১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। দীর্ঘ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে জন্ম নেয় পাকিস্তান। নতুন রাষ্ট্রের নেতৃত্বে ছিলেন কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তবে স্বাধীনতার দিন করাচিতে পাকিস্তানের প্রথম পতাকা উঠেছিল একজন প্রখ্যাত আলেমের হাতে।
তিনি শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচিতে তার হাত দিয়েই প্রথম উত্তোলিত হয় পাকিস্তানের পতাকা।
মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম এবং পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আলেম সমাজকে সংগঠিত করে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন তিনি। তার নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সংগঠনটি।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত নেতা শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের খাস শিষ্য ছিলেন মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী। দারুল উলুম দেওবন্দের প্রখ্যাত আলেমদেরও একজন ছিলেন তিনি। সেখানে পড়াশোনা ও শিক্ষকতার পর ১৯৩৫ থেকে ১৯৪৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সদর মুহতামিমের দায়িত্ব পালন করেন। দিল্লির বিখ্যাত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতাদেরও একজন ছিলেন তিনি।
তরুণ বয়স থেকেই ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী। পরে খেলাফত আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন ও জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।
১৯১৯ সালে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ প্রতিষ্ঠার পর সংগঠনটির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় জমিয়তের অন্যতম নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তী সময়ে ভারতবর্ষের মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলেম সমাজের মধ্যেও মতপার্থক্য দেখা দেয়। শাইখুল ইসলাম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী অখণ্ড ভারত ও যৌথ জাতীয়তাবাদের পক্ষে অবস্থান নেন। অন্যদিকে শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী অবস্থান নেন পৃথক মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে।
১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের পর পাকিস্তান প্রশ্নে এই দুই অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখন আলেম সমাজের একটি বিশাল অংশকে এই দাবির পক্ষে সংগঠিত করতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী।
১৯৪৫ সালে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ থেকে আলাদা হয়ে আলেম সমাজের একটি বিশাল অংশকে সঙ্গে নিয়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গড়ে তোলেন তিনি। সংগঠনটির প্রথম সভাপতি হন মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী।
তার নেতৃত্বে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবিতে রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ময়দানে সক্রিয় হয়ে ওঠে। আলেমদের একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত ধারা পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে মাঠে নামে। বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে পাকিস্তানের পক্ষে জনমত গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তারা।
১৯৪৫-৪৬ সালের নির্বাচনে উত্তর ভারত, পাঞ্জাব ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালান মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী। আলেমদের সংগঠিত করার পাশাপাশি সাধারণ মুসলমানদের মধ্যেও পাকিস্তানের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে কাজ করেন তিনি।
১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে মিরাটে মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী।
পরের বছর মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে সিলেট থেকে ভারতের গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
১৯৪৭ সালের জুনে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে বৈঠক হয় মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানীর। জিন্নাহর অনুরোধে আলেমদের সঙ্গে নিয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে যান তিনি। সেখানে পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালান।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট করাচিতে স্বাধীন পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব দেওয়া হয় শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানীকে। তার হাত দিয়েই করাচিতে নতুন রাষ্ট্রের প্রথম পতাকা উত্তোলিত হয়।
একই দিনে ঢাকায় পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেন আরেক প্রখ্যাত আলেম মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী। এভাবে পাকিস্তানের দুই অংশের প্রধান দুই শহর করাচি ও ঢাকায় নতুন রাষ্ট্রের পতাকা উত্তোলনের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন দুই আলেম।
এই পতাকা উত্তোলনের পেছনে ছিল মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানীর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পথচলা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তান আন্দোলনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত তিনি সক্রিয় ছিলেন। আলেম সমাজের একটি বিশাল অংশকে পাকিস্তানের পক্ষে সংগঠিত করেছেন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গড়ে তুলেছেন, নির্বাচনী প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের গণভোটেও পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার প্রথম দিন নতুন রাষ্ট্রের রাজধানী করাচিতে পাকিস্তানের পতাকা উঠল সেই আলেমের হাতেই।
স্বাধীনতার এক বছরের কিছু বেশি সময় পর, ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।
তার জানাজার নামাজে ইমামতি করেন শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী।
স্বাধীনতার দিন যার হাতে করাচিতে পাকিস্তানের পতাকা উঠেছিল, এক বছরের কিছু বেশি সময় পর সেই আলেমের ইমামতিতেই আদায় করা হয় কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর জানাজার নামাজ।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিলেন কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আলেম সমাজের নেতৃত্বে ছিলেন শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী।
পাকিস্তানের পক্ষে আলেম সমাজকে সংগঠিত করা থেকে শুরু করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম গঠন, নির্বাচনী প্রচারণা, গণভোট এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার দিন পতাকা উত্তোলন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তার।
স্বাধীনতার প্রথম দিন করাচিতে পাকিস্তানের পতাকা উঠেছিল তার হাতে। একই দিনে ঢাকায় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী। আর কায়েদে আজম ইন্তেকাল করার পর তার জানাজার নামাজেও ইমামতি করেন মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী।
তিনি ছিলেন শাইখুল ইসলাম মাওলানা শাব্বীর আহমদ উসমানী।










