spot_img
spot_imgspot_img

আইনমন্ত্রীর তালাক-মিরাসের উদাহরণ শরিয়াহবিরোধী: মুফতি হারুন ইজহার

জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ নিয়ে বিরোধীদের আপত্তির জবাব দিতে গিয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের দেওয়া তালাক ও মিরাসসংক্রান্ত দুটি উদাহরণকে ইসলামী শরিয়াহ আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুফতি হারুন ইজহার।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, সংশোধিত আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য নেই। শুরু থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে এতে শরিয়াহবিরোধী কোনো ধারা না থাকার বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

মুফতি হারুন ইজহার বলেন, বিলটি পাসের আগে সরকারের পক্ষ থেকে আলেমদের সঙ্গে কিছু যোগাযোগও করা হয়েছিল এবং আলেমদের পক্ষ থেকে সরকারকে পর্যবেক্ষণ পাঠানো হয়েছিল।

কিন্তু তার অভিযোগ, সেসব বিষয় নিয়ে আরও চিন্তাভাবনা ও পর্যালোচনার জন্য সময় না দিয়ে তাড়াহুড়ো করে আইনটি পাস করা হয়েছে। এর ফলে আইনটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সরকার মৌলিক কিছু ভুল করছে।

বিশেষ করে আইনমন্ত্রীর তালাক ও মিরাসসংক্রান্ত দুটি উদাহরণের সমালোচনা করে হারুন ইজহার বলেন, এগুলো ইসলামী শরিয়াহ আইনের পরিপন্থী।

তার আশঙ্কা, নতুন আইনটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এ ধরনের উদাহরণ দেওয়ায় শরিয়াহর দৃষ্টিকোণ থেকে আইনটি নিয়ে আরও বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে।

তালাক নিয়ে কী বলেছিলেন আইনমন্ত্রী

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন নিয়ে সংসদে বিরোধীদের শরিয়াহগত আপত্তির জবাব দিতে গিয়ে আইনমন্ত্রী ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের উদাহরণ দেন।

এই অধ্যাদেশটি পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের আমলে জারি করা হয়। মুসলিম পারিবারিক আইনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা এই অধ্যাদেশ সে সময় আলেম ও ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক বিরোধিতার মুখে পড়ে। পরবর্তীতে এটি বাতিলের দাবি্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আন্দোলন হয়।

আইনমন্ত্রী সংসদে বলেন, ইসলামী আইন অনুযায়ী কেউ তিন তালাক দিলে তালাক হয়ে যায়। কিন্তু ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ অনুযায়ী তালাক দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানকে নোটিশ দিতে হয়। এরপর আরবিট্রেশন কাউন্সিল গঠন করে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করা হয় এবং নোটিশ দেওয়ার ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়।

এই উদাহরণ দিয়ে আইনমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, ইসলামী আইনে কোনো বিধান থাকার পরও রাষ্ট্র তার প্রয়োগের জন্য আলাদা আইনি কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে।

তালাকের শরয়ী আপত্তি কোথায়

প্রচলিত হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, স্বামী স্ত্রীকে বৈধভাবে তিন তালাক দিলে তালাক উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই তিন তালাক কার্যকর হয়ে যায় এবং বৈবাহিক সম্পর্ক চূড়ান্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়।

ফলে আইনমন্ত্রী যখন নিজেই বলছেন, ইসলামী আইন অনুযায়ী তিন তালাক দিলে তালাক হয়ে যায়, তখন এরপর আবার বলা হচ্ছে যে সেই তালাক ৯০ দিন পর কার্যকর হবে। শরিয়াহগত প্রশ্নটি এখানেই।

তালাক সংঘটিত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে নোটিশ দেওয়া, নিবন্ধন করা কিংবা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এক বিষয়। কিন্তু শরিয়াহর দৃষ্টিতে ইতোমধ্যে কার্যকর হয়ে যাওয়া তালাককে আরও ৯০ দিন পর্যন্ত অকার্যকর ধরে রাখা ভিন্ন বিষয়।

একইভাবে তিন তালাক সম্পন্ন হয়ে গেলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সাধারণ রুজু বা সমঝোতার মাধ্যমে আগের বৈবাহিক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে না।

কিন্তু ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৭ ধারায় তালাকের ধরন আলাদা না করে চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পৌঁছানোর পর ৯০ দিন অতিবাহিত না হওয়া পর্যন্ত তালাক কার্যকর না হওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একই সময়ে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের মাধ্যমে উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করার কথাও রয়েছে।

ফলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে যে তালাক ইতোমধ্যে সংঘটিত হয়েছে, সেটিকে রাষ্ট্রীয় আইনে আরও ৯০ দিন ‘কার্যকর হয়নি’ বলে ধরে রাখা এবং ওই সময়ে সমঝোতার মাধ্যমে বিবাহ বহাল রাখার সুযোগ তৈরি করাই মূল শরয়ী আপত্তির জায়গা।

মিরাস নিয়ে আইনমন্ত্রীর দ্বিতীয় উদাহরণ

আইনমন্ত্রী আরেকটি উদাহরণ দেন ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারা থেকে।

তার বক্তব্য ছিল, কোনো ব্যক্তির ছেলে বা মেয়ে তার আগে মারা গেলে শরিয়াহর প্রচলিত মিরাস বিধানে সেই মৃত সন্তানের সন্তানরা তাদের বাবা অথবা মা জীবিত থাকলে যে অংশ পেতেন, ঠিক সেই অংশ সরাসরি পায় না।

কিন্তু ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ছেলে বা মেয়ে উত্তরাধিকার খোলার আগে মারা গেলে তার জীবিত সন্তানরা সেই ছেলে বা মেয়ে জীবিত থাকলে যে অংশ পেতেন, সমপরিমাণ অংশ পাবে।

এই উদাহরণ দিয়ে আইনমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন, মুসলিম পারিবারিক বিষয়ে প্রচলিত শরয়ী কাঠামোর পাশাপাশি রাষ্ট্র প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা আইনি বিধান তৈরি করতে পারে।

মিরাসে শরিয়াহর বিধান কী

প্রচলিত হানাফি ও সুন্নি ফারায়েজ ব্যবস্থায় উত্তরাধিকার খোলার সময় যারা জীবিত থাকেন, তাদের মধ্যেই শরিয়াহ নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী সম্পত্তি বণ্টন করা হয়।

কোনো ছেলে বা মেয়ে তার পিতা-মাতার আগেই মারা গেলে তাকে কাল্পনিকভাবে জীবিত ধরে তার সম্ভাব্য মিরাসের অংশ তার সন্তানদের দিয়ে দেওয়ার ‘প্রতিনিধিত্বের নীতি’ প্রচলিত সুন্নি ফারায়েজে এভাবে নেই।

এর অর্থ এই নয় যে নাতি-নাতনিরা কোনো অবস্থাতেই মিরাস পায় না। অন্য ওয়ারিশ কারা রয়েছেন এবং তাদের সম্পর্ক কী, তার ওপর নির্ভর করে নাতি-নাতনিরাও শরিয়াহর নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী ওয়ারিশ হতে পারে।

কিন্তু মৃত বাবা বা মায়ের সম্ভাব্য অংশ হুবহু তার সন্তানদের মধ্যে স্থানান্তর করে দেওয়ার ব্যবস্থা আলাদা।

১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারায় রাষ্ট্রীয়ভাবে এই ‘প্রতিনিধিত্বের নীতি’ চালু করা হয়েছে।

ফলে আইনমন্ত্রীর মিরাসসংক্রান্ত উদাহরণটি শুধু শরিয়াহর কোনো বিধান বাস্তবায়নের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার উদাহরণ নয়। বরং এটি প্রচলিত সুন্নি ফারায়েজের বণ্টনপদ্ধতি থেকে আলাদা একটি রাষ্ট্রীয় বিধানের উদাহরণ।

এ কারণেই ১৯৬১ সালের অধ্যাদেশের এই ধারাটি দীর্ঘদিন ধরেই আলেম ও ইসলামী আইন গবেষকদের মধ্যে শরিয়াহগত বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে।

কেন উদাহরণ দুটি নিয়ে আপত্তি

আইনমন্ত্রী তালাক ও মিরাসের উদাহরণ দিয়ে মূলত দেখাতে চেয়েছেন, ইসলামী বিধানের পাশাপাশি রাষ্ট্র আলাদা আইনি কাঠামো নির্ধারণ করতে পারে।

কিন্তু দুটি উদাহরণের ক্ষেত্রেই শরিয়াহর মৌলিক বিধান এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যকার সীমারেখার প্রশ্ন সামনে এসেছে।

তালাকের ক্ষেত্রে নোটিশ, নিবন্ধন কিংবা আরবিট্রেশন কাউন্সিল গঠন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয় হতে পারে। কিন্তু শরিয়াহর বিচারে তালাক কখন সংঘটিত ও কার্যকর হয়েছে, সেটি পৃথক ফিকহি প্রশ্ন।

একইভাবে মিরাসের সম্পত্তি কীভাবে নিবন্ধন হবে বা আদালতের মাধ্যমে কীভাবে বণ্টন কার্যকর হবে, তা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বিষয়। কিন্তু কোন ওয়ারিশ কতটুকু অংশ পাবেন, সেটি শরিয়াহ নির্ধারিত বিধানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

ফলে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া নির্ধারণ এবং শরিয়াহর মৌলিক বিধানে ভিন্ন কাঠামো তৈরি করা এক বিষয় নয়।

এই কারণেই নতুন সম্পত্তি হস্তান্তর আইনকে শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় প্রমাণ করতে গিয়ে তালাকের ৯০ দিনের বিধান এবং আগে থেকেই শরিয়াহগত বিতর্ক থাকা মিরাসের একটি আইনকে নজির হিসেবে উপস্থাপন করাকে প্রশ্নবিদ্ধ মনে করছেন আলেমদের একটি অংশ।

মুফতি হারুন ইজহার বলেন, সংশ্লিষ্ট সমস্যার সুন্দর শরয়ী ও আইনি সমাধানের পথ রয়েছে। এ অবস্থায় আরও চিন্তাভাবনা ও আলেমদের সঙ্গে পর্যালোচনার সুযোগ না দিয়ে সরকার কেন এত তাড়াহুড়ো করে আইনটি পাস করল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ