spot_img
spot_img

গাজ্জায় হামলার আগেই বেসামরিক প্রাণহানি হিসাব করত ইসরাইলি বাহিনী

ফরাসি সংবাদপত্র ‘ল্য মঁদ’-এর এক অনুসন্ধানে ইসরাইলি সেনাদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে গাজ্জা উপত্যকায় দখলদার ইসরাইলি বাহিনীর বোমা হামলা পরিচালনার পদ্ধতি সম্পর্কে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। এসব সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছে ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’ নামের একটি সংগঠন। অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সময় সম্ভাব্য বেসামরিক প্রাণহানিকেও আগাম হিসাবের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

‘ল্য মঁদ’-এর প্রকাশিত এসব সাক্ষ্যে দেখা যায়, লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে দখলদার বাহিনী ব্যাপক পরিসরের গোয়েন্দা ও ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে। একইসঙ্গে কিছু হামলায় কতজন বেসামরিক মানুষ শহীদ হতে পারেন তারও আগাম হিসাব করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে আসা উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর গাজ্জা উপত্যকার উত্তরাঞ্চলের জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ইসরাইলি হামলা। ইসরাইল দাবি করেছিল, হামলাটির লক্ষ্য ছিল হামাসের একজন কমান্ডার। তাদের দাবি অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি একটি সুড়ঙ্গের ভেতরে অবস্থান করছিলেন।

তবে ওই হামলায় শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দাদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। সংবাদপত্রটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এতে ১২৬ ফিলিস্তিনি শহীদ হন। নিহতদের মধ্যে ৬৮ জন শিশু ছিল। এছাড়া প্রায় ২৮০ জন আহত হন।

ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য প্রাণহানির পরিমাণ সম্পর্কে দখলদার বাহিনী আগে থেকেই অবগত ছিল। বাহিনীর অভ্যন্তরে পরিচালিত প্রাথমিক এক মূল্যায়নে ‘নাজা’ নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ৩০০ জনের শহীদ হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল।

লক্ষ্যবস্তু করা কমান্ডারটি সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্কের ঠিক কোথায় অবস্থান করছিলেন তা জানা না থাকায় হামলার পরিধি বাড়িয়ে আশপাশের ভবন ও এলাকাকেও এর আওতায় আনা হয়। এর ফলে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি শহীদ হন।

অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, জাবালিয়ার এই হামলা বোমা হামলা পরিচালনার পদ্ধতির কোনো ব্যতিক্রমী উদাহরণ নয়। ইসরাইলি একটি চালকবিহীন বিমান পরিচালনাকারী জানান, হামলা চালানোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরের নীতিমালা রয়েছে। এসব নীতিমালার আওতায় প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদের নিজেদের বাড়ির ভেতরে থাকা অবস্থায় কিংবা রাস্তায় চলাচলের সময়ও লক্ষ্যবস্তু করা যায়।

ওই সামরিক সদস্য আরও জানান, অভিযান পরিচালনার আগেই বেসামরিক প্রাণহানির হিসাব করা হতো। এসব হিসাব অনুযায়ী কয়েক ডজন মানুষের শহীদ হওয়ার আশঙ্কা থাকত।

বাহিনীর ব্যবস্থাপনা শুধু লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। হামলার জন্য নির্ধারিত এলাকাগুলোতে তখনও কতজন ফিলিস্তিনি অবস্থান করছেন তা অনুমান করার চেষ্টাও এর আওতায় ছিল।

যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসে ইসরাইলি হামলা ব্যাপক আকার ধারণ করে। ইসরাইলি বিমানবাহিনীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, শুধু প্রথম সপ্তাহেই গাজ্জা উপত্যকায় ৬ হাজারের বেশি বোমা ফেলা হয়। এসব হামলায় ভারী বোমাও ব্যবহার করা হয়। এর অনেকগুলোর ওজন ছিল ৫০০ থেকে ১ হাজার কিলোগ্রামের মধ্যে।

এছাড়া দখলদার বাহিনী ‘আগুনের বেল্ট’ নামে পরিচিত একটি পদ্ধতিও ব্যবহার করে। এতে বিস্তৃত এলাকাজুড়ে একযোগে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল একাধিক স্থাপনা ধ্বংস করা এবং স্থলবাহিনীর জন্য অগ্রসর হওয়ার পথ প্রস্তুত করা।

অনুসন্ধানে ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তালিকা তৈরিতে ডিজিটাল ব্যবস্থা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ভূমিকার বিষয়টিও উঠে এসেছে। দখলদার বাহিনী এমন কিছু ব্যবস্থা তৈরি করেছে যা অল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রূপান্তর করতে সক্ষম।

এসব ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে ‘হাবসোরা’ বা ‘দ্য গসপেল’। এটি তথ্য ব্যবহার করে প্রতিরোধ আন্দোলনের কথিত অবস্থানগুলো শনাক্ত করে।

দখলদার বাহিনী দাবি করে আসছে, এসব ব্যবস্থা স্বাধীনভাবে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় না এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মানুষের হাতেই থাকে। তবে ‘ল্য মঁদ’-এর প্রকাশিত সাক্ষ্যগুলো এই সিদ্ধান্তের প্রকৃতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে ডিজিটাল ব্যবস্থাগুলো অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক লক্ষ্যবস্তু তৈরি করতে সক্ষম হওয়ায় এসব প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’ সংগঠনটি জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে তারা প্রায় ২০০টি সাক্ষ্য সংগ্রহ করেছে। সংগঠনটির মতে, গাজ্জায় শহীদ ও আহত মানুষের বিপুল সংখ্যাকে সীমিতসংখ্যক ব্যতিক্রমী হামলার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ব্যাপক প্রাণহানির পেছনে এমন কিছু নিয়ম ও পরিচালনাগত প্রক্রিয়া রয়েছে যা উচ্চমাত্রার প্রাণহানির সুযোগ তৈরি করেছে।

গাজ্জা উপত্যকায় আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের প্রবেশের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে এসব সাক্ষ্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সেখানে মাটিতে কী ঘটছে তা নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের বাধা রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলি সেনাদের সাক্ষ্য, পাশাপাশি সাংবাদিক ও মানবাধিকারভিত্তিক অনুসন্ধানগুলো গাজ্জা উপত্যকার ওপর চালানো হামলার প্রকৃতি এবং এর ফলে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সৃষ্ট বিপুল প্রাণহানি সম্পর্কে অতিরিক্ত তথ্য তুলে ধরছে।

এই অনুসন্ধান গণহত্যার কিছু বিবরণ সামনে এনে শুধু হামলার ভয়াবহ পরিণতি নিয়েই নয়, বরং হামলা শুরুর আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়া ও নিয়ম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। একইসঙ্গে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের সিদ্ধান্তে ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষের জীবনকে আদৌ বাস্তব কোনো বিবেচনার বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

সূত্র : সাফা নিউজ এজেন্সি

spot_img
spot_img
spot_img

সর্বশেষ