নেপালের ভয়াবহ বন্যাকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকা ঝুঁকির জন্য ‘সতর্কবার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নেপালকে সহায়তা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, উষ্ণ হয়ে ওঠা জলবায়ু ভঙ্গুর হিমালয় পরিবেশব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। হিমবাহ সরে যাচ্ছে, পারমাফ্রস্ট গলছে, পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে এবং বন্যা, ভূমিধস ও বরফ-পাথরের ধসসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যা ও ধসের ঘটনা ঘটে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়। জাতিসংঘে শাহ জানান, এ ঘটনায় অন্তত ১ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৬ হাজারের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের দ্রুত মূল্যায়ন অনুযায়ী, পুনরুদ্ধারে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ সমপরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।
বালেন্দ্র শাহ বলেন, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০.১ শতাংশেরও কম। তিনি বলেন, ‘আমরা এই সংকট তৈরি করিনি, অথচ এর জন্য আমাদেরই বিপুল মূল্য দিতে হচ্ছে।’
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নেপালকে সহায়তার আহ্বান জানিয়ে শাহ বলেন, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণে আরও তীব্র হয়ে ওঠা সংকটের বিরুদ্ধে নেপাল একা নিজের সক্ষমতা তৈরি করতে পারবে না। তিনি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অনুদানভিত্তিক সহায়তা এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডসহ বিদ্যমান জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থাগুলো আরও কার্যকর করার আহ্বান জানান।
হিমালয় অঞ্চলের জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় ‘হিমালয়ান ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম’ গঠনের প্রস্তাব দেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। এতে নেপাল, ভারত ও চীনকে যুক্ত করে স্যাটেলাইট তথ্য ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান বিনিময়, ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদগুলোর ওপর নজরদারি, যৌথ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং দুর্যোগের সময় সীমান্তপারের সমন্বিত সহায়তার প্রস্তাব দেন তিনি।
শাহ বলেন, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চল প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানি, কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাই হিমালয় শুধু নেপালের বিষয় নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
নেপাল জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে ২ কোটি ডলার সহায়তার আবেদন করেছে। এ ছাড়া দেশটি এরই মধ্যে ওই তহবিলের আওতায় ২ কোটি ডলার জলবায়ু অর্থায়ন পাওয়ার অনুমোদন পেয়েছে বলে নেপালের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এদিকে ২২ সেপ্টেম্বর আমেরিকা বন্যা-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে অতিরিক্ত ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এর মধ্যে স্থায়ী সেতু নির্মাণে ১ কোটি, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, আশ্রয়, জীবিকা ও শীতকালীন সহায়তায় ৮০ লাখ এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় আমেরিকায় তৈরি ড্রোন সরবরাহে ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে জি-৭ উন্নয়নমন্ত্রীদের বৈঠকে দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি পুনর্বাসন, পুনর্গঠন, জলবায়ু অর্থায়ন, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও হিমালয় অঞ্চল নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
বালেন্দ্র শাহ ছয় মাস আগে ক্ষমতায় আসেন। সাবেক র্যাপার শাহ তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসেন। সাম্প্রতিক বন্যার পর তার সরকারের সামনে জলবায়ু কূটনীতি ও দুর্যোগ মোকাবিলা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
সূত্র : নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রয়টার্স











