গাজ্জায় ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ড নিয়ে নির্মিত নতুন তথ্যচিত্রে দখলদার অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর গোপন লক্ষ্য নির্ধারণ পদ্ধতি ও হামলার কৌশল সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য উঠে এসেছে। অস্কারজয়ী ‘নো আদার ল্যান্ড’-এর নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর পরিচালিত ‘নাজা’ নামের এই তথ্যচিত্রে ২৪ জন বেনামি ইসরাইলি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে তথ্যচিত্রটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়। গোল্ডেন লায়নের প্রতিযোগিতায় থাকা ২১টি ছবির মধ্যে ‘নাজা’ একমাত্র তথ্যচিত্র। ছবিটি প্রযোজনা করেছে দ্য গার্ডিয়ান ও জেমস উইলসনের প্রতিষ্ঠান।
তথ্যচিত্রটিতে সাক্ষ্য দেওয়া কর্মকর্তাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের কথিত নিম্নপদস্থ সদস্যদের শনাক্ত করত। অনেক ক্ষেত্রে তাদের বাড়িতে রাতে হামলা চালানো হতো, সেখানে পরিবারের সদস্যরা থাকলেও তাদের নিহত হওয়ার আশঙ্কা আগে থেকেই জানা থাকত বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন কর্মকর্তারা।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে মোবাইল ফোনের তথ্য ও অবস্থান ব্যবহার করা এবং ফোনে নজরদারির মতো পদ্ধতিও নেওয়া হতো। কয়েকজন কর্মকর্তা এমন একটি ব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে লক্ষ্যবস্তু ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি ও সম্ভাব্য বেসামরিক হতাহতের বিষয় জানা থাকা সত্ত্বেও হামলা চালানো হতো।
তথ্যচিত্রটিতে বেসামরিক বাড়িঘর ধ্বংস, আবাসিক এলাকায় ব্যাপক হামলা এবং ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রের আশপাশে বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হত্যার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এসব তথ্য মূলত সাক্ষাৎকার দেওয়া ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নির্মাতারা জানিয়েছেন, বিচ্ছিন্ন কোনো সেনার কর্মকাণ্ডকে দায়ী করাই তাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপক হত্যাকাণ্ডকে সম্ভব করে তোলা সামরিক নির্দেশনা, নীতি, প্রচলিত পদ্ধতি ও কাঠামোকে সামনে আনাই তথ্যচিত্রটির লক্ষ্য।
আব্রাহাম বলেন, ২৪ জনের সাক্ষ্য একত্র করে গাজ্জায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা সামরিক কাঠামো ও ব্যবস্থাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। তথ্যচিত্রটি নির্মাণে প্রায় তিন বছর সময় লেগেছে এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়েছে।
ভেনিসে প্রদর্শনের পর তথ্যচিত্রটি প্রায় ২৫ মিনিটের দীর্ঘ করতালি পায়। এতে গাজ্জায় বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে ইসরাইলি সামরিক অভিযানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা ও লক্ষ্য নির্ধারণ পদ্ধতি নিয়ে ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তাদের বেনামি সাক্ষ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘নাজা’ নামটি ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত একটি পরিভাষা থেকে নেওয়া হয়েছে। দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, হামলার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য বেসামরিক নিহতের সংখ্যা বোঝাতে এই পরিভাষা ব্যবহার করা হতো।
তথ্যচিত্রটি ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দ্য গার্ডিয়ান, ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি অনুসন্ধানী গণমাধ্যম এবং অন্যান্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্যের ওপরও ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে। ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোর এর আগে ‘নো আদার ল্যান্ড’ তথ্যচিত্রের সহপরিচালক ছিলেন। ছবিটি ২০২৫ সালে সেরা তথ্যচিত্রের অস্কার জেতে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান












