকে পানি বহন করতেন। এখন বসতিস্থাপনকারীরা এলাকাটি বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলেছে এবং তাদের সেখানে যেতে বাধা দেয়।

হিলাল আরও জানান, তাদের গবাদিপশুর বেশির ভাগই চুরি, জব্দ অথবা জোরপূর্বক বিক্রি হয়ে গেছে। অবশিষ্ট গবাদিপশুগুলো বসতিস্থাপনকারীরা চলে যাওয়ার পর ঝরনার অবশিষ্ট পানির সন্ধান করে বেড়ায়।

নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির জায়গায় ফিরে হিলাল দেখেন, দেয়াল ও ছাদের পরিবর্তে সেখানে পড়ে আছে পোড়া ধ্বংসাবশেষ এবং বুলডোজারের টানে বেঁকে যাওয়া লোহার পাইপ।

তার হিসাব অনুযায়ী, তাদের ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ইসরাইলি শেকেল, যা প্রায় ৫৭ হাজার মার্কিন ডলারের সমান।

তিনি বলেন, নিজের কোনো জিনিসই তিনি সঙ্গে নিয়ে বের হতে পারেননি। সবকিছুই ধ্বংস হয়ে গেছে।

এখন ইসরাইলীদের থামানোর মতো কিছু নেই

পরিবারের আরেক সদস্যের বাড়িও এর আগে ধ্বংস করা হয়েছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আত্মীয় জানান, তারা এখন আশঙ্কা করছেন, তারাও ইসরাইলিদের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারেন।

পরিবারের একজন সদস্য বলেন, “এখন ইসরাইলিদের থামানোর মতো কিছুই নেই। এমনকি আগের মতো আদালতের আদেশও না।”

এ কারণেই তারা ভয় পাচ্ছেন, যেকোনো সময় তাদের বাড়িতেও অভিযান চালানো হতে পারে।

আদেল ও খাইরিয়্যাহকেও বাড়ি পুনর্নির্মাণ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসের জন্য তাদের আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

পরিবারটি আরও জানায়, আগের চুরি ও কর্তৃপক্ষের জব্দের ঘটনার প্রায় দেড় বছর আগে অবৈধ বসতিস্থাপনকারী ইহুদিবাদী সন্ত্রাসীরা তাদের আরও ৫০টি গবাদিপশু নিয়ে গিয়েছিল।

ধ্বংসের মাঝেও ফিরে আসার প্রত্যাশা

অসুস্থতা ও প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত আদেল মাটিতে শুয়ে ছিলেন। তবে অতীতের বিয়ের অনুষ্ঠানের কথা উঠতেই তার কণ্ঠে কিছুটা প্রাণ ফিরে আসে।

তিনি ঐতিহ্যবাহী বেদুইন উৎসবের ‘দাহিয়্যাহ’ নামের গীতধর্মী নৃত্যের ছন্দে হাততালি দিতে শুরু করেন। অতীতের সেই সময়গুলোকে তিনি সুন্দর বলে স্মরণ করেন।

কিছুক্ষণ পর আবার ক্লান্ত হয়ে গদিতে শুয়ে পড়েন। তবে অতীতের সেই সুন্দর দিনগুলো একদিন ফিরে আসবে—এই আশা তিনি এখনো যত্ন করে আগলে রেখেছেন।

আদেল বলেন, “ইনশাআল্লাহ, সেই সময়গুলো আবার ফিরে আসবে।”

সূত্র: আল জাজিরা

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ